ঈদ উৎসবের যৌক্তিকতা

0
3

ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা:

ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করার সঠিক পদ্ধতি হলো একে অপরকে ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ বলে দোয়া করা। (মাজমাউজ যাওয়াইদ : ৩২৫৫)। এর অর্থ হলো, আল্লাহ আমাদের এবং তোমার পক্ষ থেকে কবুল করুন। অর্থাৎ ঈদুল ফিতরে রোজা আর ঈদুল আজহায় হজ ও কোরবানি আল্লাহ যেন কবুল করে নেন।

রোজার আনুষ্ঠানিক প্রতিদান প্রদানের জন্যই ঈদুল ফিতর। রমজান সমাপ্তির পর শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠার মাধ্যমে ঈদের রাত শুরু হয়। ঈদের রাতকে প্রতিদান প্রদানের রাত হিসেবে নামকরণ করা হয়। কাজেই ঈদের রাত ইবাদত-বন্দেগি ও রোজা কবুলের প্রার্থনার মাধ্যমে অতিবাহিত করা উচিত। ‘হজরত আবু উমামা (রা.) নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে সওয়াবের নিয়তে ইবাদত করল, তার অন্তর সেদিন মরবে না যেদিন অন্যদের অন্তর মরে যাবে।’ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা তার ইবাদত কবুল করে তাকে অমর করে রাখবেন। (সুনানু ইবনে মাজাহ : ১৭৮২)। প্রতিদান প্রাপ্তি আনন্দ ও খুশিরই মুহূর্ত হয়ে থাকে। এটিই ঈদের আনন্দ ও খুশির যৌক্তিকতা। কাজেই ঈদের আনন্দ যথার্থ তাদেরই, যারা সেদিন পুরস্কার ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে। ইবাদতের প্রতিদান লাভের আনন্দ প্রকাশÑ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া জ্ঞাপনের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। ইবাদতের প্রতিদান প্রাপ্তির আনন্দ অনাচারের মাধ্যমে প্রকাশ পেলে নিঃসন্দেহে তা হবে ক্ষতিকর, অযৌক্তিক এবং অন্তÍরের (কলব) মৃত্যুবরণ। কাজেই ঈদ উদযাপনে থাকবে ভারসাম্যতা, নৈতিকতা, আল্লাহভীতি ও শৃঙ্খলা। বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ছোটদের প্রতি স্নেহবোধ আর এতিম-অসহায়দের প্রতি সহমর্মিতা ঈদ উৎসবকে সফল ও সমৃদ্ধ করে তুলবে। ঈদের সব আনুষ্ঠানিকতা হবে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে। পানাহারসহ সব ক্ষেত্রেই আল্লাহর স্মরণ হবে চূড়ান্ত লক্ষ্য। হজরত নুবায়শা আল-হুজালি (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মনে রেখো, এ দিনগুলো হলো পানাহারের দিন এবং মহামহিম আল্লাহর জিকির করার দিন।’ (আবু দাউদ : ২৮১৫; তিরমিজি : ৭৭৩; নাসাঈ : ৪২৩০; ইবনে মাজাহ : ১৭২০)।

ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় : ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করার সঠিক পদ্ধতি হলো একে অপরকে ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ বলে দোয়া করা। (মাজমাউজ যাওয়াইদ : ৩২৫৫)। এর অর্থ হলো, আল্লাহ আমাদের এবং তোমার পক্ষ থেকে কবুল করুন। অর্থাৎ ঈদুল ফিতরে রোজা আর ঈদুল আজহায় হজ ও কোরবানি আল্লাহ যেন কবুল করে নেন।

গোসল, মেসওয়াক, পোশাক ও সুগন্ধির ব্যবহার : রাসুল (সা.) ঈদের দিনের প্রস্তুতির মধ্যে প্রথমেই গোসল করতেন, মেসওয়াক করতেন এবং শরিয়তসম্মত পদ্ধতির সাজগোজ করতেন। এ সাজগোজের মধ্যে রয়েছে উত্তম ও পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা এবং আতর-খুশবু, তেল-সুরমা ইত্যাদি ব্যবহার করা। জুমার দিন হলো সাপ্তাহিক ঈদের দিন। সাপ্তাহিক ঈদের জন্যও এসব প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। তাহলে ঈদের জন্য অবশ্যই এসব প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন গোসল করেছেন।’ (ইবনে মাজাহ : ১৩১৫)।

মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য খাওয়া : রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজর নামাজের পর সূর্যোদয়ের কিছু পরে ঈদগাহে যেতেন। সাধারণত ঈদুল ফিতরের দিন বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেয়ে ঈদগাহে যেতেন। অবশ্য ঈদুল আজহায় কিছু না খেয়েই ঈদগাহে যেতেন। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘নবী (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। অন্য এক বর্ণনায় আনাস (রা.) নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেতেন।’ (বোখারি : ৯১০)। হজরত বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত। ‘নবী (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খেয়ে বের হতেন না। আর ঈদুল আজহার দিন নামাজ না পড়া পর্যন্ত খেতেন না।’ (তিরমিজি : ৫৪২)।

সাদকাতুল ফিতর আদায় করা : রাসুল (সা.) সাদকাতুল ফিতর আদায় করেই ঈদের নামাজে যেতেন। এতে গরিব-মিসকিনদের ঈদ পালন সহজ হয়। নামাজের আগেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করতে পারে। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। ‘রাসুল (সা.) লোকদের ঈদের নামাজে বের হওয়ার আগেই সাদকায়ে ফিতর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৩৩৬)।

ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করা : স্বাভাবিক আবহাওয়ায় রাসুল (সা.) ঈদগাহেই ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। তবে বৃষ্টির কারণে একবার মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। তখন নবী (সা.) মসজিদে নববিতে সাহাবিদের নিয়ে ঈদের নামাজ পড়লেন। (সুনানু আবি দাউদ : ১১৬২; ইবনে মাজাহ : ১৩১৩)।

হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া ও যাওয়া-আসায় পথ পরিবর্তন করা : রাসুল (সা.) হেঁটে ঈদগাহে যেতেন। হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘সুন্নত হলো ঈদগাহের দিকে হেঁটে যাওয়া এবং ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগে কিছু খাওয়া।’ (তিরমিজি : ৫৩০)। হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) ঈদের দিন নামাজ আদায়ের জন্য যাওয়া-আসায় পথ পরিবর্তন করতেন।’ (বোখারি : ৯৪৩)।

তাকবির বলা : রাসুল (সা.) ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবির বলতেন। তাকবির হলোÑ ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ অর্থÑ আল্লাহ সব কিছুর চেয়ে বড়, আল্লাহ সব কিছুর চেয়ে বড়, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আর আল্লাহ বড়, আল্লাহই বড়। সব প্রশংসা তাঁরই জন্য।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ কর।’ (সূরা বাকারা : ২০৩)। হজরত সালেম ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) তাকে বলেছেন, ‘রাসুল (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবির বলতেন।’ (দারু কুতনি : ৬)।

ঈদের নামাজ : ঈদের নামাজ ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামাজের বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে কখনও তা পরিত্যাগ করেননি। বরং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তা আদায় করেছেন। ঈদের দিন ঈদের নামাজের আগে ও পরে কোনো নফল ও সুন্নত নামাজ নেই। নেই কোনো আজান ও ইকামত। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। ‘নবী (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন দুই রাকাত নামাজ পড়েছেন। এর আগে ও পরে কোনো নামাজ পড়েননি।’ (বোখারি : ৯২১; মুসলিম : ২০৯৪)।

রোজায় শিক্ষা জিইয়ে রাখা : বিভিন্নভাবে রোজা পালনে তাকওয়ার অনুশীলন ও প্রশিক্ষণ হয়ে থাকে। প্রয়োজন শুধু সে তাকওয়াকে ধরে রাখা। বছরজুড়ে বরং জীবনজুড়ে সে তাকওয়ার আলোকে জীবন পরিচালনা করা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজসহ জীবনের সব শাখা-প্রশাখায় তাকওয়ার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা। তাহলেই আল্লাহ ঘোষিত মুত্তাকির ফলাফল অর্জন করা যাবে। রমজানে তাকওয়ার মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার যে উষ্ণতা মোমিন বান্দা অর্জন করে তার প্রভাব বছর ধরে টিকিয়ে রাখাই বান্দার মূল চ্যালেঞ্জ।