বঙ্গবন্ধুর ‘হৈমন্তী’

0
23

হৈমন্তী। তীব্র সুবাস ছড়ানো একটি ফুলের নাম এটি। কবিগুরুর ছোটগল্প ‘হৈমন্তী’র সঙ্গে অনেকের পরিচয় থাকলেও এ নামে যে একটি ফুল আছে, তা হয়তো অনেকেই জানেন না। না জানারই কথা। কারণ ফুলের এই প্রজাতিটি খুবই বিরল। নাটোরের উত্তরা গণভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই ফুলের একটি চারা নিজ হাতে লাগিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি লাগানো গাছটি মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে ছিল বহু বছর। বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচর্যা করে বাঁচিয়ে তোলা সেই হৈমন্তী এখন সুবাস ছড়াচ্ছে উত্তরা গণভবনসহ আশপাশের এলাকায়। জেনে রাখা ভালো, নাটোরের এক সময়ের বিখ্যাত দিঘাপতিয়া রাজবাড়িই এখন উত্তরা গণভবন। অর্থাৎ উত্তরাঞ্চলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন।

সম্প্রতি গণপূর্ত বিভাগের কাছ থেকে জেলা প্রশাসন উত্তরা গণভবনের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়। এর পর করুণ দশার হৈমন্তী ফুলের গাছটি নজরে পড়ে কর্তৃপক্ষের। গাছটিকে বাঁচিয়ে তুলতে চলতি বছরের ১৮ মার্চ পর্যবেক্ষণে আসেন এক দল বিশেষজ্ঞ। এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শাহাদৎ হোসেন, ড. কবিতা আঞ্জুমান আরা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার বিভাগের পরিচালক কুদরত-ই-গণি, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম মেজবা উদ্দিন, মাফরুহা আফরোজ, নাটোর কৃষি সম্প্র্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রফিকুল ইসলাম, উদ্যানতত্ত্ববিদ ড. ভবসিন্ধু রায় প্রমুখ। উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ ও কৃষিবিদদের পরিশ্রমে গাছটি প্রাণশক্তি ফিরে পায়। ভরে ওঠে ফুলে ফুলে। সুবাসিত করে তোলে উত্তরা গণভবন প্রাঙ্গণ।

উত্তরা গণভবনের দুর্লভ বৃক্ষরাজির পরিচর্যায় বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. ভবসিন্ধু রায় বলেন, ‘হৈমন্তী গাছটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার পর গাছের গোড়া থেকে শাখা-প্রশাখা পর্যন্ত উইপোকার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে গোবর, ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপিসহ কয়েক প্রকার কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। পরিচর্যার এক পর্যায়ে প্রাণ ফিরে পায় বঙ্গবন্ধুর হাতের পরশ পাওয়া হৈমন্তী।’

কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যানতত্ত্ববিদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘হৈমন্তী এক প্রকার বিরল বুনো। শীতকালে প্রচুর ফুল ফোটে। অন্য সময়ে কম। তবে শীতকালে হৈমন্তী ফুটলে গাছে পাতা থাকে না। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে। এ সময় গভীর রাত ও ভোরে তীব্র সুগন্ধ ছড়ায় ফুলটি। ভোরে শিশির ভেজা ঘাসের ওপর শিউলি ফুলের মতো ছড়িয়ে থাকা হৈমন্তী ফুল নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে।’

নাটোর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক স. ম. মেফতাহুল বারী বলেন, ‘গণভবনের দুর্লভ হৈমন্তী গাছের জন্য একজন উদ্যানতত্ত্ববিদ নিযুক্ত রয়েছেন। তিনি নিয়মিত গাছটির পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করছেন।’ উত্তরা গণভবনের রানীমহলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের হাতে লাগানো গাছটি পরিচর্যা করে বাঁচিয়ে তোলার পর নতুন করে ফুল ধরতে শুরু করেছে। এখন গাছটি দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে। পর্যটকদের অনেকেই বিরল এ গাছটি দেখতে ও এর সম্পর্কে জানতে আসেন।

গত শনিবার নাটোর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ‘নাটোর ভিশন’সহ বেশ কয়েকটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচনকালে উত্তরা গণভবনের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরার সময় বঙ্গবন্ধুর হাতে রোপণ করা এই বিরল হৈমন্তী গাছের কথাও উঠে আসে।

নাটোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ড. রাজ্জাকুল ইসলাম বলেন, এই দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের ইতিহাস, তাদের ব্যবহূত জিনিসপত্র ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে স্থাপন করা সংগ্রহশালার প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ বেড়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে নাটোরের জেলা প্রশাসন রাজপরিবারের ইতিহাস সংবলিত বই প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে নতুন নতুন পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।

প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহাসিক এই রাজপ্রাসাদটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ায় প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে ভিড় করছেন। জেলা প্রশাসন এই ভবনের দায়িত্ব নেওয়ার পর উদ্ধার করা হয় এই রাজপরিবারের সদস্য রাজকুমারী ইন্দুপ্রভা দেবীর অপ্রকাশিত সাহিত্যকর্ম। রাজকুমারীর আত্মজীবনী ও ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে বেরিয়ে এসেছে রাজপরিবার ও অন্দরমহলের অনেক অজানা কাহিনী। রাজকুমারীর লেখা ২৮৫টি প্রেমের চিঠি বেশ আলোড়ন তোলে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে নাটোর ট্রেজারি থেকে পাওয়া যায় একটি রূপার ফ্রেমে রাজসিক ঢংয়ে বাঁধাই করা ইন্দুপ্রভার আলোকচিত্র। এক সময় খোঁজ মেলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের হাতে লাগানো হৈমন্তী গাছের।