“জুমার খুতবা ডটকম” নূরুল ইসলাম ফারুকী হত্যা

0
594

বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট নেতা এবং চ্যানেল আইয়ের ইসলাম অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাওলানা শায়খ নূরুল ইসলাম ফারুকী হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আহলে হাদীস ওয়াল জামায়াতের সাবেক সভাপতি মুজাফফর বিন মহসিনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তিনি পিস টিভির উপস্থাপকও।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইসলামি বক্তব্যের নামে উগ্রবাদী মতবাদ প্রচারকারী ওয়েবপেজ ‘জুমার খুতবা ডটকম’ এ মাওলানা ফারুকীর বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন মুজাফফর। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ‘বুড়ির বড়ই গাছের কাহিনী’ নামে তার একটি ভিডিও ক্লিপে চরম বিদ্বেষী বক্তব্য রয়েছে। এ ধরনের বক্তব্যে এবং গোপন জোগসাজশে ফারুকী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মুজাফফর জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা গোয়েন্দাদের।

এছাড়া আহলে সুন্নাত অনুসারী মাওলানা ফারুকীর বিরোধী মতবাদের মুজাফফর জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের অনুসারী। এই সংগঠনের ওয়েবপেজ বলে পরিচিত ‘জুমার খুতবা ডটকম’ এ তার বক্তব্য আছে। আনসারুল্লাহ প্রধান কারাবন্দি জসিম উদ্দিন রাহমানীর সঙ্গেও মুজাফফরের যোগাযোগ ছিল।

হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের নির্দেশে মুজাফফর বিন মহসিনকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি পুলিশ। তবে রোববার পর্যন্ত ঘটনার দায় স্বীকার করেননি তিনি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক জুলহাস উদ্দিন আকন্দ বলেন, ‘শনিবার রাত ৮টার দিকে মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের আলআমিন মসজিদের সামনে থেকে গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে মুজাফফরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি পিস টিভির উপস্থাপক ও আহলে হাদিসের সাবেক সভাপতি।’

হত্যাকাণ্ডের মোটিভ উদ্ধার হয়নি জানিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কিছুদিন আগে মুজাফফর মাওলানা ফারুকীর বিষয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তার সে বক্তব্যের ভিডিও বার্তা আনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। তার উসকানিতে বা জোগসাজশে হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে এমন সন্দেহে থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

তদন্ত সংশ্লিস্টরা জানান, মাওলানা ফারুকী হত্যাকাণ্ডের পর শেরেবাংলা নগর থানা এবং ঢাকার সিএমএম আদালতে দুটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। থানায় ফারুকীর ছেলে ফয়সাল ফারুকীর দায়েরকৃত হত্যা মামলায় মুজাফফরকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

রোববার ঢাকার মহানগর হাকিম মোহাম্মদ তারেক মইনুল ইসলাম ভুইয়ার আদালতে মুজাফফরকে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। আদালত দুইদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এদিকে তদন্ত সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইসলামি বক্তা মুজাফফর বিন মহসিনের বাড়ি রাজশাহী। তিনি মাঝে-মধ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবরসহ কয়েকটি এলাকায় আসতেন। মাওলানা ফারুকী হত্যাকাণ্ডের পর তার বিরুদ্ধে ওয়েবপেজ, ব্লগ ও ফেসবুকে অপপ্রচারের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে। ফারুকীকে মাজার পূজারি, দাজ্জাল, খাজাবাবাসহ বিভিন্ন নাম দেয়ার পাশাপাশি হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। ইউটিউবের ভিডিওচিত্রে ফারুকীর ওপর ক্রসচিহ্ন দেখা গেছে। কারা ভিডিওচিত্রে এসব লিখেছে, তার খোঁজে নামে গোয়েন্দারা। ‘নুরুল ইসলাম ফারুকী দাজ্জাল ও বুড়ির বড়ই গাছের কাহিনী’ শিরোনামে একটি ভিডিওচিত্রের সূত্র ধরে মুজাফফরকে সন্দেহের আওতায় আনে তদন্তকারীরা। আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের ওয়েবপেজ জুমার খুতবা ডটকমে মুজাফফরের চার মিনিট ২৭ সেকেন্ডের ওই বক্তব্যে ফারুকীকে দাজ্জাল ও মুশরিক বলে অভিহিত করা হয়েছে। ভিডিও চিত্রটিতে মুজাফফর বলছেন, তায়েফের এক বুড়ি ১২৫ কিলোমিটার দূরে গিয়ে মহানবী (স.) চলার পথে বড়ই কাঁটা দিতে পারেন না। আর ওই বড়ই গাছ তায়েফের পাহাড়ি এলাকায় থাকতে পারে না। আবু জাহেলের বাড়ি নিয়েও মাওলানা ফারুকী দাজ্জাল মিথ্যাচার করেছেন।’ ফাঁসির কাষ্ঠে যেতে রাজি আছি বলে মুজাফফর বলেন, ‘ এই দাজ্জাল বাংলাদেশে থাকতে পারে না।’

উল্লেখ্য, গত ২৭ আগস্ট রাজধানীর ১৭৪ পূর্ব রাজাবাজারে সন্ধ্যায় নিজ বাসায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং চ্যানেল আইয়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপস্থাপক শায়খ মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারকীকে গলাকেটে হত্যা করা হয়। তিনি ইসলামিক মিডিয়া জনকল্যাণ সংস্থার চেয়ারম্যান ও ফারকী ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও ছিলেন।

তার মৃত্যুর পরই বিরোধী মতবাদের বিরদ্ধে অভিযোগের আঙ্গুল ওঠে। গত ৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্য ফ্রন্টের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সেনার সাধারণ সম্পাদক ইমরান হুসাইন তুষার ফারকী হত্যায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর রোকন তারেক মনোয়ারসহ ছয় জনের বিরদ্ধে আদালতে মামলা করেন। তবে তদন্তে নেমে জেএমবির জঙ্গিদেরই প্রধান সন্দেহভাজন বলে দাবি করে ডিবি। এ মামলায় মুজাফফরসহ ছয় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। তবে কেউই স্বীকারোক্তি দেননি।