আসছে বৈসাবি সাজছে পাহাড়

0
14

মগ দিয়ে পানি
শংকর চৌধুরী,খাগড়াছড়ি: পার্বত্য চট্টগ্রামে আবহমান কাল ধরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছদ্য অংশ ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসুক, মারমা সম্প্রদায়ে সাংগ্রাই, চাকমা সম্প্রদায়ে বিজু আর বাঙ্গালীদের চৈত্র সংক্রান্তি ও বর্ষবরণ উৎসবকে ঘিরে। বর্ণিল রঙে নানান উৎসবে পাহাড়জুড়ে অহিংসা বন্ধুত্ব ও মৈত্রীর পাহাড়ি বাঙ্গালীর সুদৃঢ় বন্ধনে আসছে বৈসাবি সাজছে পাহাড়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য দু’ জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবানে অন্নান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস থাকলেও খাগড়াছড়িতে ত্রিপুরা, মারমা, চাকমাদের বসবাস বেশি। মূলত তিন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাৎসরিক একটি উৎসবকে বলা হয় (বৈসাবি) । অহিংসা বন্ধুত্ব ও মৈত্রীর সুদৃঢ় বন্ধনে পাহাড়ের এই জন পদ। আর এ সময় বহুমুখী কৃষ্টি-সংস্কৃতির বর্ণিল শোভায় শোভিত হয় সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি ঘরে ঘরে। নানান ঐতিহ্য নিয়ে প্রতিবারের মত এবারও বৈসাবিতে পাহাড় আর সমতলের মানুষের মাঝে ঘটবে মিলনমেলা এমনটায় প্রত্যাশা সকলের।

আর তায় ঘরে ঘরে বিরাজ করছে সাজ সাজ রব, সন্ধ্যার পর দোকান গুলোতে উপচেপড়া ভীড়। কেউ কিনছে কাপড়, কেউ ঘর সাজানো জিনিসপত্র। আবার কেউ উৎসবে আগত অতিথিদের আপ্যায়নের বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনায় ব্যস্ত। জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা মানুষগুলো শহর ছেঁড়ে আসতে শুরু করেছে। এরইমধ্যে শহরসহ প্রত্যন্ত এলাকায় চলছে বর্ষ বিদায় এবং বর্ষ বরণের শেষ প্রস্তুতি।

লেখক ও গবেষক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানান, বৈসু- তিন দিনব্যাপী এ ‘বৈসু’ উৎসব পালন করে থাকে ত্রিপুরা সম্প্রদায় । প্রথমদিন হারি বৈসু ,দ্বিতীয় দিন বৈসু এবং শেষ দিন বিশিল কাতাল। হারি বৈসুতে ত্রিপুরা তরুণ-তরুণীরা বন জঙ্গল থেকে ফুল সংগ্রহ করে। তারপর বাড়ি ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে ফুল দিয়ে সাজায়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং সাজানো থেকে বাদ পড়েনা গৃহপালিত পশু পাখিরাও।
মগ দিয়ে পানি ২
দ্বিতীয় দিন বৈসুতে সকালবেলা ছোটরা বড়দের কাছথেকে আশির্বাদ প্রার্থনা করে প্রণাম করে । তারপর প্রায় ২৮ কিংবা তারো অধিক প্রজাতির সবজির মিশ্রণে তৈরি করা হয় বিশেষ পাচন। যা আগত অতিথিদের পরিবেশন করা হয়। তৃতীয় দিন ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের দিনপঞ্জী অনুযায়ী নতুন বছর। ওইদিন ছোটরা বড়দের গোসল করিয়ে বস্ত্র দান করেন এবং মন্দিরে মন্দিরে পূজা এবং নানান আনুষ্টানিকতা দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয়।

সাংগ্রাই উদযাপন কমিটির সভাপতি মংচিনু মারমা জানান, প্রতিবছরের মতো এবারো মারমা সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব সাংগ্রাই মহাসমারোহে পালিত হবে। এটি মারমা সম্প্রদায়ের উৎসব হলেও জেলার বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের অংশগ্রহণে তা হয়ে ওঠে সর্বজনীন।

সাংগ্রাই-মারমা সম্প্রদায় চার দিন ধরে সাংগ্রাই পোয়ে উৎসব উদযাপন করে থাকেন। প্রথম দিনকে সাংগ্রাইং আক্রো বা সাংগ্রাই এর আবাহন, দ্বিতীয় দিনকে সাংগ্রাই আক্যোয়া, তৃতীয় ও চতুর্থ দিনকে সাংগ্রাইং অ্যাথা বলা হয়।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন থেকে মূলত মারমাদের ঐতিহ্যবাহী মৈত্রী পানিবর্ষণ উৎসব শুরু হয়। তৃতীয় চতুর্থ দিন পর্যন্ত এ পানিবর্ষণ উৎসব চলে। পাড়ায় পাড়ায় ছেলে-বুড়ো, তরুণ-তরুণী সবাই মৈত্রী জলধারায় সিক্ত করে অন্যকে। মারমা নারী-পুরুষ পৃথক দলে বিভক্ত হয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পানিবর্ষণ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। সাধারণত নারী দলের জন্য একটি নৌকা ভর্তি করে পানি রাখা হয়। আর পুরুষ দলের জন্য পানি রাখা হয় বড় ড্রামে। অন্য দলের সদস্যের হাত থেকে পানির পাত্র পড়ে গেলে, কেউ হাত দিয়ে মুখের পানি মুছলে বিচারের রায় ক্রমশ তাদের বিপক্ষে চলে যায়। এভাবে মারমা গানের সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট সময় বিচারকরা প্রতিযোগিতার রায় ঘোষণা করেন।
এ চার দিনই বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, অতিথি আপ্যায়ন,বিশেষ পাচন রান্না পিঠা পুলি করে উৎসব উদযাপন করে থাকে। এ পানিবর্ষণ উৎসবের মধ্যদিয়েই মারমারা বিদায়ী বছরের সমস্ত দুঃখ-বেদনা, পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপড়েন ধুয়ে মুছে ফেলে নতুন বছরের জন্য একে অপরের বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করে নেয়। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী পিঠা উৎসবসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যদিয়ে সপ্তাহব্যাপী মারমা জনপদগুলো মুখরিত হয়ে ওঠে।

বিজু-চাকমা জাতিগোষ্ঠী তিনদিন ধরে এ বিজু উৎসব উদযাপন করে থাকে। তাদের ধারণা, চৈত্রমাসের শুরুতেই একটি পাখি এসে বিজু বিজু বলে ডাক দিয়ে যায়, তারা এই পাখিকে বিজু পেইক বা (বিজু পাখি) বলে। এই পাখি সু-মধুর কলতানে বিজু উৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। বিজু পাখি আসার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে চাকমারা। বাংলা বর্ষপঞ্জী হিসাবে বছরের শেষ দুই দিন, অর্থাৎ, ২৯ চৈত্র ফুল বিজু আর ৩০ চৈত্র মূল বিজু পালন করে। ফুল বিজুর দিন নদীতে ফুল ভাসিয়ে উৎসবের সূচনা করে,মূল বিজুর দিন চাকমারা ভোরে উঠে দল বেঁধে ফুল তুলতে বের হয় এবং এরপর নদীতে স্নান করে। তারপর সারাদিন পাড়ায় পাড়ায় বেড়ানো, পিঠা তৈরি, ১৫-২০ পদের বিভিন্ন রকম পাজন তরকারি রান্নার ধূম পড়ে যায়। নববর্ষের প্রথম দিনটি ওদের ভাষায় গর্যাপর্যার দিন (গড়াগড়ি খাওয়ার দিন)। এই দিন খাওয়া দাওয়া এবং পূজা-পার্বণের ধূম পড়ে যায়। এছাড়া, চাকমা চারণ কবি গেংখুলিরা গ্রামে গ্রামে গেংখুলি গান গেয়ে বেড়িয়ে নববর্ষের আনন্দকে আরো বাড়িয়ে তোলে।

এদিকে পাহাড়ে বাংলা নববর্ষ এবং বৈসাবি উদযাপন উপলক্ষে পার্বত্য জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন, ক্ষদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। তারই অংশ হিসেবে ৭ এপ্রিল ক্ষদ্র্র ন-ৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে শুরু হয়েছে ৪দিন ব্যাপী বৈসাবি উৎসব।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী জানান, বৈসাবি আমাদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব। এ উৎসবকে ঘিরে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে ১১ এপ্রিল বর্ণাঢ র‌্যালি, গুণীজন সংবর্ধনা ও পৌর টাউন হলে জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তিনি আশাবাদ ব্যথ করে বলেন বিগত বছরের মত এবারও উৎসবমুখর পরিবেশে পাহার বাসী ‘বৈসাবি’ উৎসব উদযাপন করতে পারবে।