চীনে কমিউনিস্ট শাসনের ৭০ বছর

0
42

মাও সেতুংয়ের প্রকাণ্ড প্রতিকৃতির উপরে বানানো হয়েছে বিরাট মঞ্চ। সেখান থেকেই প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিচের রাজপথে তাকিয়ে দেখছেন, মহড়ায় প্রদর্শনের জন্য একের পর এক ভয়ালদর্শন সব সমরাস্ত্র আসছে। চীনে কমিউনিস্ট শাসনের ৭০ বছর উপলক্ষে এ ছিল যেন পেশী শক্তির মহড়া। কী ছিল না সেখানে? আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যাতে একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র বহন করা যাবে। ছিল ড্রোন যেটি হামলা চালাতে পারবে নিখুঁতভাবে। সবুজ ইউনিফর্মধারী সৈন্যদের বহনকারী অজস্র ট্যাংক ও আর্মার্ড পারসনেল ক্যারিয়ার। বর্তমান যুগে বৈশ্বিক মঞ্চে চীনের উপস্থিতি ব্যাপক। ফলে ওয়াশিংটন, মস্কো বা হ্যানয়, বিদেশিরা খুবই সতর্কভাবে এ ধরনের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করেন।
তারা জানতে চান শি জিনপিংয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য আসলে কী। তারা বুঝতে চান, অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে চীন রাজনৈতিক ও সামরিক হুমকি কিনা। মঙ্গলবার যে উৎসবের মধ্য দিয়ে পালিত হলো কমিউনিস্ট শাসনের ৭০ বছর তার মধ্য দিয়ে চীন কিন্তু স্পষ্ট এক বার্তা দিয়েছে।

এই মহড়ার পাশাপাশি দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিকায়নের মধ্য দিয়ে শি জিনপিং ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা বিশ্বকে বলতে চান- আমরা লড়াই করতে প্রস্তুত, যা কিছু আমাদের, তা দখলে নিতে বা রক্ষা করতে আমরা প্রস্তুত। তারা দেখাতে চায় যে, উনিশ ও বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপিয়ান শক্তিধর দেশগুলো ও জাপান যে চীনকে নিয়ে ছেলেখেলা করেছে, আজকের চীন তা নয়। তবে চীনের নেতারা তাদের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সীমারেখাও কিছুটা বুঝতে পারছেন। বিশ্বজুড়ে চীনের শীর্ষ কূটনীতিকরা উত্তেজনা নিরসনের চেষ্টা করছেন। স্বাগতিক দেশকে তারা বোঝাতে চান যে চীন কোনো আগ্রাসনকারী নয়।

উত্তেজনা নিরসন হলেই প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা বাণিজ্যযুদ্ধ সমাপ্তির পথে সহায়ক হবে। চীনের বৈশ্বিক উপস্থিতিকে সীমিত করতে নেয়া বিভিন্ন নীতি দমানো সম্ভব হবে। হংকং, শিনজিয়াং ও তিব্বতে চীনের অবস্থানের সমালোচনা করেছে যেসব সরকার, তাদের শান্ত করা যাবে।
চীনা নেতৃত্ব স্থানীয় ও কূটনৈতিক ভারসাম্য ধরে রাখতে মরিয়া। দ্বিমুখী বার্তা দেয়া হলে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টা মাঠে মারা যাবে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর সামনে দুর্বল হিসেবে আবির্ভূত হলে, স্থানীয়ভাবে কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করে নিজের ভাবমূর্তি পোক্ত করার যেই প্রচেষ্টা, তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ এশিয়া পরিচালক ইভান এস মেডেইরস বলেন, ‘চীনের কূটনীতি হলো নানাবিধ পরস্পরবিরোধী উদ্দেশ্যের মধ্যে সার্বক্ষণিক ভারসাম্য রক্ষা। কিন্তু সঠিক ভারসাম্য অর্জনে অতটা সফল নয় তারা।’

শি জিনপিংয়ের ৪ বছরের শাসনামলে এটি দ্বিতীয় সামরিক মহড়া। অথচ, মাও সেতুংয়ের পর কোনো দলীয় নেতা এই মহড়া দেখানোর চেষ্টা করেন নি। তিনি মঙ্গলবার নিজের বক্তব্যে, মাও সেতুংয়ের বিখ্যাত একটি উদ্ধৃতি পুনরাবৃত্তি করেন- ‘চীনের জনগণ উঠে দাঁড়িয়েছে।’ কিন্তু এই উদ্ধৃতিকেই যেন তিনি একধাপ এগিয়ে নিলেন- ‘এই মহান জাতির মর্যাদা নড়বড়ে করতে পারে এমন কোনো শক্তির অস্তিত্ব নেই। কোনো শক্তিই চীনের জনগণ ও জাতিকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে আটকাতে পারবে না।’
এই সামরিক মহড়ার তাবৎ আয়োজন চীনা জনগণকে ঘিরে। কিন্তু এই অনুষ্ঠান থেকে বাইরের বিশ্বের জন্যও আছে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। অন্তত বেইজিংয়ের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর চায়না’র উপ-পরিচালক অধ্যাপক চেং শিয়াওহে এমনটাই মনে করেন। তার মতে মূল বার্তা হলো- ‘যদি চীনকে কোনো যুদ্ধে যেতেই হয়, সেজন্য চীন প্রস্তুত। চীনের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে চ্যালেঞ্জ যারা চ্যালেঞ্জ করবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে চীন পিছপা হবে না।’

বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডংফেং-৪১ যেভাবে উন্মোচন করা হয় এই মহড়ায়, তাতে এই বক্তব্যই ফুটে উঠে। চীনের রাষ্ট্র-মালিকানাধীন জাতীয়তাবাদী পত্রিকা গ্লোবাল টাইমসের প্রধান সম্পাদক হু শিজিন নিজেও তার গর্বের কথা লুকাতে পারেন নি। ডংফেং-৪১ মিশাইলের পাশ দিয়ে কালো সেডানে চড়ছেন শি জিনপিং, এমন একটি ছবি শেয়ার দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘৪ বছর আগে যখন এটি তৈরি হচ্ছিল, তখন আমি এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি ছুঁয়ে দেখেছিলাম। এটাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। স্রেফ একে শ্রদ্ধা করুন। শ্রদ্ধা রাখুন চীনের প্রতি যারা এর মালিক।’

পরের টুইট বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘এগুলো থেকে বার্তা হলো, চীনা জনগণের সঙ্গে ঝামেলা করো না বা ভয় দেখিও না। কিন্তু চীনা জনগণ তোমাদের উস্কানি দেবে না।’
এই মহড়া থেকে যেন ওয়াশিংটনের উদ্বেগের প্রতিধ্বনিই উঠে এলো। ট্রাম্প প্রশাসনের মন্ত্রিসভার সদস্যরা, বিশেষ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইতিমধ্যেই বলছেন যে, চীন পশ্চিমের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর আধিপত্য করতে চায়। শি জিনপিংয়ের ঘোষণা এবং হংকং, শিনজিয়াং ও তিব্বতে তার সরকারের কড়া নীতি পশ্চিমের এই ধারণাই জোরদার করে যে, পশ্চিমা কাঠামো ও মূল্যবোধের প্রতি চীন আক্রমণাত্মক এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
কিন্তু গত সপ্তাহেও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে এক নৈশভোজে ভিন্ন বার্তাই দিতে চাইলেন। তিনি বলেন, ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ফের একটি কঠিন জায়গায় এসে হাজির হয়েছে। কিছু মানুষ আছে যারা যেকোনো উপায়ে চীনকে বিরাট প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখাতে চায়। নিজেদের ভবিষ্যদ্বাণী প্রচার করে বড়াচ্ছে যে, এই সম্পর্ক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। কিন্তু সত্য হলো যে, গত ৪০ বছরে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্কের মাধ্যমে দুই দেশই ভীষণ লাভবান হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে গেম অব থ্রোন্স খেলার কোনো ইচ্ছা চীনের নেই।’

নিজের বক্তব্যে ‘থুসিডাডস ফাঁদ’ নামে একটি তত্ত্বের কথাও উল্লেখ করেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই তত্ত্ব্ব মূলত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাহাম অ্যালিসনের, যার মূল কথা হলো, উদীয়মান শক্তি ও প্রতিষ্ঠিত শক্তির মধ্যে যুদ্ধ অনেকটা অবশ্যম্ভাবী। শি জিনপিং নিজেও এই তত্ত্বের কথা নিজের বিভিন্ন বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন ও জোর দিয়ে বলেছেন এই ফাঁদ এড়িয়ে চলতে চান তিনি।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেডেইরোস অবশ্য বলছেন, ‘চীন এখনো ভালো করে বুঝতে পারছে না যে অন্যান্য দেশ তাকে কীভাবে দেখে। কেবল ভালো সংবাদ পেতেই চীন অভ্যস্ত, খারাপ সংবাদ নয়। অথচ, দেশটির আচরণ থেকে অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে প্রচুর। নিজের রাজনৈতিক কাঠামোর কারণেই হয়তো চীন কৌশলগত সংযমের নীতি গ্রহণে অপারগ।’

তবে নব্বইয়ের দশকেও চীনা নেতারা এমন ছিলেন না। যেসব বিদেশি কর্মকর্তা ‘চীনা হুমকি তত্ত্ব’ প্রচার করতেন, তাদের কাছে চীনা কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলতেন যে, চীন স্রেফ একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি চায়না সেন্টারের চেয়ার সুসান এল শার্ক বলেন, ‘এরপর অবশ্য তারা বুঝতে পেরেছে যে, কেবল তাদের মুখের কথা শুনেই সবাই তাদের বিশ্বাস করবে না। তাদেরকে বন্ধুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য প্রমাণ করে এমন কাজ করে দেখাতে হবে।’

অন্তত ২০০৮ সাল পর্যন্ত চীন আশ্বস্ত ও সংযমের নীতিতে চলে। তখন দক্ষিণ চীন সাগরে কী নিয়ম মেনে চলা হবে, সেই সম্পর্কিত একটি বিধিতে সই করে চীন। আমেরিকান নেতৃত্বকে বিঘ্নিত না করে বহুদেশীয় বিভিন্ন সংগঠনে যোগ দেয়। এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রস্তাব দেয়। সুসান শার্ক বলেন, এখন অবশ্য শি জিনপিং সব ধরনের সংযম প্রদর্শনের পথ পরিত্যাগ করেছেন। তারা এখনো শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যের কথা বলে। কিন্তু বেইজিংয়ের কর্মকাণ্ড মোটেই আশ্বস্ত করার মতো নয়। ফলে ‘চীনা হুমকি তত্ত্ব’ ফের ফিরে এসেছে আলোচনায়।’

সম্প্রতি পিউ রিসার্চ সেন্টারের করা এক জরিপে দেখা গেছে, বহু পশ্চিমা ও এশিয়ান দেশে চীন নিয়ে বৈশ্বিক মতামত ক্রমেই খারাপ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ শতাংশ মানুষই চীনকে নেতিবাচকভাবে দেখে। ২০১৮ সালে এই হার ছিল ৪৭ শতাংশ।
তবে কিছু চীনা কর্মকর্তা এখনো চান মতপার্থক্য গুছিয়ে নিতে। যেমন, মার্কিন বিলয়নিয়ার মাইকেল ব্লুমবার্গ এবার চীনে নিজের নিউ ইকোনমি ফোরাম আয়োজন করার অনুমতি পেয়েছেন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে তাকে চীন থেকে সরিয়ে সিঙ্গাপুরে করতে হয়েছিল এই আয়োজন।

প্রশ্ন রয়েই গেছে আদৌ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে কিনা। আগামী সপ্তাহেই ওয়াশিংটনে বসছে দুই দেশের কর্মকর্তারা। বিদেশি কর্মকর্তারা এ নিয়েও উদ্বিগ্ন যে, সামরিক বা আধা-সামরিক বাহিনী দিয়ে হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হবে চীন।

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেসিকা চেন ওয়েইস বলেন, ‘চীনা সরকার প্রকৃতপক্ষে বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়ে স্থানীয় জনগণকে মুগ্ধ করতেই বেশি আগ্রহী। কিন্তু জাতীয় শক্তিমত্তা ও উত্তেজনাকর বাগাড়াম্বর যদি জনগণ বেশি গ্রহণ করে, তাহলে এটি বিপদ ডেকে আনতে পারে, বিশেষ করে যদি বিদেশি প্রতিপক্ষরাও উত্তেজনা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।’ তার মতে, ‘চীন সরকার আসলে খুব সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়। ঘরে তারা শক্তিমত্তার জানান দিতে চায়। আবার বিদেশি শক্তিতে আশ্বস্ত করতে চায় যে, চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি কোনো হুমকির কারণ নয়।’