অজানা সৌন্দর্য “চালন্দা গিরিপথ”

0
60

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার উত্তরে হাটহাজারী থানার ফতেহপুর ইউনিয়নের জঙ্গল পশ্চিম-পট্টি মৌজার ২,১০০ একর পাহাড়ি এবং সমতল ভূমির উপর অবস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই চট্টগ্রাম ভার্সিটির ক্যাম্পাসটি একাধিক পাহাড়ে ঘেরা সবুজের এক সুনিপুণ আবাসস্থল। ক্যাম্পাসটির পথে ঘাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে অনেক কাব্যকথা। বৃষ্টিস্নাত দিনে ভার্সিটির রূপ লাবণ্য যেন বেড়ে দাঁড়ায় বহুগুণে।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে লেখার আছে অনেক কিছু, তবে আজ লিখবো কিছুদিন আগেও যার নামটি পর্যন্ত কেউ জানতো না, সেই অজানা অচেনা জায়গাটি নিয়ে। নাম “চালন্দা গিরিপথ”। এই ভার্সিটির আনাচে কানাচে যে অজানা সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে তারই মধ্যে অন্যতম এই চালন্দা গিরিপথ। চলুন সংক্ষেপে এটি আবিষ্কারের ইতিহাসটি জেনে নেই।

২০১১ সালে ইতিহাস বিভাগের ১১ জনের একটা দল ভার্সিটি থেকে ভাটিয়ারী হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। স্থানীয় এক কৃষক তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে থাকে৷ কলা ঝুপড়ির পেছনের পাহাড়ি ছড়া ধরে তারা হাঁটতে শুরু করলে কিছুদূর যাবার পর তারা লক্ষ্য করে সরু একটা জায়গা দিয়ে ঠাণ্ডা পানি বেরুচ্ছে। সেই ঠাণ্ডা পানির উৎস বের করতেই হঠাৎ আবিষ্কার করে ফেলে একটি গিরিপথ। ভারতের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে মিলিয়ে তারা নাম দেয় “চালন্দা গিরিপথ”।চট্টগ্রাম শহরের বটতলী স্টেশন থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে ৭ঃ৩০, ৮ঃ০০, ৮ঃ৩০ এবং ষোলশহর স্টেশন থেকে ৭ঃ৫০, ৮ঃ২০, ৮ঃ৪৫, ৯ঃ৪৫, ১০ঃ৩০ -এ শাটল ট্রেন ছেড়ে যায়। শাটল ট্রেনের অনুভূতি অন্যরকম, তবে বেশ ভিড় লেগে থাকে সেখানে। তাই চাইলে বাসেও যেতে পারেন, শহরের মার্কেট এরিয়া থেকে ৩ নাম্বার বাস ভার্সিটির উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা করে চলে যান কলা ঝুপড়ি। ভাড়া জনপ্রতি ৫ টাকা। কলা ঝুপড়ির ঠিক পেছনেই বয়ে গেছে পাহাড়ি ছড়া। সেটি ধরে ৪০-৫০ মিনিট হাঁটার পর দেখবেন ঝিরিপথটি দুইদিকে দুই ভাগ হয়ে গেছে। হাতের বাম পাশের পথটি ধরে এগুতে থাকুন। আরও আধা ঘণ্টা ঝিরি ধরে ট্রেকিং করার পর দেখা মিলবে সেই কাঙ্ক্ষিত চালন্দা গিরিখাত।এখানে বলে রাখা ভালো, পাশাপাশি দুটি গিরিপথ যার একটি চালন্দার এবং অপরটি চলে গেছে সীতাকুণ্ডের দিকে। যারা ট্রেকিং পছন্দ করেন, তাদের জন্য একদম আদর্শ জায়গাটি হলো এই চালন্দা গিরিপথ। পাহাড়ি ঝিরিপথ, বর্ষাকালে পানি বেশি থাকলেও অন্যান্য সময়ে কিছু জায়গায় হাঁটু সমান পানি দেখা যায়৷ তবে বেশিরভাগ স্থানে পায়ের গোড়ালি সমান পানি৷ বৃষ্টিস্নাত দিনে পানির উচ্চতা বেড়ে যায়।সেফলি ট্রেকিং করতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই ট্রেকিং স্যু পরতে হবে কারণ বুনো কাঁটাযুক্ত ঝোপঝাড় পাডর হয়ে যেতে হয়। খালি পায়ে ঝিরিপথ পাড়ি দেবার কথা ভুলেও ভাববেন না। ট্রেকিং স্যু না থাকলে এংলেট পরতে পারেন। এতে পিচ্ছিল পাথরের উপর হাঁটতে সুবিধা হবে৷

শুকনো মৌসুমে গেলে চালন্দা গিরিখাতের আসল জায়গাটা শুকনোই থাকে। তবে ভরা মৌসুমে সেই গিরিখাতে জমে থাকে পচা গলা পানি। বুক সমান পানি ধরে এগুতে হবে, অথবা দুই পাহাড়ের দেয়াল ধরে এগুতে হবে পানিতে না ভিজতে চাইলে। হাতে লাঠি অবশ্যই রাখবেন, সামনে লাঠি দিয়ে আগে দেখেপাহাড়ি ছড়ার মাঝে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আলো আঁধারির অদ্ভুত এক দৃশ্য আপনার চোখে পড়বে৷ বড় বড় গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো যেন চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে ছড়ার উপর। অপরূপ সেই দৃশ্য৷

প্রকৃতি পাহাড় আর সবুজ, সবটা মিলেমিশে একাকার অবস্থা এখানটায়। আসলে চালন্দার সৌন্দর্য বলে বোঝানো কখনো সম্ভব না। যাই বলি, মনে হবে ঠিকভাবে বলা হচ্ছে না, এতটাই সুন্দর৷ সৌন্দর্য ব্যাপারটাই এমন, এটা আসলে অনুভব করতে হয়।যাত্রা শুরু করার আগে অবশ্যই কলা ঝুপড়ি থেকে শুকনো খাবার অথবা কলা রুটি নিয়ে যাবেন। কারণ দেড় ঘণ্টার মতো ট্রেকিং করে চালন্দায় পৌঁছানোর পর প্রচণ্ড ক্ষিধে অনুভূত হবে। তাই পেট পূজো না হলে প্রকৃতির রূপ যাই থাকুক সেটা বিরক্ত লাগবে। আর ছোটখাটো পিকনিকের মতো করতে চাইলে বাসা থেকে বানানো খাবারও নিয়ে যেতে পারেন।

তবে বর্তমানে চালন্দার রূপ সৌন্দর্য ও বৈচিত্রময় পরিবেশ হুমকির মুখে কেবলমাত্র মানুষের অসাবধানতার জন্য। আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন অনেক মানুষ প্রকৃতির উথান দেখতে গিয়ে নিজেরাই প্রকৃতির পতন ঘটিয়ে আনছেন। চিপ্সের প্যাকেট, বিস্কুটের প্যাকেট, কলার খোসা, পলিথিন ইত্যাদি দিয়ে এখন ভরপুর চালন্দা গিরিপথ। যা মোটেই কাম্য নয়। যে প্রকৃতি আপনাকে আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন সে প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব আপনার আমার সবার।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চালন্দা গিরিপথ ছাড়াও আছে বিশাল পাহাড় যেখানে মাঝে মাঝেই দেখা পাওয়া যায় হরিণ ও বুনো হাতির। আমি নিজেই সেখানে হরিণ দেখেছি দুইবার। আছে ঝুলন্ত সেতু। নিজের ভার্সিটি বলে বলছি না, আমার মতে দেশের সবকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে অনেকটাই আলাদা ও বৈচিত্র্যময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটি। ব্যক্তিগতভাবে ফরেস্ট্রি বিভাগের এরিয়াটা আমার বেশ পছন্দের ও ভালোবাসার একটি জায়গা। গাছগাছালিতে ঘেরা সুন্দর ছিমছাম এলাকাটাতে গেলেই মনে এক ধরনের শান্তি অনুভব করবেন।

বিঃদ্রঃ চালন্দা গিরিপথে যাওয়ার প্ল্যান করলে অবশ্যই কমপক্ষে ৮-১০ জন যাবেন। কারণ পাহাড়ি ঝিরিপথ, আর কিছুদিন আগেই সেখানে ঘটেছে ছিনতাইয়ের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। তাই দলবল নিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সর্বোপরি প্রকৃতিকে শ্রদ্ধা করুন, তাকে ভালোবাসুন। যেকোনো ধরনের অপচনশীল ও পচনশীল ময়লা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকুন।