কিংবদন্তী আবদুর রহমান বয়াতি আর নেই

0
11

আব্দুর রহমান বয়াতিছোটবেলায় সঙ্গীতের টানে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শিশুটি ক্রমেই পরিণত হন কিংবদন্তী শিল্পীতে। সুরের ভেলায় চড়ে শুধু দেশই নয়, পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে ফিরেছেন তিনি। অবশেষে সোমবার তিনি থামলেন। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর গতকাল ভোরে থেমে গেল আবদুর রহমান বয়াতির দেহঘড়ি। ‘পৃথিবীকে যেমন আছে তেমনই’ রেখে সবকিছুকে স্মৃতির মণিকোঠায় গেঁথে দৃষ্টিসীমানার ওপারে পাড়ি জমালেন কিংবদন্তী এই লোকসঙ্গীতশিল্পী। সকাল সাড়ে ৭টায় তিনি জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি….রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৮। স্ত্রী খাতুন জারা, তিন ছেলে- মহিউদ্দিন, আলম ও আজিম এবং ও তিন মেয়ে_ সুবু তারা, নূরজাহান ও রুনা বেগমসহ তিনি রেখে গেছেন বহু ভক্ত, অনুরাগী ও গুণগ্রাহীদের। তার মৃত্যুতে সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া, সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে।
আবদুর রহমান বয়াতির মেজো ছেলে আলম বয়াতি যায়যায়দিনকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আব্বা ফুসফুসের সমস্যা, উচ্চরক্তচাপ ও কিডনি জটিলতাসহ নানা বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। গত মাসের ১৮ তারিখে তাকে হাসপাতাল ভর্তি করা হয়। ভর্তি করার পর থেকেই তাকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় তার লাইফ সাপোর্ট খুলে দেয়া হয়।’ তিনি জানান, আবদুর রহমান বয়াতি হাসপাতালে আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ কে এম শফিকুর রহমানের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
আলম বয়াতি জানান, বর্তমানে আবদুর রহমান বয়াতির মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে মঙ্গলবার বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হবে। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নিয়ে যাওয়া হবে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ী এলাকায়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানেই একটি ভাড়া বাড়ি থাকতেন। সেখান থেকে তার শেষ ইচ্ছানুযায়ী দয়াগঞ্জ পঞ্চায়েত কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।
এদিকে, সকালে আবদুর রহমান বয়াতির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেহঘড়ি : পৃষ্ঠা ১৫ কলাম ৭
শোকের ছায়া নেমে আসে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে। তবে বিস্ময়কর হলেও সত্য বাউলশিল্পী আব্দুল কুদ্দুছ বয়াতি ছাড়া আর কেউই তাকে শেষ দেখা দেখতে যাননি। দুপুরে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে দলটির যুগ্ম-মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান, সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও জাসাস নেতা চিত্রনায়ক উজ্জ্বল হাসপাতালে তাকে দেখতে যান।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ছেলে আলম বয়াতি যায়যায়দিনকে বলেন, ‘আব্বা সারাজীবন শুধু দিয়েই গেছেন। জীবনের ৬৭টি বছর তিনি গানের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। সেই আব্বাকে দেখতে কেউ এলো না। আব্বা সরকারের পক্ষ থেকেও কখনো কোনো সম্মাননা পাননি। আমাদের নিজেদের থাকারও কোনো জায়গা নেই। এ অবস্থায় আমরা আমাদের পরিবারের ভবিষ্যত নিয়েও শঙ্কিত।’ অশ্রুসজল কণ্ঠে আলম বয়াতি সরকারের কাছে একটি স্থায়ী ঠিকানার দাবি জানান। একই সঙ্গে তার মাথায় প্রচুর ঋণ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আবদুর রহমান বয়াতিকে শেষবারের দেখতে এসে আব্দুল কুদ্দুছ বয়াতি বলেন, ‘১৯৭৮ সালে আমি প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে তার বাড়িতেই উঠি। তিনি আমাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখতেন। তার আশীর্বাদ ও সহযোগিতার কারণেই আমি আজকের এই অবস্থানে। তাকে নিয়ে অনেক আনন্দ-বেদনার স্মৃতি রয়েছে, যা বলে শেষ করা যাবে না।’
ক্ষোভমিশ্রিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘সরকার ও শিল্পী সমাজের কাছে অনুরোধ, এভাবে একজন শিল্পীকে চলে যেতে দেবেন না। কী নিদারুণ কষ্টে, অনাদরে চলে গেলেন তিনি। এভাবে যেন আর কেউ না যায়, সে বিষয়টি সবাই লক্ষ্য রাখতে হবে।’
১৯৩৯ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকার সূত্রাপুর থানার দয়াগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন আবদুর রহমান বয়াতি। বাবা মৃত তোতা মিয়া, মা মৃত আজমেরী বেগম। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। মাত্র দশ বছর বয়সেই সুরের নেশায় ঘর ছেড়ে পালিয়ে যান বয়াতি। এরপর গানকে তিনি জীবনের পাথেয় করে তোলেন। ফলে অষ্টম শ্রেণির পর আর পড়ালেখা হয়নি গুণী এই মানুষটির। কিন্তু জীবন থেকে শিক্ষা থেকে তিনি রচনা করে চলেন একের পর এক জীবনমুখী গান। তার গানের গুরু ছিলেন কবি আলাউদ্দিন বয়াতি। তার ৫০০টিরও অধিক অডিও গানের অ্যালবাম রয়েছে। এছাড়া ৫টি মিক্সড অ্যালবাম ও ৩টি ভিডিও অ্যালবাম রয়েছে। ‘মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি’ ছাড়াও তার অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে_ ‘মরণের কথা কেন স্মরণ করো না’, ‘মা আমেনার কোলে ফুটল ফুল’, ‘দিন গেলে আর দিন পাবি না’, ‘ঘুড্ডি হয় তিনতলা’, ‘হাতের মাঝে ভাঙল হাঁড়ি’, ‘পিরিতে কইরাছে কাঙালি’, ‘একদিন চিঠি দিয়ে, ‘আমার মাটির ঘরে’, ‘এত সুন্দর রঙমহল ঘর’, ‘আমি মরলে কেন’, ‘আমার এত সাধের রংমহল ঘর ইঁদুরে কেটে বিনাশ করতেছে’, ‘আমার মাটির ঘরে ইঁদুর ঢুকেছে’, ‘হাঁটের মাঝে ভাঙল হাঁড়ি’ ইত্যাদি।
১৯৮২ সালে আবদুর রহমান বয়াতি নিজ নামে বাউল দল গড়ে তোলেন। তিনি দোতরা, হারমনিয়াম, খঞ্জনি ও ভায়োলিন বাজাতে চমৎকার। তিনি বাউল গান নিয়ে সমগ্র বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, কানাডা, চীন, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ৪২টি বাউল গান নিয়ে ভ্রমণ করেন। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতারের বিশেষ গ্রেডের শিল্পী ছিলেন। তিনি ‘কসাই’, ‘অসতী’ ও ‘হৃদয় থেকে হৃদয়’ নামে তিনটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ওই তিনটি ছাড়াও কণ্ঠ দিয়েছেন ‘গুনাহগার’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’ চলচ্চিত্রে। ‘পরানের গহীনে’ নামের একটি নাটক ও খান আতাউর রহমানের পরিচালনায় ‘ফারাক্কা’ নামের একটি ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
১৯৯৫ সালে ফিডব্যাকের সঙ্গে বের হয় ‘দেহঘড়ি’ নামে একটি অ্যালবাম। শুধু একটি গান দিয়ে অ্যালবামটি সাজানো হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের বাউল সঙ্গীত অ্যালবাম প্রকাশের একটি মাইলফলক হিসেবে এখনো বেশ পরিচিত।
তিনি মাটি ও মানুষকে উপজীব্য করেই বেশিরভাগ গান বেঁধেছেন আবদুর রহমান বয়াতি। স্বকীয় গায়কি ঢংয়ের মাধ্যমে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও অগণিত শ্রোতাকে গুণী এ শিল্পী। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সিনিয়রের আমন্ত্রণে একবার হোয়াইট হাউসে আয়োজিত জাঁকালো এক অনুষ্ঠানেও গান গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন তিনি।
আবদুর রহমান বয়াতি শুধু গান গেয়েই নয়, বিজ্ঞাপনচিত্রে অভিনয় করেও মানুষকে সচেতন করতেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞাপনচিত্রের মধ্যে রয়েছে_ হাঁসমুরগির খামার, নিরক্ষরতা, শিশু শিক্ষা, পঞ্চম জাতীয় পোলিও টিকা দিবস, বনের শোভা পশু পাখি, ধূমপানবিরোধী বিজ্ঞাপন, নির্বাচনী প্রচারণা, ৮৮’র বন্যা, খরার সময়ে বৃষ্টির প্রয়োজন, পরিবার পরিকল্পনা ইত্যাদি।
তিনি রাষ্ট্রীয় কোনো পদক বা সম্মান না পেলেও ৬৭ বছরের বর্ণাঢ্য সঙ্গীতজীবনে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। এর মধ্যে রয়েছে_ সিটিসেল চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, সোলস অ্যাওয়ার্ড, শিল্পকলা একাডেমী গুণীজন সংবর্ধনা, নজরুল একাডেমি সম্মাননা, স্বদেশ ও সংস্কৃতি স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ সোসাইটি অব নিউ জার্সি, জাগরিণী শিল্পীগোষ্ঠী (আমেরিকা) ইত্যাদি।
২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটি অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশনের সময় অসুস্থতা বোধ করেন আবদুর রহমান বয়াতি। এরপর জীবনে আর কোনো অনুষ্ঠানে গান গাইতে পারেননি তিনি।