আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস

0
143

জনসাধারণের মধ্যে পর্যটন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতি বছর জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডব্লিউটিও) উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী আজকের দিনটিকে ‘বিশ্ব পর্যটন দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হচ্ছে দিবসটি। দিবসটির এবারের মূল প্রতিপাদ্য ‘ট্যুরিজম অ্যান্ড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে পর্যটন’। দিবসটি উদযাপনের লক্ষ্যে বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে জাতীয় পর্যটন সংস্থা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সাজ সাজ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত কর্তৃপক্ষ। এখানে আজ ঘটবে পর্যটকদের মিলন মেলা। আসন্ন ঈদ ও পূজাকে কেন্দ্র করে নোয়াখালীর নিঝুমদ্বীপ ও হবিগঞ্জের সাতছড়ি উদ্যানসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

দিবসটি উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে র‌্যালি, সেমিনার, টকশো, সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ, পর্যটন বিষয়ক বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ফটো এক্সিবিশন, রিসোর্টগুলোয় খাদ্য ও আবাসনের ওপর বিশেষ ছাড়, সড়কদ্বীপ সজ্জা, আলোকসজ্জা, খাদ্য উৎসব ইত্যাদি। দিবসটির প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও পর্যটন কেন্দ্রের সঙ্গে সেতুবন্ধন গড়ে তোলা। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন। কক্সবাজার সংবাদদাতা ইমাম খাইর জানান, পর্যটন দিবসে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ জেলার পর্যটন স্পটগুলোয় ঘটবে পর্যটকদের মিলন মেলা। এ দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কক্সবাজারে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তায় নেয়া হয়েছে আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এ দিবস উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন। সন্ধ্যায় সৈকতের উন্মুক্ত মঞ্চে গান গাইবেন দেশের সাড়া জাগানো কণ্ঠশিল্পী মেহরীন। পর্যটকদের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে আবাসিক হোটেলে ৭০ ভাগ এবং খাবার হোটেলগুলোয় ২০ ভাগ বিশেষ ছাড়। সৈকতজুড়ে বসানো হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা চৌকি।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ছাড়াও জেলার পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে ইনানী সৈকত, হিমছড়ি পাথুরে ঝরনা, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, মহেশখালী আদিনাথ মন্দির, ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, রামু বৌদ্ধ বিহার, টেকনাফ মাথিনের কূপ। এসব দর্শনীয় জায়গা পর্যটকদের জন্য বিশেষভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত থাকায় আজকের দিনে পর্যটকের ঢল নামবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাপ্তাহিক ছুটি ও বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার থেকে সৈকতজুড়ে নেমেছে পর্যটকের ঢল। সাগরপাড়ের লাবনী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত দর্শনাথীদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো পর্যটন এলাকা।

নোয়াখালী সংবাদদাতা মানিক ভূইয়া জানান, পর্যটন দিবস উপলক্ষে নিঝুমদ্বীপও ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাময় এ নিঝুমদ্বীপে আগের তুলনায় দর্শনার্থী বেড়েছে। এখানকার বড় আকর্ষণ হচ্ছে মায়াবি হরিণ। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সাগরকন্যাখ্যাত নিঝুম দ্বীপ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ইকো ট্যুরিজম সম্প্রসারণের আরও সুবিধা সৃষ্টি, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা, থাকার সুব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং নিরাপত্তা বিধান করা হলে অনেক বেশি পর্যটকের সমাগম ঘটবে। পর্যটন শিল্পে রাজস্ব আয়ের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সানাউল্লা পাটওয়ারী জানিয়েছেন, নিঝুমদ্বীপে সৌন্দর্য অবলোকন করতে পর্যটকদের জন্য ৫০ ফুট উঁচু টাওয়ার নির্মাণ, হরিণ ও পশুপাখি দেখার জন্য বনের গাছের উচ্চতা সমান ২০ ফুট পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হবে। পুকুর, খাল ও লেক খনন এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জনসচেতনা বৃদ্ধি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।

উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুব মোরশেদ লিটন জানান, তিনি স্থানীয় এমপি আয়েশা ফেরদৌসসহ সরকারের বিভিন্ন মহলে চেষ্টা করছেন যাতে নোয়াখালী দ্বীপ উপজেলা হাতিয়াকে একটি পর্যটক শিল্প ও মডেল উপজেলা ঘোষণা করে সরকার। তা হলে নানাবিধ উন্নয়নের সঙ্গে ভ্রমণবিলাসী পর্যটক ও পাখি প্রেমিকদের আকর্ষণ আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে জাতীয় আয়ও বাড়বে। হবিগঞ্জ সংবাদদাতা মোঃ মামুন চৌধুরী জানান, ঈদ ও পূজায় পর্যটক বরণে হবিগঞ্জের দর্শনীয় স্থানগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য এবং সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে পর্যটকের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। ১০ থেকে ২০ টাকার টিকিট ক্রয় করে রেমা-কালেঙ্গা ও সাতছড়িতে পর্যটকরা পুরোদিন মনোরম দৃশ্য আর বন্যপ্রাণী অবলোকন করতে পারবেন। সূত্রে জানা গেছে, রেমা-কালেঙ্গার বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য মূলত তরফ পাহাড় সংরক্ষিত বনভূমির একটি অংশ, যা দেশের অবশিষ্ট প্রাকৃতিক পার্বত্য বনভূমির মধ্যে সর্ববৃহৎ। অভয়ারণ্যটি হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার অন্তর্গত গাজীপুর ও রানীগাঁও ইউনিয়নে। বনাঞ্চলটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত রয়েছে। অপেক্ষাকৃত দুর্গম স্থানে অবস্থিত বলে এই সমৃদ্ধ মিশ্র চিরহরিৎ বনটি এখনও টিকে রয়েছে। বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি বসবাস করছে এখানে। উদ্যানে প্রবেশ করছেন পর্যটক। এসব বনে পর্যটক প্রবেশ করে বন্যপ্রাণী আর মনোরম দৃশ্য অবলোকন করে মুগ্ধ হচ্ছেন। যদিও চলতি বছরের ১ জুন থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দফায় র‌্যাব অভিযান পরিচালনা করে সাতছড়ির বন ও ত্রিপুরা পল্লী থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। এতে করে পর্যটকদের মাঝে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উদ্যান কর্তৃপক্ষ বলছে এসবে পর্যটকদের কোনো সমস্যা হবে না। এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যাপার। তারা এ ব্যাপারে গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছে। এতে পর্যটকদের ভয়ের কিছু নেই। রেমা-কালেঙ্গা-সাতছড়ি ছাড়াও জেলায় রয়েছে ৩৫টি চা বাগান, দুটি রাবার বাগান, তেলিয়াপাড়া স্মৃতিসৌধ ও ঐতিহাসিক বাংলো, বাগানের বিভিন্ন লেক, উচাইলের শংকর পাশা গায়েবি মসজিদসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। তবে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে অতিপ্রিয় সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যটি। কোনো উৎসব এলে এসব স্থান পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারে জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আলাপাকালে তারা জানান, পর্যটকের নিরাপত্তার জন্য আমরা প্রস্তুত রয়েছি।

খাগড়াছড়ির দর্শনীয় স্থান-ব্যস্ত জীবনে সময় কাটছে আমাদের । আমরা সবাই কোন না কোন কাজে ব্যস্ত থাকি । পরিবারের সদস্যদেরও এমনকি বন্ধু বান্ধবদের সময় দেওয়ার মতো সময় থাকে না। এভাবে সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হয় ফাটল । তাছাড়া কর্ম ব্যস্ততার কারনে জীবন হয়ে ওঠে এক ঘেয়েমি । তাই একটু স্বস্থি চাই । মন ভালো করতে চাই ঘুরে বেড়াণো । তাই সময় পেলে ঘুরে আসা যাক খাগড়াছড়ির বৈচিত্রময় রূপ লাবন্যময় দৃশ্য উপভোগ করে । আনন্দ আর অজানা জ্ঞান দুটোই আহরন হবে এখানে। খাগড়াছড়ি : বাংলাদেশের দর্শনীয় জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি জেলা হচ্ছে খাগড়াছড়ি। পাহাড়-পর্বত, ঝর্না বেষ্টিত এই জেলাটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য খুবই পছন্দের। ঢাকা হতে খাগড়াছড়ির দূরত্ব হচ্ছে ২৬৬ কিলোমিটার । খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মোট আয়তন ২৭০০ বর্গ কিলোমিটার। এর স্থানীয় নাম চেংমী। এই জেলার উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা, পূর্বে ভারতের মিজোরাম রাজ্য ও ত্রিপুরা রাজ্য এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলাও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য অবস্থিত। খাগড়াছড়ি একটি নদীর নাম। নদীর পাড়ে খাগড়া বন থাকায় একে খাগড়াছড়ি নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রকৃতি অকৃপণভাবে সাজিয়েছে খাগড়াছড়িকে। স্বতন্ত্র করেছে বিভিন্ন অনন্য বৈশিষ্ট্যে। এখানে রয়েছে আকাশ-পাহাড়ের মিতালী, চেঙ্গী ও মাইনী উপত্যকার বিস্তীর্ণ সমতল ভূ-ভাগ ও উপজাতীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্যতা। মহালছড়ি, দীঘিনালা, পানছড়ি, রামগড়, লক্ষ্মীছড়ি, মানিকছড়ি, মাটিরাঙ্গা যেদিকেই চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। ১৭০০ সালে এই এলাকাটি কার্পাস মহাল নামে পরিচিত ছিল। তৎকালিন এর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোঃ এর সাথে একযুদ্ধে পরাজিত হয়ে তুলা (কার্পাস) ট্যাক্স হিসাবে দিতে হতো। দর্শনীয় স্থান/ আলুটিলা : খাগড়াছড়ির অন্যতম একটি দর্শনীয় পর্যটনকেন্দ্র হলো আলুটিলা। সৌন্দর্যের ঐশ্বর্যময় অহঙ্কার খাগড়াছড়ি শহরের প্রবেশ পথ আলুটিলা। জেলা সদর থেকে মাত্র ৮ কি:মি: পশ্চিমে এ আলুটিলা। এ টিলার মাথায় দাঁড়ালে সমগ্র শহর হাতের মুঠোয় চলে আসে। শহরের ছোট খাট ভবন, বৃক্ষ শোভিত পাহাড়, চেংগী নদীর প্রবাহ ও আকাশের আল্পনা মনকে অপার্থিব মুগ্ধতায় ভরে তোলে। প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণের জন্য টিলায় একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারও আছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি চমৎকার ডাকবাংলোও রয়েছে এখানে। আগ্রহী পর্যটকগণ ইচ্ছে করলে রাত্রিযাপনও করতে পারেন। খাগড়াছড়ি শহর থেকে ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে মাটিরাঙ্গা উপজেলার আলুটিলা পযর্টন কেন্দ্রে রয়েছে একটি রহস্যময় গুহা। স্থানীয়রা একে বলেন মাতাই হাকড় বা দেবতার গুহা। তবে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে অবস্থিত বলে সবার কাছে আলুটিলা গুহা নামেই পরিচিত। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় খাগড়াছড়িতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে এলাকার জনগন এই পর্বত থেকে বুনো আলু সংগ্রহ করে তা খেয়ে বেঁচে ছিল। তারপর থেকে এই পর্বতটি আলুটিলা নামেই পরিচিতি পায়। এখনো আলুটিলায় প্রচুর পরিমান বুনো আলু পাওয়া যায়। হৃদয় ছুয়ে যাওয়ার মতো এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এক কথায় অতুলনীয়। নাম আলুটিলা হলেও এটি খাগড়াছড়ি জেলার সব চেয়ে উচু পর্বত। আলুটিলার আগের নাম ছিল আরবারী পর্বত। আর এর উচ্চতা সমুদ্র সমতল হতে ৩০০০ ফুট। আলুটিলা রহস্যময় সুড়ঙ্গে যেতে প্রথমেই পর্যটন কেন্দ্রের টিকেট কেঁটে ভীতরে প্রবেশ করতে হয়। ফটকের দুই পাশে দুটি শতবর্ষী বটবৃক্ষ ভ্রমণকারীদের স্বাগত জানায়। পর্যটন কেন্দ্রের ফটক দিয়ে প্রবেশ করে ডান পাশের রাস্তা দিয়ে মিনিট খানেক হাঁটলেই চোখে পড়বে একটি সরু পাহাড়ীপথ। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে গেছে এই পথটি। আর সে পথটি বেয়ে নিচে নামলেই সবার জন্য অপেক্ষা করবে প্রথম চমক ছোট একটি ঝর্না। তবে এখানে পাহাড়ী লোকজন ঝর্নার পানি আটকে রাখার জন্য একটি বাঁধ দিয়েছে। তারা এই পানি খাবার ও অন্যান কাজে ব্যবহার করেন। ফটক হতে বাম দিকের রাস্তা বরাবর হাঁটার পর দেখা মিলবে রহস্যময় সেই গুহার। গুহাতে যাবার আগে রয়েছে একটি বিশ্রামাগার ও ওয়াচ টাওয়ার। তার সামনে দিয়ে রাস্তা চলে গেছে আলুটিলা গুহার মুখে। আগে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে হতো গুহামুখে। কিন্তু এখন পর্যটন কর্পোরেশন করে দিয়েছে একটি পাকা রাস্তা। পাকা রাস্তা শেষে প্রায় ৩৫০টি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার পর পাওয়া যাবে কাঙ্খিত সেই আলুটিলা গুহা। গুহাটি খুবই অন্ধকার এবং খুব শীতল। সূর্যের আলো প্রবেশ করে না বলে মশাল নিয়ে ভীতরে প্রবেশ করতে হয়। তবে না বললেই নয়, আলুটিলা গুহা একেবারেই পাথুরে গুহা। গাঁ ছম ছম করার মতো পরিবেশ। সুরঙ্গের তলদেশ পিচ্ছিল এবং পাথুরে। এর তলদেশে রয়েছে একটি ঝর্না প্রবাহমান। আলুটিলার এই মাতাই হাকড় বা দেবতার গুহা সত্যিই প্রকৃতির একটি আশ্চর্য খেয়াল। দেখতে অনেকটা ভূগর্ভস্থ টানেলের মতো। গুহার ভীতরে জায়গায় জায়গায় পানি জমে আছে, রয়েছে বড় বড় পাথর। রীতিমতো রূপকথার সেই গুহার মতোই। গুহাটির এপাশ দিয়ে ঢুকে ওপাশ দিয়ে বের হতে সময় লাগে ১০ থেকে ১৫ মিনিট। গুহাটি উচ্চতা মাঝে মাঝে এতটাই কম যে, নতজানু হয়ে হাটতে হয়। সব কিছূ মিলিয়ে মনে হবে যেন সিনেমার সেই গুপ্তধন খোঁজার পালা চলছে। বিশ্বে যতগুলো প্রাকৃতিক রহস্যময় গুহা আছে আলুটিলা সুরঙ্গ তারমধ্যে অন্যতম।প্রচার প্রচারণার ভাল উদ্যোগ থাকলে এটি হতে পারে ভ্রমন পিপাসু পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্পট। আলুটির আরেকটি দর্শণীয় স্থান হলো সুরঙ্গ বা রহস্যময় গুহা ।পাহাড়ের চূড়া থেকে ২৬৬ টি সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমেই গুহামুখ। আলুটিলা সুরঙ্গের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮২ ফুট। দেবতার পুকুরঃ সমুদ্র সমতল হতে ৭০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের চূড়ায় মাতাই পুখিরী অর্থাৎ দেবতার পুকুর। মূল সড়কের ধাওে মাইসছড়ি বিদ্যালয় থেকে পশ্চিমে ৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই চোখে পড়বে দেবতার পুকুর। দেবতার পুকুরের অনেক বৈশিষ্ট্য। চারদিকে পহাড় বেষ্টিত বলে পুকুর পাড়ে যখন দাঁড়াবেন তখন এটি যে কতো উঁচুতে অবস্থিত তা উপলব্ধি করতে পারবেন না। মনে হবে আপনি সমতলেই দাঁড়িয়ে আছেন। দুই একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত এই পুকুরের পানিতে গাছের পাতা পড়ে না। যদিওবা পড়ে, তা চলে আসে কিনারে। অদ্ভূত ব্যাপার। শীত-গ্রীষ্মে কখনই পুকুরের পানি শুকায় না। থাকে সব সময় টলটলে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির তীর্থক্ষেত্র এই দেবতার পুকুর রোগ-ব্যাধি, আপদ-বিপদ থেকে রক্ষা করে বলে তাদের বিশ্বাস।এতো উঁচুতে কীভাবে জলাশয়ের সৃষ্টি হলো তা আসলেই রহস্য। পুকুরের চারদিকে ঘন বন যেন সৌন্দর্যের দেবতা বর নিয়ে দাঁড়িয়ে। কথিত আছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের জল তৃঞ্চা নিবারণের জন্য স্বয়ং জল-দেবতা এ পুকুর খনন করেন। পুকুরের পানিকে স্থানীয় লোকজন দেবতার আশীর্বাদ বলে মনে করেন। প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নরনারী পূণ্যলাভের আশায় পুকুর পরিদর্শনে আসে। কিন্তু বৈসাবির উৎসবের বারতায় নতুন বছরের আয়োজন শুরু হয় দু’দিন আগে থেকে। প্রথম দিন চলে ঘরে ঘরে ফুল তোলার উৎসব। তারপর ফুলের সম্ভার নিয়ে পাহাড়িকন্যারা ছড়া ও চেঙ্গি নদীতে যায় দলবেঁধে। পূজাপর্বের পর সেই ফুল ভাসিয়ে দেয় নদীর জলে। পুরানো বছরের সব অকল্যাণ ও নতুন বছরের মঙ্গল কামনায় বছরের শেষ দিনে সকলে দলবেঁধে যায় মাতাই টিলার দেবতা পুকুরে। পুকুরে স্নানের পর মানত করে উড়িয়ে দেয়া হয় কবুতর। ত্রিপুরা ভাষায় কবুতরকে বলা হয় ‘ফারুখ’। অনেকে আবার বলি দেয় মানত করা ছাগল অথবা মুরগি। নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ সকল বয়সী পাহাড়িদের মিলনমেলায় পরিণত হয় এই দেবতা পুকুর পাড়। জমজমাট মেলায় মুখরিত হয় পুকুর প্রাঙ্গণ। সকল বিভেদ ভুলে পরস্পর নবোদ্যমে যাত্রা শুরু করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির লোকেরা। চৈত্র সংক্রান্তিতে আপনি এখানে বেড়াতে যেতে পারেন এই বৈসাবির উৎসব দেখার জন্য। সত্যি দারুণ এই উৎসব। ভগবান টিলাঃ জেলার মাটিরাংগা উপজেলা থেকে সোজা উত্তরে ভারত সীমান্তে অবস্থিত ভগবান টিলা। জেলা সদর থেকে এর কৌণিক দূরত্ব আনুমানিক ৮৫ কি:মি: উত্তর-পশ্চিমে। সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ১৬০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এ টিলা সম্পর্কে স্থানীয় লোকদের বিশ্বাস, এতো উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে ডাক দিলে স্বয়ং ভগবানও ডাক শুনতে পাবেন। প্রাচীন লোকজন তাই এ টিলাকে ভগবান টিলা নামকরণ করেছিলেন। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি আউট পোষ্টও আছে এখানে। মাটিরাঙ্গা উপজেলা থেকে সোজা উত্তরে ভারতের সীমান্তবর্তী ভগবান টিলা। জেলা সদর থেকে উত্তর পশ্চিমে এর কৌণিক দূরত্ব আনুমানিক ৮৫ কিলোমিটার। সবুজের বুক চিরে আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে বিস্ময় বাড়তে থাকবে। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার ছয়শ’ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এ টিলা সম্পর্কে স্থানীয়দের ধারণা, এ টিলার উপরে দাঁড়িয়ে ডাক দিলে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা শুনতে পান। আর এ কারণেই এ টিলার নামকরণ ভগবান টিলা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর একটি আউট পোস্ট রয়েছে এখানে। ঝর্ণা : আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরেই রিছাং ঝর্ণা। শিরশির ছন্দে হিম শীতল ঝর্ণার বহমান স্বচ্ছ পানি যে কাউকেই কাছে টানবে। এর জন্য মূল সড়ক থেকে কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে যেতে হবে। মাটিরাঙ্গা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রবেশ মুখে একটি গেটসহ পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে বেশ কটি গোল ঘর। নিরাপত্তার জন্য বসানো হয়েছে পুলিশ পাহারা। আর কিছু উন্নয়ন প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছে। হাজাছড়া ঝর্ণা : দীঘিনালা-বাঘাইহাট সড়ক থেকে মাত্র ১শ’ গজ ভিতরে হাজাছড়া ঝর্ণা। হাজাছড়া আবিষ্কার হয় ২০১১ সালে। যারা সাজেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যাবেন, ফেরার পথে হাজাছড়া ঝর্ণার শীতল পানির ছোঁয়া নিতে ভুলবেন না। তোয়ারি মাইরাং ঝর্ণা : ত্রিপুরা শব্দ তোয়ারি মাইরাংয়ের বাংলা অর্থ পানির কূপ। ঝর্ণাটি দীঘিনালা বোয়ালখালীতে অবস্থিত। খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের ভৈরফা ব্রিজ থেকে কিছুটা ভেতরে গেলে ঝর্ণাটির দেখা মিলবে। কাশিং তৈ কলাই ঝর্ণা : ‘কাশিং তৈ কলাই’ এর অর্থ কচ্ছপ পড়ে। স্থানীয় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মতে, এক সময় এ ঝর্ণার পানির সঙ্গে কচ্ছপ পড়ত। সে থেকে এর নাম ‘কাশিং তৈ কলাই’। এটি দীঘিনালা উপজেলার সীমানা পাড়ায় অবস্থিত। খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়ক থেকে মাত্র আধা কিলোমিটারের পথ। দুই মুড়া ঝর্ণা : দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নে অবস্থিত। সড়ক ও পায়ে হাটা পথ মিলে ৫ কিলোমিটার। খাগড়াছড়ি এমন একটি দর্শণীয় এলাকা যার রুপ বর্ননা করে শেষ করা যায়না । কিভাবে যাবেনঃ রাজধানী ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন আরামদায়ক বাস ছাড়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫টি। সাইদাবাদ, কমলাপুর, গাবতলী, ফকিরাপুল, কলাবাগান থেকে টিকেট সংগ্রহ করে এস আলম, স্টার লাইন, শ্যামলী, সৌদিয়া, শান্তি স্পেশাল ও খাগড়াছড়ি এক্সপ্রেসযোগে খাগড়াছড়ি যাওয়া যায়। ভাড়া ৪৫০ টাকা। স্টারলাইন পরিবহনের এসি বাসে ভাড়া পড়বে ৬০০ টাকার মতো। ঢাকা থেকে ট্রেনে ফেনী এসেও হিলকিং অথবা হিল বার্ড বাসে চড়ে খাগড়াছড়ি যাওয়া যায়। চট্টগ্রামের অক্সিজেন থেকেও শান্তি স্পেশাল ও লোকাল বাসে উঠে যাওয়া যায় খাগড়াছড়িতে। আর যাদের নিজস্ব জীপ আছে তাদেরতো তেমন কোন চিন্তাই নেই । খাগড়াছড়ির বৈচিত্রপূর্ণ আপরূপ অবলোকন করতে হলে সেখানে সর্বনিম্ন ৬ দিন থাকতে হয় (যদি আপনার পক্ষে সম্ভব হয়)।তাহলে একবার ভ্রমনেই অনেক কিছু উপভোগ করতে পারবেন ।আর সেখানে থাকার জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল হোটেল । তাছাড়া মধ্যম আয়ের মানুষদের জন্য ও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

বান্দরবানের দর্শনীয় স্থান- বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে বালাঘাটায় রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মন্দির। এটি সম্পূর্ণরূপে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার মন্দিরগুলোর অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৌদ্ধ মুর্তিটি এখানে রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এটি হলো “বুদ্ধ ধাতু জাদি”। এছাড়া শহরের মধ্যেই রয়েছে জাদিপাড়ার রাজবিহার এবং উজানীপাড়ার বিহার। শহর থেকে চিম্বুকের পথে যেতে পড়বে বম ও ম্রো উপজাতীয়দের গ্রাম। প্রান্তিক হ্রদ, জীবননগর এবং কিয়াচলং হ্রদ আরও কয়েকটি উল্লেখ্য পর্যটন স্থান। রয়েছে মেঘলা সাফারী পার্ক, যেখানে রয়েছে দুটি সম্পূর্ণ ঝুলন্ত সেতু। সাঙ্গু নদীতে নৌকা ভ্রমণ, ভ্রমণ পিয়াসীদের জন্য হতে পারে একটি মনোহর অভিজ্ঞতা। বান্দরবান শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শৈল প্রপাত একটি আকর্ষণীয় পাহাড়ি ঝর্ণা।

এছাড়া বাংলাদেশের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং এবং বৃহত্তম পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং এই বান্দরবান জেলাতেই অবস্থিত। মৌসুমগুলোতে এই দুটি পর্বতশৃঙ্গে আরোহন করার জন্য পর্যটকদের ভীড় জমে উঠে। পর্যটকরা সাধারণত বগা লেক থেকে হেঁটে কেওক্রাডং এ যান। অনেকেই আছেন যারা কেওক্রাডং না গিয়ে বগা লেক থেকে ফিরে আসেন। এই হ্রদটিও বিশেষ দর্শনীয় স্থান। হ্রদসন্নিহিত এলাকায় বম উপজাতিদের বাস। এছাড়া অন্যান্য আকর্ষণের মধ্যে আছে:

চিম্বুক পাহাড়

পুরো বান্দারবান জেলাই প্রাকৃতিক দৃশ্যে ভরপুর।বান্দরবান থেকে পুরো রাস্তা আকাবাঁকা উচুনিচু। চিম্বুকে যাওয়ার পথের পাশে রয়েছে অসংখ্য উপজাতির আবাসস্থল। ঘরগুলো মাচার মতো উঁচু করে তৈরি। চিম্বুকের চূড়া থেকে যেদিকে তাকাবেন সেদিকেই শুধু পাহাড় আর পাহাড়। সবুজ-শ্যামল পাহাড়ের দৃশ্য চোখ জুড়ানোর অবস্থা। পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে প্রবাহমান সাংগু নদী যা আপনাকে নিয়ে যাবে অনেক দূরে। স্থানীয় উপজাতীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, চিম্বুকের চূড়ায় দাঁড়িয়ে অনেক সময় মেঘও ধরা যায়।

বান্দারবান থেকে চিম্বুকে যেতে হবে জিপ গাড়িতে। যাকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় চান্দের গাড়ি। চান্দের গাড়িতে গেলে নামতে হবে বুলি বাজারে। ভাড়া করা জিপ নিয়ে সরাসরি চূড়ায় যাওয়া যায়। নিজস্ব জিপ নিয়েও যাওয়া যায়। বান্দরবান জেলা সদর থেকে ৩৬৪ টি ছোট-বড় মোড় অতিক্রম করে ২৬ কিঃমিঃ দূরে চিম্বুকে যেতে হবে।

বান্দারবানে থাকার জন্য রয়েছে নানা রকম আবাসিক হোটেল। এছাড়া সরকারী রেস্টহাউসসহ জেলা পরিষদ, সড়ক ও জনপথ, বন বিভাগ, এলজিইডি ও পার্বত্য জেলা পরিষদের রেস্টহাউসও রয়েছে। এছাড়াও বান্দরবান জেলা থেকে ৪.২ কিঃমিঃ দূরে চিম্বুক সড়কের মিলনছড়িতে রয়েছে দি গাইড টু্রস লিঃ এর হিল সাইড রিসোর্ট। এখানে থাকার জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি মনোরম কটেজ ঘর ও ডরমিটরি। কটেজগুলোর একক ভাড়া ৭৫০ টাকা দুজন ১০০০ টাকা। পুরো কটেজ ভাড়া নেওয়া যায়। বোম ঘরের ভাড়া একক ৪৫০ টাকা, দুজন ৭০০ টাকা, মারমা ঘরের ভাড়া জনপ্রতি ২০০ টাকা, দুজনের ৪০০ টাকা, ডরমিটরির ভাড়া প্রতি বেড ১৫০ টাকা । বেশি বেড নিলে ভাড়া কম।

নীলগিরি

নীলগিরি : বান্দরবান জেলা সদর থেকে প্রায় ৪৭ কিলোইমটার দক্ষিণ পূর্ব দিকে বান্দরবান-থানছি সড়কে পাহাড় চূড়ায় নীলগিরি পর্যটন কেন্দ অবস্থিত। যে কোনো গাড়িতে চড়ে সরাসরি নীলগিরিতে যাওয়া যায়। সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে এর উচ্চতা ২ হাজার ২ শত ফুট। একানকার প্রকৃতির কারুকাজ সবাইকে মুগ্ণ করে । এই রোদ, এই বৃষ্টি, আকাশে মেঘের গর্জন সেই সাথে রংধনুর হাসিমাখা আলোএক রুশ্মি, বাতাসের সাথে ছন্দ আর তাল মিলিয়ে প্রকৃতির বৈবিত্র্যময় এই পরিবর্তনের এই পরিবর্তনের দৃশ্যগুলো পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৭ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্যাটালিয়ন কর্তৃক চিম্বুক-থানচি সড়কটি নির্মাণের সময় ম্রো জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বান্দরবান থানিছ সড়কের কাপ্রু পাড়া এলাকায় প্রথমে নিরাপত্তা চৌকি হিসেবে এটি নিমিত হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাএদর পরিকল্পনায় এটি একটি পর্যটন কেন্দ্রের পূর্ণতা লাভ করে। এখানে মেঘদূত, আকাশনীলা, নীলাঙ্গনা, মারমা হাউজসহ নানা নামের আকর্ষীয় কটেজ রয়েছে। আছে একটি ক্যাফেটেরিয়া। বর্তমানে দেশি বিদেশি পর্যটকরা প্রতিদিনই নীলগিরি ভ্রমণে আসছেন।

দিনের বেলায় এই স্থান থেকে খালি চোখে বঙ্গোপসাগর ও জাহাজ চলাচলের দৃশ্য দেখা যায়। এছাড়া ছোট ছোট পাহাড়ের কোল ঘেয়ে বয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদীর আকাবাকা দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য সকলকে আকর্ষণ রে। আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত এই নীলিগিরি রিসোর্টে অবস্থান ও রাত্রিযাপনের জন্য সেনাবাহিনীর বান্দরবান ব্রিগেড হেডকোয়াটার এর সাথে আগাম যোগাযোগ করতে হয়। প্রকৃতির অপরুপ মনমুগ্ধকর নয়নাভিরাম এই দৃশ্যগুলি পর্যটকদের স্মৃতিতে ধরে রাখার জন্য নীলগিরি রিসোর্ট অত্যন্ত চমকার একটি স্থান। এই স্থানটি অনেকের নিকট বাংলার দার্জিলিং নামে পরিচিত।
মেঘলা পর্যটন কমপেস্নক্স

বান্দরবান- কেরানীহাট সড়কের পাশে পাহাড়বেষ্টিত স্বচ্ছ জলোর মনোরম লেক। বান্দরবান শহর থেকে ৪.৫ কিলোমিটার দূরে এই কমপেস্নক্স রয়েছে চিত্তবিনোদনের নানাবিধ উপকরণ। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটি চিড়িয়াখানাসহ পর্যটন কেন্দটি পরিচালিত হচ্ছে।

প্রবেশ মূল্য : জনপ্রতি ৩০ টাকা

অবস্থান : শহর এথেক ৪ কি: মি: দূরে জেলা পরিষদের বিপরীতে সুন্দর মনোরম পরিবেশে অবস্থিত।

বিশেষ আকর্ষণ : এখানে একটি মনোরম কৃত্রিম হ্রদ, শিশু পার্ক, সাফারী পার্ক, পেডেল বোট, ঝুলন্ত ব্রিজ , চিড়িয়াখানা, পিকনিক স্পট রয়েছে।

অবকাশ : এখানে জেলা প্রশাসন পরিচালিত একটি সুন্দর রেস্ট হাউজ রয়েছে, যেখানে রাত্রিযাপন করা যায়। রেস্ট হাউজটি দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়ায় পাওয়া যায়।

ভাড়া : মেঘলা রেস্ট হাউজে রাত্রিযাপনের জন্য চারটি কক্ষ রয়েছে। প্রতিকক্ষের ভাড়া ২০০০/- (প্রতিদিন)।

বুকিং ভাড়া : ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মেঘলা ০৩৬১-৬২৫০৬, ০১৭১৭২-৭১৮০৫১, ০১৭১৪-২৩০৩৫৪

যাতায়ত :

শহর থেকে চান্দের গাড়ি বেবি টেক্সি, জীপ, কার যোএগ যাওয়া যায়।

বগালেক

সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট বগালেক। কেওকারাডাং এর কোল ঘেঁষে বান্দারবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে এবং রুমা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান।

পাহাড়ের উপরে প্রায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে বগালেক। এ পানি দেখতে প্রায় নীল রঙের। এ লেকের পাশে বাস করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র উপজাতীয় বম ও খুমী সম্প্রদায়। অদ্ভুদ সুন্দর এই নীল রঙ্গের লেকের সঠিক গভীরতা বের করা যায়নি এখনও পর্যন্ত। স্থানীয়ভাবে দুইশ’ থেকে আড়াইশ’ ফুট বলা হলেও সোনার মেশিনে ১৫১ ফুট পর্যন্ত গভীরতা পাওয়া গেছে। এটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ একটি লেক। এর আশেপাশে পানির কোন উৎসও নেই। তবে বগালেক যে উচ্চতায় অবস্থিত তা থেকে ১৫৩ মিটার নিচে একটি ছোট ঝর্ণার উৎস আছে যা বগাছড়া (জ্বালা-মুখ) নামে পরিচিত। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে লেকের পানি প্রতি বছর এপ্রিল থেকে মে মাসে হয়ে যায় ঘোলাটে।

রাত্রি যাপনের জন্য বগালেকে জেলা পরিষদের অর্থায়নে একটি রেষ্টহাউস নির্মান করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় বম উপজাতী সম্প্রসাদায় কিছু ঘর ভাড়ায় দিয়ে থাকে । বগালেকের পাড়েই বসবাসরত বম সম্প্রদায় পর্যটকদের জন্য রান্না-বান্নার ব্যবস্থা করে থাকে । রুমা বাজার থেকে প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার ক্রয় করে নেওয়াই শ্রেয়।

উল্লেখ্য যে, নিরাপত্তার জন্য রুমা ও বগালেক সেনা ক্যাম্পে পর্যটকদের রিপোর্ট করতে হয়। স্থানীয় গাইড ছাড়া পায়ে হেটে রুমা থেকে অন্য কোন পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়া উচিত নয়।
যাতায়তঃ

শুষ্ক মৌসুমে বান্দরবান জেলা সদরের রুমা জীপ ষ্টেশন থেকে রুমাগামী জীপে করে রুমা সেনা গ্যারিসন (রুমা ব্রীজ) পর্যন্ত যাওয়া যায়। সেখান থেকে নৌকায় করে ২০ মিনিট পথ পাড়ি দিয়ে রুমা উপজেলা সদরে যেতে হয়। বর্ষাকালে রুমাগামী জীপ কইক্ষ্যংঝিড়ি পর্যন্ত যায় । তারপর ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে প্রায় ১ ঘন্টার অধিক পথ পাড়ি দিয়ে রুমা সদরে যেতে হয় । রুমা থেকে পায়ে হেটে অথবা জীপে করে বগালেক যেতে হয় । বর্ষা মৌসুমে বগা লেক যাওয়া নিতান্তই কষ্টসাধ্য তাই বগালেক ভ্রমনে শীতকালকে বেছে নেওয়া শ্রেয়ে। বান্দরাবন থেকে রুমা উপজেলা সদরে যেতে খরচ হবে জন প্রতি ৮০/- অথবা পুরো জীপ ভাড়া করলে ২২০০-২৫০০/- আর রুমা থেকে বগালেক যেতে জনপ্রতি ৮০-১০০/- অথবা পুরো জীপ ভাড়া করলে ২২০০-২৫০০/- পর্যন্ত ।
শৈলপ্রপাত

বান্দরবান রুমা সড়কের ৮ কিলোমিটার দূরে শৈলপ্রপাত অবস্থিত। এটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সৃষ্টি। ঝর্ণার হিমশীতল পানি এখানে সর্বদা বহমান। এই ঝর্ণার পানিগুলো খুবই স্বচ্ছ এবং হীম শীতল। বর্ষাকালে এ ঝর্ণার দৃশ্য দেখা গেলেও ঝর্ণাতে নামা দুস্কর, বছরের বেশীর ভাগ সময় দেশী বিদেশী পর্যটকে ভরপুর থাকে। রাস্তার পাশে শৈল প্রপাতের অবস্থান হওয়ায় এখানে পর্যটকদের ভিড় বেশী দেখা যায়। এখানে দুর্গম পাহাড়ের কোল ঘেশা আদিবাসী বম সম্প্রদায়ের সংগ্রামী জীবন প্রত্যক্ষ করা।

বান্দরবান শহর থেকে টেক্সি, চাঁদের গাড়ি কিংবা প্রাইভেট কার ও জীপ ভাড়া করে শৈলপ্রপাতে যাওয়া যায়। শহর থেকে জীপ গাড়ীতে ৬০০-৭০০ টাকা এবং চাঁদের গাড়ীতে ৪৫০-৫০০ টাকা লাগবে।
প্রান্তিক লেক

প্রান্তিক লেক- যেমন তার কাব্যিক নাম, ঠিক তেমনই কাব্যিক আর মোহনীয় রূপ নিয়ে সবুজ আর নীলের আঁচল বিছিয়ে শুয়ে আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য মন্ডিত কুমারী হ্রদটি। বান্দরবান থেকে কেরাণীহাট যাবার পথে হলুদিয়া নামক স্থানে এটি অবস্থিত। কেরাণীহাট থেকে ২০ মিনিট গাড়ি চালালে এ লেকে পৌছানো সম্ভব। জেলা সদর থেকে প্রান্তিক লেকের দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার।

প্রায় ২৯ একর এলাকা নিয়ে প্রান্তিক লেকের অবস্থান। এল,জি,ই,ডি এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই লেকটি একটি অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত স্থান। অপূর্ব সুন্দর এ লেকের চারিপাশ বিভিন্ন প্রজাতির গাছগাছালিতে ভরপুর। লেকের পাশে পাহাড়ে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাস। পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখরিত থাকে সারাটি বেলা। লেকের নীল জল আর পাড়ের সবুজ বনানী এখানে তেরি করেছে একটি ভিন্ন মাত্রা। গাছের শীতল ছায়া আর নির্মল বাতাস আপনার সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবে। চাইলে লেকের জলে মাছ শিকারে মেতে উঠতে পারেন। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এখানে মাছ শিকার করা সুযোগ রয়েছে।। সেটা হবে আপনার জন্য একটি বাড়তি পাওনা। অথবা পরিবার পরিজন নিয়ে আয়েশ করে ঘুরে বেড়াতে পারেন প্যাডেল বোট নিয়ে। সারাদিন নিরিবিলিতে সময় কাটানোর জন্য এটি একটি আদর্শ জায়গা। পর্যটকদের যাতায়তের জন্য কর্তৃপক্ষ উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। পাশেই রয়েছে সেনাবাহিনীর ফায়ারিং রেঞ্জ। চাইলে ঘুরে দেখতে পারেন।
যেভাবে যেতে হবে:

বান্দরবান শহর থেকে প্রান্তিক লেকের দুরত্ব মাত্র ১৪ কিলোমিটার। বান্দরবান শহর থেকে চট্টগ্রাম বা কেরাণীহাট গামী বাসে হলুদিয়া নামক স্থানে নেমে টেক্সি বা রিক্সা করে ৩ কিলোমিটার যেতে হবে যা অনেকটা কষ্টসাধ্য। বান্দরবান শহর থেকে টেক্সি বা ল্যান্ড ত্রুজার রির্জাভ করে নিয়ে যাওয়াই ভাল।

কোথায় থাকবেন:

প্রান্তিক লেকে খাবার ও রাত্রি যাপনের কোন ব্যবস্থা নেই। দিনে এসে দিনেই ফিরে যেতে হবে। এখানে পর্যটকদের নিজেদের খাবার ও পানি নিয়ে যেতে হবে। রাত্রি যাপনের জন্য মেঘলা অথবা বান্দরবান শহরে ফিরে যেতে হবে।
তাজিংডং বিজয়

বাংলাদেশের তিনটি পার্বত্য জেলার মধ্যে একটি বান্দরবান, বাংলাদেশের সবচেয়ে কম জনবসতিসম্পন্ন স্থান। বাংলাদেশের ভিতরে, বান্দরবানকে ঘিরে রয়েছে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি। অন্যদিকে রয়েছে মায়ানমারের চিন প্রদেশ এবং আরাকান প্রদেশের সীমান্ত। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং (১০০৩ মিটার) বান্দরবান জেলায় অবস্থিত, যা “বিজয়” বা “মদক মুয়াল” নামেও পরিচিত। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্বতশৃঙ্গ “কেওক্রাডং” (৮৮৩ মিটার) এবং সর্বোচ্চ খাল “রাইখিয়াং” এই জেলায় অবস্থিত।

অবস্থানঃ রুমা উপজেলা

দূরত্বঃ বান্দরবান সদর হতে প্রায় ৭০ কিলোমিটার

যাতায়াতঃকেবলমাত্র শুষ্ক মৌসুমে গাড়ি করে কাছাকাছি পৌঁছা সম্ভব। বান্দরবান সদর হতে অথবা রুমা উপজেলা সদর হতে চাঁন্দের গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়।

রাত্রিযাপনঃ রুমাতে জেলা পরিষদসহ অন্যান্য রেস্ট হাউসে থাকার সুবিধা আছে।
কেওক্রাডং

কিভাবে যাওয়া যায়:

বগালেক থেকে শুষ্ক মৌসুমে চাঁন্দের গাড়িতে পাহাড় চূড়ায় পৌছা যায়। তবে এ জাতীয় গাড়ির সংখ্যা খুবই কম বিধায় গমনের পূর্বেই গাড়ী ভাড়া করতে হবে। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কেওক্রাডং পাহাড় সফর করেছেন। তিনি এখানে একটি স্মৃতি ফলক উন্মোচন করেন।

কেওক্রাডং :

এটি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পবতশৃঙ্গ। এর উচ্চতা প্রায় 4330 ফুট।

অবস্থান : রুমা উপজেলা।

দূরত্ব : রুমা উপজেলা সদর হতে 30 কি. মি.। (বগালেক থেকে 15 কি. মি দূরত্ব)

বিশেষ পরামশ : বগালেক থেকে শুষ্ক মৌসুমে চাঁন্দের গাড়িতে পাহাড় চূড়ায় পৌছা যায়। তবে এ জাতীয় গাড়ির সংখ্যা খুবই কম বিধায় গমনের পূর্বেই গাড়ী ভাড়া করতে হবে।

এছাড়াও উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে-

বাকলাই ঝরণা
বুদ্ধ ধাতু জাদি
চিনরি ঝিরি ঝরণা
ফাইপি ঝরণা
জাদিপাই ঝরণা
মেঘলা
মিরিংজা পর্যটন
নাফাখুম
রেমাক্রি
নীলাচল
থানচি
পতংঝিরি ঝরণা
রাজবিহার
উজানিপারা বিহার
রিজুক ঝরণা
সাংগু নদী

রাঙ্গামাটির দর্শনীয় স্থান-নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক অপার লীলাভূমি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা। এখানে পাহাড়ের কোল ঘেঁসে ঘুমিয়ে থাকে শান্ত জলের হ্রদ। সীমানার ওপাড়ে নীল আকাশ মিতালী করে হ্রদের সাথে, চুমু খায় পাহাড়ের বুকে। এখানে চলে পাহাড় নদী আর হ্রদের এক অপূর্ব মিলনমেলা। চারিপাশ যেন পটুয়ার পটে আঁকা কোন জল রঙের ছবি। কোন উপমাই যথেষ্ট নয় যতটা হলে বোঝানোয় যায় রাঙ্গামাটির অপরূপ সৌন্দর্য। এখানকার প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অদেখা এক ভূবন যেখান আপনার জন্য অপেক্ষা করছে নয়ানাভিরাম দৃশ্যপট।

রাঙ্গামাটিতে ভ্রমন করার জন্য রয়েছে অনেকগুলো দর্শনীয় স্থান। এর মধ্যে কাপ্তাই লেক, পর্যটন মোটেল, ডিসি বাংলো, ঝুলন্ত ব্রিজ, পেদা টিংটিং, সুবলং ঝর্না, রাজবাড়ি, রাজবন বিহার, উপজাতীয় জাদুঘর, কাপ্তাই হাইড্রো ইলেক্ট্রিক প্রজেক্ট, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে কাপ্তাই হ্রদ ভ্রমন অন্যতম। কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ নির্মানের ফলে সৃষ্টি হয় সুবিশাল কাপ্তাই হ্রদ। মূলত পানি বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য এই বাঁধ নির্মিত হয়। অসংখ্য পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা আঁকাবাঁকা বিশাল কাপ্তাই হ্রদে নৌবিহারে অনুভূতি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। দেশীয় ইঞ্জিন নৌকা,লঞ্চ, স্পিডবোটে দিনভর নৌবিহার করা যেতে পারে। মজার ব্যাপার হলো আপনি চাইলে এই হ্রদ ঘুরতে ঘুরতেই দেখে ফেলতে পারবেন রাঙ্গামাটির অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো। রাঙ্গামাটি শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে আপনি ট্রলার বা বোট ভাড়া করতে পারবেন। পর্যটন থেকেও বোট ভাড়া করা যায়, তবে রেট একটু বেশি। রিজার্ভ বাজার থেকে বোট বা ট্রলার ভাড়া করলে একটু কম দামে পাওয়া যাবে। তবে পর্যটনের বোট বা ট্রলারের মতো দেখতে সুন্দর না বলে অনেকে সেগুলো ভাড়া নিতে চান না।

কাপ্তাই হ্রদ ভ্রমনের জন্য একটু ভোরে ভোরে রওয়ানা হওয়াই উত্তম। হ্রদের মাঝখান দিয়ে নৌভ্রমন আপনার মনে এমনই এক সুখস্মৃতি তৈরি করবে যা আপনি কখনোই ভূলতে পারবেন না। যে দিকে তাকাবেন কেবল পানি আর তার মাঝে মাঝে ছোট ছোট টিলা। লাল মাটির টিলাগুলোর গাঁয়ে সবুজের সমারোহ, যেন এগুলো ঢেকে আছে সবুজ কার্পেটে। অসহ্য সুন্দর যে দৃশ্য। কখনো ডানে কখনো বামে আবার কখনো বা মনে হবে সম্মুখে সীমাহীন পথ। এখানে জল, পাহাড় আর আপনি ছাড়া আর কিছুই নেই চারিদিকে। এ এক অসাধারন অনুভুতি। কখনো কখনো বেশ বড় বড় পাহাড় আপনার চোখে পড়বে। এর দৃষ্টিনন্দন শীলা খন্ড আপনার নজর কাড়বেই। মন চাইবে উড়াল দিয়ে চলে যাই সেখানে। চাইলে অবশ্য যেতেও পারেন। একটু কষ্টসাধ্য- এই আর কি।

ঝুলন্ত ব্রিজ ও পর্যটন মোটেল

রাঙ্গামাটি শহরের শেষ প্রান্তে কাপ্তাই হ্রদের তীর ঘেঁষে অবস্থিত সরকরি পর্যটন মোটেল। পর্যটকদের জন্য খুবই দৃষ্টিকাড়া ও আকর্ষনীয় স্থান এটি। পর্যটন মোটেলেই অবস্থিত ঝুলন্ত ব্রিজটি, যা পর্যটন এলাকাকে আরও বেশি সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দিত করেছে। সহজেই পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে এটি। পর্যটকদের প্রধান আকর্ষনের কারনে এবং এর নির্মানশৈলির কারনে ঝুলন্ত ব্রিজ আজ রাঙ্গামাটির নিদর্শন হয়ে দাড়িয়ে আছে। পর্যটকরা সাধারণত প্রথমেই এই পর্যটন মোটেল এবং ঝুলন্ত ব্রিজে আসে। এখান থেকে শুরু হয় রাঙামাটি ভ্রমণ। এখানে পর্যটনের বোট ভাড়া পাওয়া যায়। এই বোট ভাড়া নিয়ে কাপ্তাই হ্রদে ভ্রমণ করতে করতে যাওয়া যায় সুভলং, পেদা টিং টিং, টুকটুক ইকো ভিলেজ, চাং পাং, বৌদ্ধ মন্দির, কাপ্তাই শহর সহ নানা জায়গায়। এক দিনে সব জায়গায় যাওয়া সম্ভব নয়। সন জায়গায় ঘুরতে চাইলে রাঙামাটিতে থাকতে হবে ২/৩ দিন।

পেদা টিং টিং + চাং পাং

কাপ্তাই হ্রদের চারিদিকে কেবল পাহাড় আর হ্রদ, যেন প্রকৃতির মাঝে আপিন এক আগন্তুক মাত্র। বুনো প্রকৃতি ছাড়া আর কিছুই আশা করা যায় না এখানে। কিন্তু আপনি অবাক হবেন যখন চলতি পথে কোন একটি টিলার উপর দেখবেন পেদা টিং টিং এবং চাং পাং। এমন এক পরিবেশে যেখানে আপনি এক গ্লাস খাবার পানি পাবেন না, সেখানে এই দুইটি রেষ্টুরেন্ট আপনার জন্য চা, কফি আর চিকেন ফ্রাই নিয়ে অপেক্ষা করছে। সত্যিই হতবাক করার মত ব্যাপার। এছাড়াও এখানে পাবেন স্থানীয় খাবার “বিগল বিচি”, “কচি বাঁশের তরকারী”, “কেবাং”। পেদা টিং টিং একটা চাকমা শব্দগুচ্ছ, যার অর্থ হচ্ছে পেট টান টান। অর্থাৎ মারাত্মকভাবে খাওয়ার পর পেটের যে টান টান অবস্থা থাকে, সেটাকেই বলা হয় পেদা টিং টিং। রাঙ্গামাটি শহর থেকে মাত্র ৪-৫ কিলোমিটার দূরে কাপ্তাই হ্রদের ভসমান একটি পাহাড়ে অবসথিত এই পর্যটন সংস্থা। এখানে রেস্তোরা, কটেজ, নৌবিহার ব্যবস্থা, সেগুন বাগান ও অসংখ্য বানর রয়েছে। ইচ্ছে করলে মনোজ্ঞ কোন অনুষ্ঠানও আয়োজন করা যায়। শুধু তাই নয় আপনি চাইলে রাত্রিযাপনও করতে পারবেন। এখানে থাকার জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি কক্ষ সদৃশ ঘর।

টুকটুক ইকো ভিলেজ

চারিদিকে পানি বেষ্টিত শান্ত একটি দ্বীপের মত এই টুকটুক ইকো রিসোর্ট। নানা ধরনের গাছ এবং ফুলের সমারোহ আছে এখানে। এখানে এসে পৌছলেই একধরনের শান্তি উপভোগ করবেন। রাঙামাটিতে গেলে কখনই এক দিনে পুরোটা ঘুরে শেষ করতে পারবে না কেউ। এক রাত থাকতেই হবে আপনাকে। রাত কাটানোর কাজটা আপনারা সেরে নিতে পারেন এই টুকটুক ইকো ভিলেজেই। এখানে কয়েকটি রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে। সবগুলো রিসোর্টই পাহাড়ের কিনারায় কাঠের ভিত্তির উপড় তৈরী (ছবিতে দেখবেন)। ধারনা করছি সেগুলো খুবই সাধারন। প্রতি রুম ১ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়। এক রুমে ৩ জন পর্যন্ত থাকতে পারবেন। সুতরাং তুলনামুলক অনেক সস্তা। এই সব রিসোর্টে ইলেক্টট্রিসিটির ব্যবস্থা করা হয়েছে সোলার এনার্জির মাধ্যমে। রাখা আছে জেনারেটর ও।

সুবলং ঝরনা

রাঙ্গামাটির অন্যতম সুন্দর দর্শনীয় স্থান এটি। চমৎকার একটি জলপ্রপাত এই স্থানকে দিয়েছে ভিন্ন একটি চরিত্র। রাঙ্গামাটি শহর থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরে অবসথিত মনোরম এই ঝরনাটি। এ ঝর্নার রূপ আপনাকে মোটেও আশাহত করবে না। সময়টি যদি হয় বর্ষাকাল তবে আপনি সত্যিই ভাগ্যবান বলতে হবে। কেননা এই সময় ঝর্না হয়ে উঠে নবযৌবনা, সয়ম্বরা। অপলক দৃষ্টিতে সে ঝর্নার রূপ আপনি দেখবেন সম্মোহিত হয়। এই স্থানটি বেশ সাজানো গোছানো। ফুলের বাগান, উচু বসার স্থান এবং হাটার জন্য ব্রিজ ও রাস্তা আপনাকে বিমোহিত করবে। ঝর্নাস্নান কিংবা দর্শন শেষে আপনি সামনে এগিয়ে গেলে পাবেন সুবলং বাজার। হ্রদের তীরে অবস্থিত স্থানীয় এই বাজারে রয়েছে একটি সেনা ক্যাম্প। বাজারটি একেবারে ছোট নয়। এখানকার খাবার বেশ সুস্বাদু। দুপুরের খাবারটি চাইলে এখানে সেরে নিতে পারেন। হ্রদ থেকে ধরা মাছের ঝোল আর আলুভর্তা রসনা বিলাসের জন্য মন্দ নয়। তবে সাবধান- এই এলাকায় প্রায়শই বন্য হাতির হামলা হয়ে থাকে। তাই চোখ কান একটু খোলা রাখাই শ্রেয়।

** সুভলং যাওয়া আসার পথেই পড়বে পেদা টিং টিং, চাং পাং এবং টুকটুক ইকো রিসোর্ট। পর্যটন থেকে পেদা টিং টিং, চাং পাং এবং টুকটুক ইকো রিসোর্ট হয়ে সুভলং ঘুরে আবার পর্যটন আসতে ৫-৬ জনের একটা সুন্দর বোটে খরচ পড়বে ১১০০-১২০০ টাকা।

রাজবন বিহার

রাজবাড়ির পাশেই আন্তর্জাতিক খ্যাত এই বৌদ্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি অবস্থিত। এখানে অবস্থান করেন বৌদ্ব আর্য পুরুষ শ্রাবক বুদ্ধু সর্বজন পূজ্য শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাসহবির বনভান্তে। এই বৌদ্ব বিহারে প্রত্যেক বছরের কঠিন চীবর দানোৎসবে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। এছাড়া প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনাথী ও পুণ্যানর্থীর ভিড়ে মুখরিত থাকে রাজবন বিহার এলাকা। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান বৌদ্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বেশ কয়েকটি বৌদ্ব মন্দির, বিশ্রামগার, হাসপাতাল, তাবতিংস স্বর্গসহ অনেক কিছু রয়েছে দেখার মত।

রাজবাড়ি

রাঙ্গামাটি শহরেই অবসথিত রাজবাড়ি। চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় ও তার মা রানী আরতি রায় এ রাজবাড়িতে থাকেন বর্তমানে। চারদিকে হ্রদ বেষ্টিত এই রাজবাড়ি পুরনো হলেও দেখতে ও বেড়াতে ভীষন ভাল লাগে। রাজদরবার, কাচারি, সজ্জিত কামানসহ দেখার মতো অনেক কিছু আছে। রাজবাড়ীর নিরিবিলি পরিবেশ, সবুজ বাঁশের ঝাড় আর পাখির কলকাকলি আপনাকে মহুর্তের জন্য অঁচল করে দেবে। রাজবাড়ীর পাশেই উপজাতীয় নারীরা তাদের হাতে বুনা বস্ত্র সম্ভার নিয়ে বসে থাকে বিকিকিনির জন্য। এসব পন্য আপনার প্রয়োজনের পাশাপাশি মেটাবে রুচির তৃষ্ণা।

উপজাতীয় জাদুঘর

রাঙ্গামাটি শহরের প্রধান রাস্তার পাশেই এই জাদুঘরটি স্থাপিত হয়েছে। উপজাতীয় কৃষ্টি,সংস্কৃতি, জীবনধারার নানান নদর্শন ও ব্যিবহার্য জিনিসপত্র এখানে রাখা হয়েছে এখানে।

যেভাবে যেতে হবে

ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন স্থান হতে রাঙ্গামাটি পর্যন্ত সরাসরি বাস সার্ভিস চালু রয়েছে। ঢাকা হতে বেশ কয়েকটি বাস প্রতিদিন ছেড়ে যায় রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে। শ্যামলী, সায়েদাবাদ, কলাবাগান হতে প্রতিদিনই গ্রীনলাইন, এস.আলম, ইউনিক সার্ভিস বাসগুলো ছাড়ে। এগুলোর মাধ্যমে সরাসরি চলে যেতে পারেন রাঙ্গামাটি; ভাড়া জনপ্রতি ৪৫০ টাকা মত। অথবা ঢাকা বা অন্য জেলা হতে বাস, ট্রেনে কিংবা বিমানে করে যেতে পারেন চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড় হতে লোকাল এবং পাহাড়িকা বাস সার্ভিস রয়েছে রাঙ্গামাটি পর্যন্ত, ভাড়া জনপ্রতি ৮০-১০০ টাকা। সেগুলোর মাধ্যমেও পৌছতে পারেন রাঙ্গামাটি। তবে সরাসরি বাস সার্ভিসই ঝামেলা ও ঝুক্কিমুক্ত।

কোথায় থাকবেন

থাকার জন্য রাঙ্গামাটিতে সরকারী বেসরকারী অনেকগুলো হোটেল ও গেষ্ট হাউজ রয়েছে। তাছাড়া আরো কিছু বোডিং পাওয়া যায় থাকার জন্য। বোডিংগুলোতে খরচ কিছুটা কম তবে থাকার জন্য খুব একটা সুবিধার নয়। নিন্মে কয়েকটি হোটেল এর বর্ননা দেয়া হলোঃ

(১) পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স

১২ টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুম রয়েছ। প্রতিটির ভাড়াঃ ১৮০০-২০০০ টাকা

৭টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রনহীন রুম রয়েছে প্রতিটির ভাড়াঃ ৮০০-১০০০ টাকা

ফোনঃ ০৩৫১-৬৩১২৬

(২) হোটেল সুফিয়া

২৭ টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুম রয়েছ। প্রতিটির ভাড়াঃ ১০০০-১৫০০ টাকা।

৩৫টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রনহীন রুম রয়েছে প্রতিটির ভাড়াঃ ৭০০-৮০০ টাকা

যোগাযোগ ০৩৫১-৬২১৪৫, ৬১১৭৪, ০১৫৫৩৪০৯১৪৯

(৩) হোটেল গ্রীন ক্যাসেল

৭ টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুম রয়েছ। প্রতিটির ভাড়াঃ ১২০০ হতে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত

১৬টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রনহীন রুম রয়েছে প্রতিটির ভাড়াঃ ৭০০ হতে ১৬০০ টাকা পর্যন্ত

যোগাযোগঃ ০৩৫১-৭১২১৪, ৬১২০০, ০১৭২৬-৫১১৫৩২, ০১৮১৫-৪৫৯১৪৬

এছাড়াও রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হোটেল যেমন * হোটেল জজ * হোটেল আল মোবা * হোটেল মাউন্টেন ভিউ * হোটেল ডিগনিটি * হোটেল সাফিয়া * হোটেল ড্রিমল্যান্ড ইত্যাদি। এছাড়া কেউ ইচ্ছা করলে পেদা টিং টিং, টুকটুক ইকো ভিলেজেও থাকতে পারেন