নবাবী শাসনে চলছে পশ্চিম পটিয়ার কোলাগাঁও শিল্পাঞ্চলে

0
17

পশ্চিম পটিয়ার শান্তিরহাট, ভেল্লাপাড়া, মোহাম্মদ নগর, কালারপোল, লাখেরা, কোলাগাঁও এলাকার নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় জনসাধারণ। হাত বাড়ালেই এখানে মিলছে বাবা বড়ি ও গুটিখ্যাত মরণঘাতী মাদক ইয়াবা। এ মাদকের নেশায় বুদ হয়ে আছে এলাকার তরুন-কিশোরের বিরাট একটি অংশ। জড়িয়ে পড়ছে নানান অপরাধমূলক কাজে। নেশার টাকার বিনিময়ে একটি অসাধু চক্র নেশাগ্রস্থ কিশোর তরুনদের ব্যাবহার করছে নিজেদের স্বার্থে। কোলাগাঁও, টেক্সগড় এলাকার চরাঞ্চলের জাহাজ শিল্প, ডক ইয়ার্ড ও একের পর এক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জমির দালালী, বালু ভরাট, খাদ্য ও পরিবহন সরবরাহ, ওয়েস্টেজ ক্রয় ব্যাবসা নিয়ন্ত্রনে সামান্য নেশার টাকার বিনিময়ে ডাক দিলেই যারা ধামা-কিরিচ-রড ইত্যাদি দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে প্রকাশ্য দিবালোকে দল বেঁধে এলাকায় ছুটাছুটি করে। ফ্যাক্টরী নির্ভর ব্যাবসা, মাদক কারবার ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রনকে কেন্দ্র করে এনিয়ে মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মলীগ নেতা বাহাদুর হত্যা, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আকবর হত্যাসহ বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটে কোলাগাঁও এলাকায়। প্রশাসনকে চুপ করিয়ে রাখা হচ্ছে সরকার দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও নগদ অর্থের বিনিময়ে। এ বিষয়ে মুখ খুললে বিপদ তার আস্টেপৃষ্টে। অপদস্থ, লাঞ্চনা, হামলা, মামলা, নির্যাতন এমনকি জীবন প্রদীপও নিভে যেতে পারে-এটাকেই প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে লোমহর্ষক যত ঘটনার জন্ম দিয়ে। এখানে একই মাঠে খেলে, একই লেখা পড়ে, একই গাছের ছায়ায় দিনের পর দিন পরম বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতায় বেড়ে ওঠা যুব কিশোরদের মধ্যে স্বার্থের প্রলোভনসহ নানা কৌশলে বিভাজন তৈরী করে রাখে কুটচক্রীরা। স্থানীয় বিএনপি নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শামসুল ইসলামের নিয়ন্ত্রনে গড়ে ওঠে এখানে জমির দালালী ও ফ্যাক্টরী নির্ভর ব্যাবসার বিশাল এক সিন্ডিকেট। স্থানীয় সাংসদের ছোটভাই মজিবুল হক নবাবকেও সে এ সিন্ডিকেটে জড়িয়েছেন প্রশাসনিক সুবিধা নেয়ার অভিপ্রায়ে। একসময়কার চিঁছকে চোলাইমদ ব্যাবসায়ী এই শামসু ভুমি মালিকদের ঠকিয়ে ওয়েস্টার্ণ মেরিণসহ চরাঞ্চলের ডকইয়ার্ড ও বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট গুলোর সাথে জমির দালালী করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যান এবং টাকা ছিটিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কোলাগাঁও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের বিগত কাউন্সিলে নিজের পছন্দের লোককে সাধারন সম্পাদক পদে পদায়িত করতে কাউন্সিলর মনোনয়নসহ তাদের ভোট কিনতে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেছিলেন এবার সদ্যঘোষিত ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের পুরো কমিটিই তার অর্থে কিনে এনেছিলেন বলে তারই ঘনিষ্টজনেরা স্বগৌরবে বলে বেড়াচ্ছেন। তার সত্যতা মিলে গত শুক্রবার সৌদি আরব সফর শেষে শাহ আমানত বিমান বন্দরে আসলে নবঘোষিত ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি, সম্পাদকের নেতৃত্বাধীন একটি দল যখন ফুল দিয়ে বরণ করতে বিমান বন্দরে ছুটে যান। এ দলটি আবার তাকে এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পটিয়া উপজেলা আওয়মীলীগ নেতা হিসেবে প্রচার করছে। এলাকার বিতর্কিত সাংসদ শামসুল হক চৌধুরীর সাথে তার ঘনিষ্ট ছবি এখন তার সমর্থকদের ফেসবুক ওয়ালে গুরুত্বের সাথে ঘুরছে।
প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় তার লোকজনের সাথে এলাকায় নবাবের আড্ডা ও মোটর সাইকেল নিয়ে দাপাদাপি দেখে কেউ ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পায়না। তাদের কেউ কেউ রাতের বেলায় মক্ষীরাণী এনে ব্যাবসা, ছিনতাই, ইয়াবা সেবন, বহন ও কারবারে জড়িত। পথচারীর টাকা পয়সা, মোবাইল, ঘড়ি, অলংকার ছিনতাই এখানে নিত্ত নৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদকাসক্তরা রাস্তার কাজ ও বৈদ্যুতিক টাওয়ার স্থাপনের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের ক্যাম্পে হামলা দিয়ে সর্বস্ব লুটে নেয়ার ঘটনা ঘটালেও টু শব্দটিও উচ্চারণ করতে পারেনি কেউ। এলাকায় বিগত দুইমাসে দুইজন অজ্ঞাত যুবকের লাশ পাওয়া যায়। এসব খুনে মাদকের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে স্থানীয়দের ধারণা। ইতিপূর্বেও এ এলাকায় হাত পা বাঁধা এক সিএনজি ড্রাইভারের লাশ পাওয়া যায়। শিকলবাহা ক্রসিং, মইজ্যার টেক ও শাহ আমানত সেতু এলাকার পুলিশ চেকপোষ্ট এড়িয়ে সাথে চোলাইমদ ও ইয়াবার চালান আনা নেয়ার কাজে কালারপোল, গাইজ্যারঘাট, লালপোল, ওয়াপদাঘাট, নোয়ারাস্তা ঘাট হয়ে নদীপথে নগরীর চাক্তাই, ফিরিঙ্গীবাজার, সদরঘাট, বাংলাবাজারকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যাবহৃত হচ্ছে বলে মনে করে এলাকবাসী। এমপি ভ্রাতা নবাবের সাহচর্যে।
এক সময়ের স’মিল শ্রমিক আবদুর রউফ ভুট্টো এখন এলাকার মুর্তমান আতঙ্ক। বড় ভাই দিলা মিয়ার সাথে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে গাছ কেনা, পুকুুরের মাছ কেনার মত সাময়িক ব্যাবসা করে কোন প্রকার দিনাতিপাত করছিল ভুট্টো। একসময় চট্টগ্রাম দক্ষিন জেলা ছাত্রদলের তৎকালীন সাধারন সম্পাদক ও কুসুমপুরা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এর সাথে বিএপির মিছিল মিটিং যেতে থাকে সে। শান্তিরহাট, ভেল্লাপাড়া এলাকায় ছাত্রলীগের উপর হামলা, নির্যাতন ও আওয়ামীলীগ ছাত্রলীগের মিছি মিটিংপন্ড করার কাজে তার শারীরিক সামর্থ্য ও নৃশংসতাকে কাজে লাগাতে থাকে চেয়ারম্যান নেছার। সাথে সাথে ঘনিষ্ট হয়ে ওঠে পার্শ্ববর্তী জিরি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এরও ঘনিষ্ট হয়ে যায় ভুট্টো। ক্রমে দেশীয় অস্ত্র ধামা, কিরিচের সাথে ভুট্টোর হাতে আসে বিদেশী লাইট গান ও পিস্তল। খেটে খাওয়া শ্রমিক ভুট্টো পরিনত হয় অস্ত্রবাজ ভুট্টোতে। ১/ ১১ এর পর সেনা সমর্থিত সরকার এলে এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দেয় বিএনপির দুর্ধর্ষ ক্যাডার এই ভুট্টো। ২০১১-১২ সালের দিকে সময় ও সুযোগ বুঝে এলাকায় এসে স্থানীয় ভাবে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র ঋনদানকারী বেসরকাররী সংস্থা ‘বর্ণালী’র খেলাপী ঋণ আদায়ে বেতনভূক কর্মীর কাজ করার পাশাপাশি ডাকাত ডাকাত দলের নেতৃত্ব দিতে থাকে ভুট্টো। স্থানীয় পশ্চিম চাপড়ায় হাজী ফজল আহমদ সওদাগরের বাড়ি ডাকাতি করতে যাওয়ার সময় র‌্যাবের টহল দল তাকে অস্ত্রসহ হাতেনাতে ধরে ফেলে এবং জেল হাজত হয় তার। কয়েক মাস না যেতেই রহস্যজনকভাবে জেল থেকে বেরিয়ে এসে স্থানীয় এমপি’র ভাই নবাবের সাথে ওঠাবসা দেখে এলাকাবাসীর মনে যে বিষ্ময়ের জন্ম দেয় ভুট্টো, তার রেশ কেটে ওঠার আগেই বিগত কয়েক বছরে অর্ধশতকোটি টাকার জমিজমার মালিক হয়ে যাওয়া ভুট্টো যেন এক ভিভিআইপির নাম। সাংসদ শামসুল হকের বাড়ির মেজবানে সমস্ত কিছুর তদারকি এবং সাংসদের অন্দর মহলে নেতা কর্মীদের ডেকে নিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্র দেখিয়ে তার কর্তৃত্ব জাহির করার কথা সারা পটিয়ার নেতাকর্মীদের মাঝে কানাঘুষা হলেও জোড়ালো প্রতিবাদ কেউ করতে পারেনি। কোলাগাঁও এর মোহাম্মদ নগর, চাপড়া, জিরি ইউনিয়নের কোটের পাড়া ও কুসুমপুরার কসাইপাড়ায় কর্মসূচীতে এলে ভুট্টোর বাড়িতেই বেশ কয়েকবার বিশ্রাম ও খাওয়া দাওয়া সারেন সাংসদ শামসুল। আর ভাই নবাব হলেন ভুট্টোর সান্ধ্যা-রাতের আসর সঙ্গী। প্রতি রাতেই ভুট্টোর মোহাম্মদ নগরের বাড়িতে দামী মডেলের কার, মাইক্রো ও বাইকের বহর আসে এমপির ভাইসহ। মানুষের ধারণা মেহমানদারীর আড়ালে ভুট্টোর বাড়িতেই চকরিয়া থেকে চট্টগ্রাম শহরমুখী ইয়াবার চালানের স্টপেজ বানানো হয়েছে। আর এখান থেকেই ছোট ছোট চালানে ভাগ করে নদীপথে চট্টগ্রাম শহরে পাচার হয় মরণঘাতী মাদক ইয়াবা।
এই কয়েক বছরে ভুট্টোর ছোঁয়ায় এলাকার দরিদ্র ঋনগ্রস্থ বেকারদের অনেকের মধ্যে আধুনিক মডেলের মোবাইল, বাইক ব্যাবহার ও পাকা দালান নির্মানের হিড়িক দেখে তাদের কেউ কেউ এ ইয়াবা পাচার ও ব্যাবসা বা অনৈতিক কাজে জড়িত বলে সন্দেহ হয়।
এহেন পরিস্থিতিতে এলাকার শান্তি শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে এনে সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে যথাযথ তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহনের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করে এলাকাবাসী।