আইসিজের অন্তবর্তী আদেশে রোহিঙ্গাদের বুক ভরা আশা,বিশেষ দোয়া

0
53
কায়সার হামিদ মানিক,উখিয়া।
জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের (আইসিজে) অন্তর্বর্তী আদেশ বুক ভরা আশা নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে অবস্থানকারী নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। অন্তবর্তী আদেশের চার নির্দেশে ওপর ভর করে নিরাপত্তা নিয়ে দ্রুত দেশে ফেরার আশা ব্যক্ত করেছেন তারা। রায় ঘোষণার পর ৩২ টি ক্যাম্পের কয়েক হাজার মসজিদে রোহিঙ্গারা বিশেষ দোয়ার আয়োজনের খবর পাওয়া গেছে।
গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা ঐতিহাসিক মামলায় আজ বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টায় নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আইসিজের বিচারক বিচারপতি আবদুল কােভি আহমেদ ইউসুফ এই আদেশ দেন।এ সময় আদালত রোহিঙ্গাদের ওপর শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, গণহত্যা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন।
আইসিজের বিচারক রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিতে চারটি অন্তর্র্বতীকালীন আদেশ ঘোষণা করেন। আদেশগুলো হলো-
(১) রোহিঙ্গাদের হত্যা, মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন ও ইচ্ছা করে আঘাত করা যাবে না।
(২) গণহত্যা কিংবা গণহত্যার প্রচেষ্টা বা ষড়যন্ত্র না করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইর প্রতি নির্দেশ।
(৩) গণহত্যা সংক্রান্ত কোনও ধরনের প্রমাণ বা আলামত নষ্ট না করা।
(৪) বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও খারাপ করে, এমন কোনও পদক্ষেপ না নেওয়া।
পঞ্চম বিষয়টি হচ্ছে, আদেশের পরে ৪ মাসের মধ্যে উভয়পক্ষ তাদের নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে প্রতিবেদন আকারে কোর্টকে জানাবে।
মিয়ানমারকে অবশ্যই ৪ মাসের মধ্যে লিখিত জমা দিতে হবে যেন তারা সেখানে পরিস্থিতি উন্নয়নে কী ব্যবস্থা নিয়েছে। এরপর প্রতি ৬ মাসের মধ্যে আবার প্রতিবেদন দিতে হবে মিয়ানমারকে। এক্ষেত্রে গাম্বিয়া মিয়ানমারের দাখিলকৃত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের কাছে আবেদন করতে পারবে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উখিয়ার কুতুপালং মেগা ক্যাম্পের অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ব্যবস্হাপনা কমিটির সেক্রেটারী মোঃ নুর বলেন, ‘আশা করছি এখন মিয়ানমারের আর তালবাহানা করার সুযোগ রুদ্ধ হবে। এর ফলে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক আইনি চাপ বাড়বে, আমাদের নিজ দেশে ফেরা ত্বরান্বিত হবে।’
টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা আবদুল মাজেদ বলেন, ‘গাম্বিয়ার কাছে রোহিঙ্গা কৃতজ্ঞ থাকবে। আইসিজে এন আদেশের পর নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে নিজেদের বাড়িঘরে ফিরে যাওয়ার রাস্তা বের হবে।’
রোহিঙ্গাদের নতুন সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল ইউনিয়ন বা এআরএনইউ এর ভাইস চেয়ারম্যান মাষ্টার নুরুল আলম বলেন, এধরণের আদেশে প্রতীক্ষায় ছিল রোহিঙ্গারা। অনেক নারী ও পুরুষ আদালতের রায় তাদের পক্ষে পেতে মানস করে রোজা রেখেছে, নফল নামাজ পড়েছে। রায় ঘোষণার পর আসর ও মাগরিব নামাজে প্রত্যেক মসজিদে বিশেষ কৃতজ্ঞতা বা শোকরিয়া দোয়া করা হয়।
রোহিঙ্গা রিফুউজি কাউন্সিলরের চেয়ারম্যান সিরাজুল মোস্তফা বলেন, আইসিজে কোর্টের আদেশে রোহিঙ্গারা আনন্দিত। রায়ে সন্তোষ জানিয়ে আনন্দ মিছিল করার প্রস্তুতি থাকলেও প্রশাসনের কঠোরতায় সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত হবে বাংলাদেশ ও এদেশের জনগণের দূর্ভোগ নিরসনে আদেশ গুলো অনুসরণ করে দ্রুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেয়া।
উল্লেখ্য,আদালত বলেছেন, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব মিয়ানমারের। রোহিঙ্গারা গণহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। আদালত মনে করেন, রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমার অনীহা প্রকাশ করেছে। গাম্বিয়ার অভিযোগ অনুযায়ী, রাখাইনের অভিযানে এসব করা হয়েছে রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য।
আদালত মনে করেন, গাম্বিয়া এর বিচার চাওয়ার যোগ্য। মিয়ানমার জেনোসাইড কনভেনশন লঙ্ঘনের ব্যাপারটি অস্বীকার করে যে আবেদন করেছে আদালত তা খারিজ করে দেন। আদালত জানান, মিয়ানমার জেনোসাইড কনভেনশনের অনুচ্ছেদ (৯ )লঙ্ঘন করেছে। এখন পর্যন্ত যে আলামত আদালতের কাছে এসেছে, তাতে রোহিঙ্গারা হত্যা, ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আর এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তাদের নির্দেশদাতা দায়ী।
আদালত আরো বলেছেন,মিয়ানমারে বসবাসরত রোহিঙ্গারা জেনোসাইড কনভেনশনের অনুচ্ছেদ (২) অনুযায়ী একটি প্রটেক্টেড গ্রুপ। ২০১৭ সালে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর অভিযানের অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী তারা আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি ও বেসামরিকদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেনি। তাই অনেক বেসামরিক প্রাণ হারিয়েছে।
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরদার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। দেশটির সেনাবাহিনী রাখাইনে হত্যাকাণ্ড, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করলে জীবন বাঁচাতে নতুন করে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের এই নৃশংসতাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মামলা করে গাম্বিয়া। মামলায় প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও সংঘাত আরও তীব্রতর না হওয়ার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিতে আদালতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল দেশটি।