বন মোরগ

0
243

লাল বনমোরগ বা লাল বনমুরগি (লাতিন ভাষায়: Gallus gallus) (ইংরেজি: Red Junglefowl) ফ্যাসিয়ানিডি (Phasianidae) গোত্রের অন্তর্গত সর্বাধিক পরিচিত একটি প্রজাতি। ধরে নেওয়া হয় পৃথিবীর সমস্ত মোরগ-মুরগী আবির্ভূত হয়েছে এই বন মোরগের প্রজাতির কিছুকিছু নমুনার গৃহপালনের মাধ্যমে, তাতে লেগে গেছে কয়েক হাজার বছর। গত কয়েক দশক ধরে এদের সংখ্যা কমে গেলেও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে যেয়ে পৌঁছায় নি। সেকারণে আই. ইউ. সি. এন. বনমোরগকে Least Concern বা আশঙ্কাহীন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বাংলাদেশের ১৯৭৪ ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।
বাংলাদেশে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের চিরসবুজ বন, চা-বাগান, শেরপুর ও মধুপুর শালবন ও সুন্দরবনে বনমোরগ বাস করে। একসময় প্রায় সব ধরনের বন-জঙ্গলেই এদের দেখা যেত। কিন্তু ব্যাপক শিকারের কারণে আশঙ্কাজনকভাবে এরা কমে গেছে। আদিবাসীদের কারণে পাহাড়ি বনেও এরা প্রায় বিলুপ্তির পথে। এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো কোনো হাটবাজারে বনমোরগ বিক্রি হয়। তবে সিলেটের চা-বাগান ও সুন্দরবনে এরা মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে।
লাল বনমোরগ খুব সুন্দর ঝালরাবৃত লালচে, সোনালি ও কালো পালক জড়িত পিঠ ও ডানাসম্বৃদ্ধ একটি পাখি। কপোল থেকে পালকহীন মাংসল মণি বা কোম্ব বের হয়েছে। ঠোঁটের নিচে ও কানের সামনে থেকে বের হয়েছে দুটি লাল লতিকা বা পর্দা। পালকহীন চোখের চারিদিকের চামড়া লালচে, নিচের দিকে কালচে। প্রলম্বিত লেজের পালক নিচের দিকে বাঁকানো। বনমুরগী তুলনায় ছোট ও লেজে বাহারি পালক নেই। দেহের পালক সোনালী আভাযুক্ত বাদামী, তার সাথে সামান্য গাঢ় দাগ। মণি, লতিকা ও চোখের কোল বনমোরগের তুলনায় তেমন দর্শনীয় নয়।
লাল বনমোরগ-মুরগী একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে ঘুরে বেড়ায়। মাটি থেকে কুড়িয়ে বিভিন্ন শস্যদানা, ঘাসের গোড়া, কচিপাতা, কেঁচো, কীটপতঙ্গ, ফল এসব খায়। খুব ভোরে ও সন্ধ্যার আগে আগে বনের পাশের খোলা জায়গায় খাবার খেতে আসে। শীতের সময় কুয়াশা থাকা অবস্থায় খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। বনের কোনো গাছতলায় পাকা ফল ঝরে পড়া শুরু করলে বনমোরগ-বনমুরগী প্রতিদিন সকাল-বিকাল সেই গাছতলায় আসে। আবার বনের বড় গাছে উঠেও এদের ফল খেতে দেখা গেছে। রাত কাটায় উঁচু গাছের ডালে বা বাঁশঝাড়ে। সামান্য শব্দে ভীত হয়ে উড়ে গিয়ে বসবে গাছের মগডালে। পালানোর সময় পোষা মুরগির মতোই কক্ কক্ করে ডাকে।[৬][৭]

লাল বনমোরগ বিশেষভাবে একটি আঞ্চলিক পাখি, অর্থাৎ এরা নিজেদের নির্ধারিত সীমায় বসবাস করে, অন্যের অনুপ্রবেশ মোটেও বরদাশত করতে পারে না। প্রজননকালের শুরুতে এ আচরণ অধিকহারে দেখা যায়। এসময় দলপতি বা শক্তিমান মোরগ তিন থেকে পাঁচটি মুরগী নিয়ে দল গঠন করে ঘুরে বেড়ায়। কমবয়েসী মোরগেরা পৃথকভাবে দুই বা তিন সদস্যের দল গঠন করে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, লাল বনমুরগীর বীর্য ফেলে দেবার ক্ষমতা রয়েছে। এরা কেবল দলপতি মোরগের বীর্যই গ্রহণ করে, অন্যসব মোরগের বীর্য ফেলে দেয়।
জানুয়ারি থেকে অক্টোবর প্রজননকাল। বনের নির্জন স্থানে পায়ের নখ আঁচড়িয়ে মাটিতে সামান্য গর্ত করে তাতে লাল বনমুরগি শুকনো ঘাস ও কাঠিকুটি বিছিয়ে বাসা বানায়। ডিম পাড়ে পাঁচ-ছয়টি; রং হালকা থেকে গাঢ় বাদামি। লাল বনমুরগি শুধু ডিমে তা দেয় ও ছানাদের লালন-পালনে ব্যস্ত থাকে। ডিম ফোটে ২০-২১ দিনে। ফোটার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ছানাগুলো বাসা ছাড়ে ও মায়ের সঙ্গে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে।[৬][৭] ১২ সপ্তাহ বয়সে ছানারা দল থেকে বেরিয়ে পড়ে নতুন দলে প্রবেশ করে বা নিজেরাই দল গঠন করে।
বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বনমোরগ। বনমোরগ পাখি নয়, অথচ গাছে গাছে উড়ে বেড়াতে পারে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে বংশবিস্তারসহ নিজেদের রক্ষা করে বনেই স্থায়ী আবাস বনমোরগের। সাধারণ মোরগের মতোই বনমোরগ। কিন্তু স্বভাব অনেকটা ভিন্ন। গৃহপালিত মোরগ যতটা অলস, বনমোরগ ততটা অলস নয়, বরং অত্যন্ত চালাক। বনের মধ্যেই বাঁচা-মরা, যুদ্ধ করা আর বন্যপ্রাণীর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা, সন্তানদের নিরাপদ রাখার জন্য বনমোরগ অনেকটা হিংস্র প্রাণীর মতো হয়। দেখতে আমাদের গৃহপালিত মোরগ-মুরগির মতোই। তবে মোরগের লেজের দুটি পালক লম্বা। বনমোরগ পাহাড়, টিলা, চা-বাগান এবং প্রাকৃতিক গভীর বনের কাছাকাছি নিরাপদ খোলা মাঠে একাকী, জোড়ায় ও দলবদ্ধভাবে চরে বেড়ায়। সকালে ও সন্ধ্যার আগে বনের কাছাকাছি খোলা জায়গায় খাবারের সন্ধানে বের হয়। একটি দলে ৬টি মুরগি ও একটি মোরগ থাকে।

খাদ্য হিসেবে বনের পোকা-মাকড়, ফল-মূল খেয়েই জীবনধারণ করে বনমোরক। এদের প্রধান খাদ্য ফল, বীজ, শস্যকণা, কচি পাতা, কেঁচো ও কীটপতঙ্গ। শীতের সময় কুয়াশা থাকাবস্থায় খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। বনের কোনো গাছতলায় পাকা ফল ঝরে পড়া শুরু করলে বনমোরগ-মুরগি প্রতিদিন সকাল-বিকাল সেই গাছতলায় আসে। আবার বনের বড় গাছে উঠেও ফল খায়। যেখানে ঘন বন, সেখানেই বন মোরগ আবাস গড়ে তোলে। বনমোরগ পাখি নয়, তবে নিজের প্রয়োজনে খুব দ্রুত দৌড়াতে পারে এবং উড়তে পারে অনেক ওপরে। উড়ে যেতে পারে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে।

বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ায় বনমোরগের দেখা মেলে। পাহাড়ের পাদদেশে ঘন প্রাকৃতিক ঝোপের ভেতর মাটিতে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাসে এরা বাসা তৈরি করে। ছয়-সাতটি ডিম দেয়। বনমুরগি শুধু ডিমে তাপ দেয় ও ছানাদের লালন-পালনে ব্যস্ত থাকে। ডিম থেকে ছানা ফুটতে ২০-২১ দিন সময় লাগে। ছানারা বাসা থেকে নেমেই খাবার খেতে পারে।
বাংলাদেশে সিলেট অঞ্চলের মৌলভীবাজারের পাথারিয়া বনাঞ্চল, লাঠিটিলা, লাউয়াছড়া, সাতছড়ি, বালিশিরাসহ চিরসবুজ বন, চা-বাগান ও চট্টগ্রাম-খুলনা অঞ্চলের মধুপুর শালবন ও সুন্দরবনে বনমোরগ বাস করে। সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বনে গিয়ে বনমোরগের দেখা মেলে মাঝেমধ্যে। কিন্তু এই প্রাণীগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে বনরাক্ষুসীরা। অব্যাহতভাবে বনাঞ্চল উজাড় আর শিকারিদের অপতৎপরতার কারণে বিপন্ন এই প্রজাতির বনমোরগ। বনাঞ্চলে তারা পাচ্ছে না নিরাপদে বাঁচার পরিবেশ। বিশেষ করে স্থানীয় আদিবাসীদের শিকারের মধ্যে বনমোরগ-মুরগি অন্যতম। এটি তাদের নিয়মিত শিকারের পাখি। প্রাকৃতিক বনে বাস করা বনমুরগি আদিবাসীরা শিকার করেই ক্ষান্ত হয় না, মোরগের বাসা খুঁজে বের করে তাদের ডিমগুলোও খেয়ে ফেলে। তা ছাড়া বন এলাকার বাঙালিরাও বনমোরগ-মুরগি ধরতে প্রতিদিন নানা রকমের ফাঁদ পাতে। ঘরে পোষা মুরগি থাকা সত্ত্বেও বনের এই পাখির প্রতি লোকের লোভের সীমা নেই। ফলে কমে গেছে এদের সংখ্যা। পড়ে গেছে বিপন্ন পাখির তালিকায়।
আমাদের উচিৎ সময় থাকতে বন মোরগ সহ বনের বিভিন্ন পশু-পাখিকে বিলুপ্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচানো। আসুন আমরা সবাই মিলে আমাদের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কে টিকিয়ে রাখি।
খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার পেশাদার বন মোরগ শিকারী নায়েব আলীর বয়স এখন সাইত্রিশ। সে উপজেলার মোহাম্মদপুর গ্রামের আবদুর রশিদের ছেলে। বিভিন্ন বনে জঙ্গলে ঘুরে ফাঁদ পেতে মোরগ শিকার করাই তার পেশা।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, সাত সকালেই শিকারী মোরগ ও ফাঁদ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে নায়েব আলী। দীর্ঘ ২ঘন্টা অপেক্ষার পর বেলা ১টার দিকে দেখা মিলে দক্ষ শিকারী নায়েবের। তবে খালি হাতে নয়। শিকার নিয়েই বাড়ি ফেরা।
এই প্রতিবেদকের সাথে পূর্ব পরিচিত থাকায় তার সাথে কথা হয় শিকার নিয়ে। সে জানায় দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর যাবৎ এই পেশার সাথে জড়িত। উপজেলার ফাতেমানগর, কাশিপাড়া, ঝর্ণাটিলা, মরাটিলা, যৌথখামারসহ বিভিন্ন এলাকায় ফাঁদ পেতে শিকার করা হয় বন মোরগ।
কিভাবে ফাঁদ পাতা হয় তা জানতে চাইলে নায়েব আলী জানায়, জঙ্গলভরা এলাকায় প্রথমে মাটির সাথে এক ধরনের ফাঁদ পেতে ফাঁদের মধ্যখানে শিকারী মোরগটিকে মাটির সাথে খুঁটি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে আশে-পাশে সে লুকিয়ে থাকে সে। শিকারী মোরগটি নিরিবিলি জঙ্গলে জোরে জোরে চিৎকার করতে থাকলে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে বনমোরগ। শিকারী মোগরটিকে আক্রমন করতে তেড়ে আসা মাত্রই আটকা পড়ে ফাঁদে। তবে সারা বছর শিকার তেমন হয়না। ফাল্গুন ও চৈত্র মাস শিকারের মূল সময়।
তার শিকারের মাঝে সবচেয়ে সফলতা আসে বিগত চার বছর আগে। নয়শত টাকা দিয়ে একটা শিকারী মোরগ কিনে ঐ মোরগ দিয়ে ৯৭টি শিকার করেছে বলে মুচকি হেসে জানায়। এখনও প্রায়ই তার ফাঁদে বন মোরগ ধরা পড়ে বলে জানায়। তাছাড়া ছোট বাচ্চা মোরগকে শিকারী হিসাবে বানাতে পারলেই ৩/৪ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়।
নায়েব আরো জানায়, বন মোরগের মাংস বেশ সু-স্বাদু তাই গ্রাহকেরও অভাব নেই। দাম বেশি হলেও অগ্রিম অর্ডারেই সব মোগর বিক্রি হয়ে যায়। সাইজ ছোট হলে কমপকেক্ষ ৫শত, মাঝারী ৬শত ও বড় হলে ৭শত টাকা অনায়াসেই বিক্রি হয়। বন মোরগ শিকার ছাড়াও সে রাজ মিস্ত্রির শ্রমিক ও রিকসার প্যাডেল চাপিয়েই সংসারের খরচ মেটায়। নায়েব আলীর ১ ছেলে শাকিব পানছড়ি বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণির ছাত্র ও মেয়ে নাসরিন ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ে।
তবে তার অনেক দু:খের কথাও এ প্রতিবেদকের সাথে ভাগাভাগি করে। সে জানায় মা-বাবাসহ তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৬জন। একখানা প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ড রয়েছে তার পিতার নামে। তাছাড়া অ-উপজাতীয় গুচ্ছগ্রামে রেশন কার্ড. ভিজিডি কার্ড, বয়স্ক ভাতা কোনটাই নেই। তার দাবি ৪০ দিনের কর্মসূচী, এলজিইডির আওতাধীন এলজিএলইপির আওতাধীন শ্রমিকের কাজে তার স্ত্রীকে নিয়োগ দেয়া হলে অন্তত মা-বাবা ও ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভালোভাবে দিনযাপন করা যেত।
বন মোরগ বন জঙ্গলে থাকার কথা। প্রকৃতির নিয়মে গভীর জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় বন মোরগ। লোকালয়ে বন মোরগ কখনো আসেনা। বরং মানুষের সংর্স্প থেকে বহু দুরে থাকতে চায় বন মোরগ। গভীর বন জঙ্গলে কদাচিৎ মানুষের মুখোমুখি হয়ে পড়লেও দ্রুত চোখের পলকে উড়ে বহু দুরে অদৃশ্য হয়ে যায় বন মোরগ। এসব তথ্য জানান প্রকৃতি বিশেষজ্ঞ এবং কাপ্তাইয়ে অবস্থিত ওয়াগ্‌গাছড়া চা বাগানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুর রশীদ কাদেরী।

বন মোরগ বনে থাকে। বনেই তার জন্ম। বন মোরগ দেখতে হুবহু দেশীয় মোরগের মত হলেও আকার ও ওজনে অনেকটা কম। এটি এক গাছ থেকে অন্য গাছে, এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে উড়ে বেড়ায়। একটি বন মোরগের ওজন সর্বোচ্চ ১ কেজি, আর মুরগির ওজন ৫০০ গ্রাম থেকে ৭০০ গ্রাম হয়।

বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী বন মোরগের বাস বনে হবার কথা থাকলেও কাপ্তাইয়ে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে। কাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী পেপার মিল শিল্প এলাকায় গত ৬ মাস ধরে কয়েকটি বন মোরগকে বিচরণ দেখা গেছে। কেপিএম স্কুল এন্ড কলেজের এক শিক্ষক বিষয়টি সাংবাদিকের নজরে আনেন। ঐ শিক্ষক আজাদীকে বলেন যে এলাকায় আমাদের বসবাস সেই এলাকায় অনেক ঘরবাড়ি থাকলেও মোরগ লালন পালন করার পরিবেশ নেই। ঐ এলাকার কোন বাসিন্দা মোরগ পোষেননা। একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের পেছনের জঙ্গলে ২টি মোরগের দেখা পাই। প্রথমে কিছু বুঝতে পারিনি। পরদিন একাধিকবার মোরগ ২টিকে আনাগোনা করতে দেখি। এদের একটি মোরগ এবং একটি মুরগি। এটি সাধারণ গৃহপালিত মোরগ বলে আমার মনে হয়নি। শিক্ষকের ধারণা এটি বন মোরগ। কিন্ত এই এলাকায় কোথা থেকে বন মোরগ আসবে তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেননা। শিক্ষকের কাছ থেকে বিষয়টি জানার পর আজাদীর কাপ্তাই প্রতিনিধি কাজী মোশাররফ হোসেন সরেজমিন বন মোরগ দেখার জন্য ঐ শিক্ষকের বাসায় যান। কয়েক ঘন্টা অপেক্ষার পর মোরগের দেখা পাওয়া যায়। আজাদীর প্রতিনিধি নিশ্চিত হন মোরগ ২টি সাধারন কোন মোরগ নয়। এটি একটি বন মোরগ। মোরগ ২টি জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে ময়লা আবর্জনা থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খাবার খুঁজে খায়। মোরগের আকার ও বর্ণনা জানার পর বিশেষজ্ঞরাও এটিকে বন মোরগ বলে নিশ্চিত করেছেন।

এই লোকালয়ে বন মোরগ আসলো কোথা থেকে জানতে চাইলে বিশেষজ্ঞ আমিনুর রশীদ কাদেরী জানান, ঐ এলাকার অদুরে বন জঙ্গল রয়েছে। গভীর রাতে ঘুরতে ঘুরতে কোনভাবে জঙ্গল থেকে বন মোরগ ২টি লোকালয়ে এসে পড়ে। আসার পর এরা আর জঙ্গলে ফিরে যাবার পথ খুঁজে পায়নি। তাছাড়া মোরগ ২টি বর্তমানে যেখানে বিচরণ করছে তার আশে পাশেও হালকা জঙ্গল রয়েছে। জঙ্গল থাকায় এবং খাবার খুঁজে পাওয়ায় মোরগ ২টি নিরাপদেই ঘুরে বেড়াতে পারছে। আর বন মোরগ দেখতে কিছুটা দেশী মোরগেরমত হওয়ায় সাধারণ লোকজনের চোখে পড়লেও তারা কিছু আঁচ করতে পারেননি। সাধারণ লোকজন যদি বুঝতে পারে লোকালয়ে বন মোরগ ঘুরে বেড়াচ্ছে তাহলে তারা যে কোন উপায়ে এদের ধরে খেয়ে ফেলবে।

আমাদের প্রকৃতি থেকে বন মোরগ ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। গভীর বন জঙ্গলেও এখন বন মোরগের দেখা সচরাচর পাওয়া যায়না। এই বন মোরগ ২টি কতদিন এভাবে লোকালয়ে নিরাপদে ঘুরে বেড়াতে পারবে তাও সঠিকভাবে বলা যাচ্ছেনা। এদিকে মুরগীটি ইতিমধ্যে বাচ্চা দিয়েছে। ছোট ছোট কয়েকটি বাচ্চা নিয়ে মুরগী ঘুরে বেড়ায়। একটু শব্দ হলেই মুহুর্তেই বাচ্চারা ঝরে পড়া পাতার ভেতর ঢুকে পড়ে। আর লুকিয়ে লুকিয়ে এরা একা স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে পারে।
বন মোরগকে অনেক দুর পর্যন্ত উড়তেও দেখা গেছে। একদিন দুপুর বেলা হঠাৎ চোখে পড়ল বন মোরগটিকে ৪টি কুকুর ঘিরে ধরেছে। আমি তাকিয়ে দেখছি কুকুর গুলো চতুর্দিক থেকে আস্তে আস্তে বন মোরগের খুব কাছে চলে এসেছে। এই বুঝি খপ করে কুকুর বন মোরগকে ধরে ফেলে এই যখন অবস্থা তখন হঠাৎ মোরগটি উপরের দিকে উড়াল দিলো। চোখের পলকে এক থেকে দেঢ়শ ফুট দুরে উড়াল দিয়ে চলে গেল।

সন্ধ্যা হলেই বন মোরগ বিভিন্ন গাছের মগ ডালে উঠে বসে। সারারাত সেখানেই অবস্থান করে। ভোরে আবার আস্তে আস্তে গাছের চুড়া থেকে নেমে আসে। পুরুষ বন মোরগকে শরীরের সকল শক্তি প্রয়োগ করে বিকট শব্দে ডাকতে দেখা গেছে। একটানা আধা ঘন্টা পর্যন্ত বন মোরগ নিজের মত করে ডাকে। অনেক দুর থেকে বন মোরগের ডাক শোনা যায়।

প্রিয় পাঠক ‘মানুষের কবল থেকে বন মোরগ ২টির জীবন রক্ষা করতে বন মোরগটির সঠিক অবস্থান এখানে উল্লেখ করা হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। বন মোরগ গুলো যাতে নিরাপদে আবার জঙ্গলে ফিরিয়ে দেওয়া যায় সে ব্যাপারে বন বিভাগের সহযোগিতা চাওয়া হয়। তবে বিষয়টি যত দ্রুত করা যায় ততই মঙ্গল। কেননা বর্তমানে যে এলাকায় বন মোরগ গুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে তার চতুর্দিকে অনেক বসতি এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ জনের বসবাস রয়েছে। রাতে এই এলাকায় শিয়ালের পালও ঘুরে বেড়ায়। দিনে মানুষ রাতে শিয়াল। মানুষ আর শিয়াল কার কবল থেকে বন মোরগ নিজেদের কত দিন রক্ষা করতে পারবে?

তবে আমিনুর রশীদ কাদেরী বলেন গুলি করে মারা ছাড়া বন মোরগকে অন্য কোনভাবে সচরাচর ধরা সম্ভব হবেনা। আর বন মোরগ দীর্ঘ সময় এক যায়গায় অবস্থান করবেনা। একবার যদি কোন হামলার সম্মুখিন হয় তবে তারা দ্রুত জায়গা পরিবর্তন করবে।

বন মোরগের রং লাল আর বন মুরগির রং হালকা লাল, হলুদ ও কালো। বন মুরগি ১০-১২টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো দেখতে দেশীয় মুরগির ডিমের চেয়ে একটু ছোট। বন মোরগ-মুরগি গহীন অরণ্যে থাকতে পছন্দ করে। এক সময় পাহাড়ে গেলেই দেখা যেত বন মোরগের ছুটাছুটি। কিন্তু এখন তা একেবারেই দুর্লভ। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে বান্দরবানের লামা উপজেলায় শিকারীদের উৎপাতে দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে বন মোরগ।

প্রতি শনি ও মঙ্গলবার লামা পৌর শহরের মাছ বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ১০-২০ জন শিকারী বন মোরগ এবং পোষা বন মোরগের প্রায় বিকিকিনি চলে। প্রকাশ্যে বন মোরগ বিক্রি করলেও এ ক্ষেত্রে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন অকার্যকর। ফলে পাহাড় থেকে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে এ মোরগ। আগের মত এখন আর সচরাচর দেখা যায় না বন মোরগ-মুরগি। তবে শুষ্ক মৌসুমে লামা পৌর এলাকার রাজবাড়ী প্রবাসের ডুরি ও জাহাঙ্গীরের ডুরিসহ গহীন পাহাড়ের জঙ্গলে কিছু কিছু সময় বন মোরগ-মুরগি দেখা যায়।

গত মঙ্গলবার সকালে লামা বাজারে কথা হয় বন মোরগ শিকারী নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, ঘরে পোষা বন মোরগকে বন মোরগের আবাসস্থলের কাছাকাছি নিয়ে পায়ে চিকন রশি দ্বারা বেঁধে রাখেন। পোষা বন মোরগ তখন বাঁক দিতে থাকে। তখন বন মোরগগুলো এ মোরগটিকে মারতে আসে। মারামারির এক পর্যায়ে দূরে লুকিয়ে থাকা শিকারী দৌড়ে গিয়ে বন মোরগটিকে ধরে ফেলেন। কোন কোন শিকারী চিকন সুতার কল, ফাঁদ ও জাল দিয়ে একসাথে ৭-৮টি মোরগ-মুরগি শিকার করেন।

আবার কোন কোন শিকারী ধানের সাথে বিষ মিশিয়ে আবাসস্থলে ছিটিয়ে দেয়। আর এ ধান খেয়ে ছোট-বড় অনেক মোরগ-মুরগি মারা যাওয়ার ৩০-৪০ মিনিট আগে জবাই দিতে হয়। অন্যথায় এরা নিজের পায়ের ধারালো নখ দিয়ে গলার রগ ছিড়ে আত্মহত্যা করে।

সূত্র জানায়, শিকারীরা ১টি বন মোরগ বিক্রি করেন ৩০০-৪০০ টাকা। আর বন মুরগি বিক্রি করে ১৫০-২০০ টাকা। অনেকে অতিথি আপ্যায়ন অথবা সখ করে খাওয়ায় জন্য শিকারীদের আগাম টাকা দিয়ে থাকেন। তবে একটি পোষা বন মোরগের দাম ৩-৪ হাজার টাকা। পরীক্ষা নিরীক্ষায় যে বন মোরগটি বেশী ভালো মনে হয় তার দাম আরো একটু বেশি।

তিনি আরও বলেন, অন্যান্য সময়ের চেয়ে শীত মৌসুম বন মোরগ শিকারের উপযুক্ত সময়। এ সময় একটি পোষা বন মোরগ থেকে মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ৭টি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক শিকারী বন মোরগ শিকার কাজে নিয়োজিত রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

আরেক শিকারী জাফর বলেন, বন মোরগ পোষ মানাতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। প্রথমত বন মোরগের আবাসস্থল থেকে ডিম সংগ্রহ করতে হয়। তারপর দেশি মুরগি দ্বারা তা দিলে ২১ দিন পর বাচ্চা ফুট। বাচ্চা ফোটার দিন থেকে এই বাচ্চা বেঁধে রেখে লালনপালন করতে হয়। না হলে ৫-৭দিন পর অথবা একটু একটু পাখা গজালে বাচ্চাগুলো উড়াল দিয়ে পাহাড়ের জঙ্গলে চলে যায়। এই মুরগি বড় হয়ে ডিম পাড়লে; বাচ্চা ফোটালে ওই বাচ্চা পোষা বা গৃহপালিত হয়। পোষা বন মোরগ শিয়াল বিড়ালে নষ্ট করতে পারে না। এদের রোগ বালাইও কম হয়।

অভিজ্ঞদের মতে, ১০টি দেশীয় মুরগি প্রজননের জন্য একটি মোরগ প্রয়োজন হয়। কিন্তু একটি বন মোরগ ২০টিরও বেশি মুরগিকে প্রজনন দিতে সক্ষম। এছাড়া এই বন মোরগ লড়াইয়ের ক্ষেত্রে খুবই পটু। একটি বন মোরগের সাথে বড় আকারের দুটি দেশিয় মোরগ রড়াই করে কুপোকাত হয়ে যায়। বন মোরগের পায়ের নক ও ঠোঁট খুবই ধারালো।

লড়াইয়ের সময় বন মোরগ অন্য মোরগকে নখ দিয়ে আঁচড় দেয় এবং ডানা দিয়ে ঠাস ঠাস আঘাত করে দেশীয় মোরগকে ধরাশায়ী করে ফেলে। স্থানীয়রা জানান, এভাবে বন মোরগ শিকার করা হলে অচিরেই পাহাড় থেকে বন মোরগ হারিয়ে যাবে।

পশ্চিম রাজবাড়ীর বন মোরগ শিকারী মো. শফি আলম বলেন, দিনকাল এখন ভালো যাচ্ছে না। শীত মৌসুম আসলে পোষা বন মোরগটি দ্বারা ১০-১২টি বান মোরগ মুরগি শিকার করি। এক একটি বন মোরগের বাচ্চা ৪০০-৫০০ টাকা হারে বিক্রি করে থাকেন বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন আহমদ বলেন, বন মোরগ শিকারের বিষয়টি আমি অবগত নই। তবে কেউ বন্য প্রাণী শিকার করলে, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।