উৎসবমুখর রাজকীয় বিয়ের

0
104

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় মং সার্কেল চীফ বা রাজা’র রাজকীয় বিয়ের পর্ব দুই দিনের উৎসবমুখর আনুষ্ঠানিকতায় শেষ হয়েছে। বর সাচিং প্রু চৌধুরী, বৃটিশ প্রর্বতিত পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্কেল চীফ বা রাজা প্রথা হিসেবে উত্তরাধিকার সূত্রে অধিষ্ঠিত তিন রাজার মধ্যে সবচেয়ে ছোট। কারো কারো মতে তিনি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেই সর্বকনিষ্ঠ। রাজা সাচিংপ্রু চৌধুরী বিয়ে করেছেন নিজের শহর খাগড়াছড়ির পানখাইয়া পাড়ার পূর্ব পরিচিত পছন্দের পাত্রী উখেংচিং মারমাকে। 

বৃহষ্পতিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা থেকে ধর্মীয় নানা আবশ্যকীয় ক্রিয়াকর্মের মাধ্যমে শুরু হয়ে শুক্রবার ভোর রাতেও চলে তার ধারাবাহিকতা। প্রথা অনুযায়ী রাজ পরিবারের বিশে-শাদী বা রাণী (রাজবধু বরণ) প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রজা ও সম্মানীয় ব্যক্তিবর্গদের সামনে বর কনের যৌথ উপস্থিতি এবং রাজ আপ্যায়ন।

শুক্রবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে জেলাশহরের অদূরে মং রাজ বাড়িতে কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষের আপ্যায়নের মাধ্যমে সেটি শেষ হয়েছে। ওই অনুষ্ঠানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে অগণিত মানুষের পদচারণায় রীতিমতো মানুষের মহা সম্মেলনের রুপ ধারণ করে।

বিয়ের পরপরি উখেংচিংকে রাণী হিসেবে বরণ করা হয়। রাণী উখেংচিং মারমা পানখাইয়া পাড়া এলাকার অংক্যজাই মারমা ও সুইনাইচিং মারমার মেয়ে। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন’র পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্ট থেকে গ্রাজুয়েশন করেন। আমেরিকার মিনেসোটা ইউনিভার্সিটি থেকে ফেলোশিপ শেষে বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের আওতায় কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছেন। উখেংচিং’র বাবা অংক্যজাই মারমা মহালছড়ি পরিবার ও পরিকল্পনা বিভাগে উপ-সহকারী কমিউনিটিতে মেডিকেল অফিসার হিসেব কর্মরত এবং মা সুইনাইচিং মারমা খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি অবসরে রয়েছেন। এক ভাই এক বোনের মধ্যে রাণী উখেংচিং বড়।

রাজা সাচিং প্রু চৌধুরী’র এই বিয়েতে শুক্রবার পার্বত্যমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি, খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী পদ-মর্যাদার শরণার্থী টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান কুজেন্দ লাল ত্রিপুরা, রাঙামাটির এমপি দীপংকর তালুকদার, নারী সাংসদ বাসন্তী চাকমা, সাবেক সচিব ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, সচিব সুদত্ত বিকাশ চাকমাসহ তিন পার্বত্য জেলার সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ছাড়াও দাতা সংস্থা’র প্রতিনিধিরাও সাড়ম্বরে যোগ দেন।

২০০৮ সালের ২২ অক্টোবর এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় রাজা পাইহ্লাপ্রু চৌধুরী’র মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের ১৭ জানুয়ারী অল্প বয়সে রাজ্যভার গ্রহণ করেন বর্তমান রাজা সাচিংপ্রু চৌধুরী। তিনি ঢাকা স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলবি কোর্স করেন। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে রাজা সাচিংপ্রু চৌধুরী সবার ছোট। দীঘিনালা, মহালছড়ি ও লক্ষীছড়ি উপজেলার কিছু অংশ ব্যতিরেকে খাগড়াছড়ি পুরো জেলার আওতাধীন মং সার্কেল।
১৮৭০ সালে মং সার্কেল, চাকমা সার্কেল ও বোমাং সার্কেল নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে ৩টি পৃথক  রাজা প্রথার সূচনা হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন রাজা বীর মুক্তিযোদ্ধা মংপ্রু সাইন বাহাদুর পরলোক গ্রহণ করার পর তাঁহার সহ-ধর্মিনী রাণী নীহার দেবী রাজ্যভার গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বার্ধক্য জনিত রোগের কারণে তিনিও ১৯৯১ সালে পরলোক গমন করেন।

পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে মং রাজার মংপ্রু সাইনের ভ্রাতুষপুত্র জেলা তথ্য কর্মকর্তা পাইহ্লাপ্রু চৌধুরী রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৮ সালে বিদেশে একটি সফর শেষে ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় রাজা পাইহ্লাপ্রু চৌধুরী মারা যান। এর পরবর্তীতে কম বয়সী পুত্র সাচিংপ্রু চৌধুরী রাজ সিংহাসন আরোহণ করেন।