একুশ আমার চেতনা

0
70

প্রত্যক জাতির একটি নিজস্ব ভাষা থাকে। সে ভাষায় নাগরিকরা কথা বলে। মনের ভাব বিনিময় করে যে ভাষার মাধ্যমে জাতির সামাজিক, রাজনৈকি ও সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটে। এ মায়ের ভাষাতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বাঙালি সংগ্রাম করে রক্ত দিয়ে পৃথিবীর মাঝে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ভাষার জন্য সংগ্রাম, রক্তদান বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। ১৯৫২ সালে বাঙালির এ ভাষা আন্দোলন এক অনন্য ইতিহাস। এ আন্দোলনে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাকে যুবকরা মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করেছে। এ আত্মত্যাগেই মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশ ভাগের পর হতেই বাংলা ভাষাকে লড়াইয়ে নামতে হয় উর্দুর প্রতিপক্ষ হিসেবে। ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে আলীয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদই প্রথম বাংলাকে উর্দুর প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেন। তিনি বলেন, ভারতে যেমন হিন্দি রাষ্ট্রভাষা হতে যাচ্ছে, পাকিস্তানেও তেমনি উর্দু রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। সঙ্গে সঙ্গে এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী প্রতিবাদ এসেছিল। বাংলার জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ‘দৈনিক আজাদ’-এ এক প্রবন্ধে বলেন, অধিকাংশ জনসংখ্যার ভাষা হিসাবে বাংলাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। বস্তুত ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দেয়া যায়। পাকিস্তানের কোনো অঞ্চলের মানুষের মাতৃভাষা উর্দু নয়। পাকিস্তান জন্মেও পর তিন মাসের মধ্যেই ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই করাচি শিক্ষাসম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের উদ্যোগে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে একটি প্রস্তাব পাস করে দেয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সুদুরপ্রসারী। সে বছর ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রাজপথে তৎকালীন পূর্ববাংলা ছাত্রসামাজ এর বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ প্রদর্শন করে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ লাগাতার সংগ্রামের ফসল হিসেবে পূর্ববাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ছাত্রদের কাছে আত্মসমর্পন করেছিলেন এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদার সে বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ২১ মার্চ রেসকোর্সেও জনসভায় এবং ২৪ মার্চ কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা দেন। সঙ্গে সঙ্গে ছাত্র-জনতার মধ্যে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে এবং তা ক্রমান্বয়ে তীবতর হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালি ঢাকার রাজপথে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা ও স্বীকৃতি আদায় করেছিল। তাই আজ বাঙালির মায়ের ভাষা বাংলা, প্রাণের ভাষা বাংলা। বাঙালির এ আন্দোলন, এ অর্জন আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি। ১৯৯১ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো বাংলাভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটা বাঙালি জাতির জন্য এক বিরাট অর্জন। এদেশের ইহিহাসে এক উজ্জ্বল মাইলফলক। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে সারা বিশ্বে উদযাপিত হচ্ছে।
২১ আমাদের চেতনা, বাঙালি জাতিরসত্ত্বার এক অনন্য প্রতীক। এক একুশই আমাদের প্রেরণা। তাই বাংলা ভাষাকে শুদ্ধভাবে চর্চা ও প্রয়োগ করতে হবে সর্বত্র। তাতেই একুশের রক্তদানের সার্থকতা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সকলের প্রতি রইলো অনন্ত শুভেচ্ছা।

বইমেলা বাঙালি সংস্কৃতির অংশ

বইমেলা প্রাণের মেলা। বইমেলা আজ শুধু বইয়ের আড়ং নয়, এক বিশাল ব্যাপ্তি এ মেলার। বইয়ের এ মেলা আজ বাঙালির সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষের চেতনায় বইয়ের মেলা এক বিস্ময় জাগানো প্রেরণা।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ঢাকার মতো স্বকীয় পরিসরে চট্টগ্রামেও একুশে উপলক্ষে বইমেলা অনুষ্ঠিত হতো ডিসি হিল, শহীদ মিনার-মুসলিম হল অঙ্গনে। পরে সিটি কর্পোরেশনও দু’একটি মেলা করেছিল। কিন্তু এ মেলার আয়তন খুব বেশি নয়। মানুষের মনেও তেমন সাড়া পড়েনি। অবশ্য পরবর্তীতে সাহিত্যে সংস্কৃতিমনা বইপ্রেমী মানুষের মন মেলার প্রতি কিছুটা ঝুঁকেছিল। ধীরে ধীরে প্রতি বছরের মেলার ব্যাপ্তি বাড়তে থাকে। কিন্তু এবারের মেলা ব্যতিক্রম। জিমনেসিয়ামের বিশাল এলাকাজুড়ে এ মেলার প্রাঙ্গণ। প্রতিদিন মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নান্দনিক মেলার আয়োজন বিশাল এক শিক্ষিত জনগোষ্ঠির মনে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। তবে মেলার প্রচার প্রয়োজনের তুলনায় কম। তবুও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে ধন্যবাদ এককভাবে সুন্দর এক মেলা আয়োজনের সাফল্যের জন্যে।
এ মেলায় প্রতিদিন হাসবো পাঠক-দর্শকের পদচারণা। শুধু বই কেনা নয়। মেলা তখন সকল শ্রেণির মানুষের ঘুরে বেড়ানোর স্থান, সুস্থ সংস্কৃতিমনাদের বিনোদন কেন্দ্র, আত্মীয়-বন্ধু, ছাত্র-শিক্ষক, শিশু-কিশোর যুবক সকল শ্রেণির জনতার মিলন মেলা। এ মেলা জনমনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে তথ্য প্রযুক্তির ফলে অনেকে বইয়ের প্রতি অনাগ্রহী। এমেলার বৈচিত্র তাদের মনে দোলা দিন এ প্রত্যাশা। সকলে বই কিনুক, বই পড়–ক, বিশ্বকে জানুক নিজেকে ঋদ্ধ করে গড়ে তুলুক। তবেই জনমানস ও জাতীয় চেতনা সমৃদ্ধ হবে। বই জ্ঞানের আধার, আনন্দের আধার। তাই বই কিনুন, বই পড়–ন- এ আহবান সকলের প্রতি।