ফুল গ্রামে ব্যস্ততা

0
68

বসন্ত মানেই পূর্ণতা। বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। কচিপাতায় আলোর নাচনের মতোই বাঙালির মনেও লাগে দোলা। বিপুল তরঙ্গ প্রাণে আন্দোলিত হয় বাঙ্গালি মন। বসন্ত বরণ ও ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে ফুল গ্রামের ফুল চাষীদের ব্যস্ততা।

বিশ্বায়নের এইযুগে পরিবার সদস্য কিংবা নিকট স্বজনদের মাঝেও দিবসটি ইতোমধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এদিনে একজনের সঙ্গে অপরজনের ভালোবাসাবাসির মুর্হুত গুলো হয়ে উঠে অনেকটা সুমধুর। সামর্থ্য যাদের আছে তাঁরা প্রিয়জনকে নামি-দামি গিফ্ট উপহার দেন। আবার অনেকে ভালোবাসার নির্দশন হিসেবে প্রিয় মানুষকে শুভেচ্ছা জানান ফুলেল পাঁপড়ি দিয়ে।

তাইতো ভালোবাসা দিবসটি উপলক্ষে এদিন সারাদেশে বেড়ে যায় ফুলের কদর। আর ফুলের এই কদরকে সামনে রেখে কোটি টাকার ফুল বিক্রির টার্গেট করছে চট্টগ্রামের চকরিয়ার ফুল চাষীরা।

ভালোবাসা দিবসে বিশেষ চাহিদা থাকার বিষয়টি মাথা রেখে ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকা, বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রাম ও পর্যটন নগরী কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ীরা আগাম ফুলের অর্ডার দিয়ে রেখেছেন চকরিয়া উপজেলার ফুলের গ্রাম খ্যাত বরইতলী ও হারবাং ইউনিয়নের দুই শতাধিক বাগান মালিকের কাছে।

প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকুলে থাকার ফলে এবছর ফুলের গ্রামে বাম্পার ফলন হয়েছে গোলাপ, গ্লাউডিওলাস, রজনীগন্ধা ছাড়াও বিভিন্ন জাতের ফুল চাষে। সব মিলিয়ে এখানকার চাষীদের মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠেছে। স্থানীয় চাষীরা এবছর ভালোবাসা দিবসে কমপক্ষে কোটি টাকার ফুল বিক্রির আশা দেখছেন।

বরইতলী ইউনিয়নের একাধিক বাগান ঘুরে মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার যেহেতু ভালোবাসা দিবস, সেইজন্য একদিন আগেই দেশের প্রতিটি মোকামে অর্ডার মোতাবেক ফুল পৌঁছাতে হবে। তাই বেশিরভাগ বাগানে বুধবার বিকাল থেকে শ্রমিকরা ফুল তোলার কাজ শুরু করেছে। দুরবর্তী এলাকার বেশিরভাগ ফুল (বুধবার) রাতে পাঠানো শুরু হয়।

বৃস্পতিবার সকাল থেকে শুরু করে বিকাল পর্যন্ত যেসব ফুল বাগান থেকে কাটা হয় তা নিকটবর্তী মোকামে পাঠানো হয়।

চকরিয়ার বরইতলী থেকে পাইকারি মূল্যে কিনে চট্টগ্রাম শহরের চেরাগী পাহাড় মোড়ে ফুল বিক্রি করেন আড়তদার অনেক ব্যাবসায়ী ।

বরইতলী থেকে তারা প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫ হাজার ফুল কেনেন । বিশেষ দিবসে তা কয়েকগুণ বাড়িয়ে কেনেন তারা। এবারের ভালোবাসা ও মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আগাম অর্ডার দেওয়া হয়েছে ৮০ হাজার গোলাপ ও গ্লাউডিওলাস ফুলের।

বরইতলী একতা বাজার এলাকার ফুলচাষি আবু তাহের বলেন, ‘আমি একসময় তামাকের চাষ করতাম। তখন মুনাফাও ভালো পেয়েছিলাম। কিন্তু হাড়ভাঙা খাটুনি ও দিন-রাত পরিশ্রমের কারণে শরীরের অবস্থা তেমন ভালো যাচ্ছিল না। তাই অন্যের দেখাদেখিতে তামাকচাষ ছেড়ে গত তিন বছর ধরে উদ্যোগী হই ফুল চাষে এবারও দুই কানি জমিতে গোলাপ ও গ্লাউডিওলাস ফুলচাষ করেছি। ফলনও ভালো হওয়ায় বেশ খুশি লাগছে।

তিনি বলেন, প্রতিদিন সকালে বাগান থেকে ফুল তোলার পর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পাইকাররা সরাসরি বাগানে এসে কিনে নিয়ে যাবেন। অনেক ক্রেতারা আগাম অর্ডারও দিয়ে রেখেছেন ভালোবাসা ও মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে। এতে এবার কম করে হলেও তিন লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবো বলে আশা করছি।’

স্থানীয় বাগান মালিকরা বলেন, ফুলের বাজারে বরইতলীর বাগান গুলোর ফুল বর্তমানে অনেক চাগিদা রয়েছে।

প্রতিটি গোলাপের দাম প্রকার ও মানভেদে পাইকারিভাবে বিক্রি হচ্ছে চার থেকে পাচঁ টাকায়। আর নানা রংয়ের গ্লাউডিওলাস ফুল বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকায়। এতে চাষির পাশাপাশি বাগান পরিচর্যা ও ফুল তোলায় নিয়োজিত চার শতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিকের নিয়মিত পারিশ্রমিক পাওয়ার মুখে হাসি ফুটেছে।

বাগানে ফুল কাটার (তোলার) কাজ করেন কয়েকজন নারী শ্রমিক বলেন, দেশে ফুলের চাহিদা ভালো থাকায় ফুল বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে প্রতিদিন টাকা আয় করছি। এতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালভাবে অভাব-অনটন ছাড়াই সুখে আছি । বলতে গেলে এখন আর কোন অভাব নেই।

সরেজমিনে ফুলচাষী ও শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের গোলাপ নগর খ্যাত চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়ন। এখানে ২ শতাধিক বাগানে ফুল চাষ করা হয়।

প্রতিদিন এসব বাগান থেকে লাখ লাখ টাকার ফুল ঢাকা, কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গোলাপ ও গ্লাডিওলাস ফুল সরবরাহ করা হয়। বিশেষ বিশেষ দিবসগুলোতে এসব বাগানের ফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

গত আড়াই দশক ধরে এখানকার চাষীরা আয়ের একমাত্র অবলম্বন হিসেবে ফুল চাষ করে আসছেন। প্রথমদিকে অল্প জমিতে নানা জাতের ফুলের চাষ হলেও বর্তমানে বরইতলী ইউনিয়নে ১১০ একর জমিতে ফুল চাষ করা হচ্ছে বলে জানা যায়।

বরইতলী ফুলবাগান মালিক সমিতির সভাপতি মো. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘চলতি বছর প্রাকৃতিক পরিবেশ ফুল চাষের অনুকুলে থাকায় পুরোদমে ফুল চাষে নেমেছেন শত শত চাষী। তাই আশা করছি, এবারের ভালোবাসা ও মাতৃভাষা দিবসে এখান থেকে কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের পাইকারি ক্রেতারা বাগানে এসে ফুল ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন । অনেকে আগাম অর্ডারও দিয়ে রেখেছেন। আগামী ২দিনে সবকটি বাগানের সিংহভাগ ফুল বিক্রি হবে বলে আশা করছি।’

চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস এম নাসিম হোসেন বলেন, ‘বরইতলী ইউনিয়নে চলতি বছর ৬৬ হেক্টর জমিতে গোলাপ, ২৮ হেক্টরে গ্লাউডিওলাস এবং অন্যান্য ১৬ হেক্টরসহ মোট ১১০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চাষ করছেন ৫ শতাধিক চাষী। এবারের ভালোবাসা দিবসসহ সবকটি দিবসে ফুল বিক্রিও ভালো হবে। এতে আর্থিকভাবে বেশ লাভবান হবেন চাষীরা।’

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন সিকদার বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের জমিতে সর্বনাশা তামাক চাষ করতেন। তামাক চাষের কারণে যেভাবে পরিবেশ ও শারীরিক ক্ষতি হয় তা আমি তাঁদের বিভিন্ন ভাবে বুঝাতে সক্ষম হই। তাই তাঁরা কয়েক বছর ধরে তামাক চাষ ছেড়ে ফুল চাষের দিকে আগ্রহ বাড়িয়েছে। ফুল চাষ করে ইউনিয়নের অনেক মানুষ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে। ছেলে মেয়েদের স্কুল-কলেজে লেখা-পড়া করাচ্ছেন।’