বর্ণনার মত ঝর্ণাধারা খুঁজে পাওয়া সম্ভব

0
56

রাশেদ পারভেজ::

।‘ঝর্ণা! ঝর্ণা! সুন্দরী ঝর্ণা!/ …অঞ্চল সিঞ্চিত গৈরিকে স্বর্ণে/গিরি-মল্লিকা দোলে কুন্তলে কর্ণে/তনু ভরি যৌবন, তাপসী অপর্ণা!/ঝর্ণা! ঝর্ণা!’

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘ঝর্ণা’ কবিতায় যেরকম লিখেছিলেন চাইলেই কি আর সেই বর্ণনার মত ঝর্ণাধারা খুঁজে পাওয়া সম্ভব? তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা জুড়ে যে ছোট বড় নানান রকমের ঝর্ণা, তার কমই মানুষ জানে। যেগুলো সচরাচর সংবাদ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি হয়। তার বাইরে অনেকেই জানেন না।

পাঠকদের সাথে নিয়ে আজ তেমনি এক সুন্দরী প্রাকৃতিক ঝর্ণা ঘুরে আসবো। যেটি এখনো অনেকটাই অপরিচিত।

‘পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝর্ণা বলো’ জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীর গাওয়া গানটিতে ঝর্ণা পাহাড়ের কান্না হলেও আমাদের রূপসী এই জলপ্রপাতটি আপনার মন ভালো করে দেবে। চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহামড়কের ঘাগড়া অঞ্চলের কলাবাগানে অবস্থিত। রাঙামাটির কাউখালী উপজেলাধীন ঝর্ণাধারাটি স্থানীয়ভাবে ‘কলাবাগান ঝর্ণা’ হিসেবেই পরিচিত। এটিকে দেশের ‘দীর্ঘতম ঝর্ণাধারা’ বললেও বোধহয় অতিরঞ্জিত হবে না। কেননা এখানে কেবল একটি ঝর্ণা নয়, সারিবদ্ধভাবে ছোটবড় অন্তত ৮-১০ টি ঝর্ণাধারা রয়েছে। যার মধ্যে ৪-৫ টি বড় বড় ঝর্ণাধারা। পাহাড়ি বন্ধুর অথচ ‘মসৃণ’ পথে প্রথম ঝর্ণা থেকে সর্বশেষ ঝর্ণার দূরত্ব হবে অন্তত দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার।

রাঙামাটি সড়কের ঘাগড়া সেনাবাহিনী ক্যাম্প থেকে ৩-৪ কিলোমিটার এগিয়ে কলাবাগান এলাকা। চাকমা অধ্যুষিত এলাকাটিতে বড়জোর শ’খানেক লোকের বসবাস। তবে অন্যান্য পাহাড়ি ঝর্ণাধারার মত এখানকার পথঘাট অতটা দুর্গম নয়। মূল সড়ক থেকে হাতের বামে প্রবাহমান একটি ছোট্ট পাহাড়ি ছড়া পেরিয়ে মাত্র পাঁচ মিনিট হেঁটেই যাওয়া যাবে ঝর্ণা তলায়। সেই ছড়ার উপর ছড়িয়ে-ছিঁটিয়ে থাকা অংসখ্য নুড়ি পাথরের উপর দিয়ে পায়ে হেঁটে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে করতে এগিয়ে যেতে হয় মূল ঝর্ণার দিকে।

চলার পথেই অসংখ্য ছোট ছোট ঝর্ণা (স্থানীয় ভাষায় ছড়া) পর্যটকদের নজর কাড়তে শুরু করবে। মাত্র পনেরো মিনিট হেঁটে এগোলেই দৃষ্টিনন্দন প্রথম বড় ঝর্ণাটি স্বাগত জানাবে ভ্রমণ পিপাসুদের। এরপর হালকা পিচ্ছিল অথচ মসৃণ পথ বেয়ে উপরের দিকে উঠতে গিয়ে দুরন্ত কৈশোরের দুষ্টুমিও ভর করতে পারে। যেমন বৃষ্টির ভেতর শেওলা পড়া উঠানে পা টিপে টিপে দৌড়ুনোর দিন, অথবা নদী-পুকুর-বিলের উঁচু পিচ্ছিল পাড় থেকে ঢালুর দিকে নেমে যাওয়ার মতো দিন ফিরে পাওয়া গেছে আবার!

স্বচ্ছ পানি দেখে জলরঙ্গ খেলার লোভও জাগতে পারে। যেনো ঝর্ণা আর পাহাড় যুক্তি করে বয়স কমিয়ে দিয়ে কৈশোরে পাঠাচ্ছে। চলতি পথেই হয়তো দেখা যাবে আপনারই দলের  কেউ আবার এক কাঠি সরেস! তপ্ত দুপুরের কাঠফাটা রোদের দস্যি ছেলে হয়ে সেই শীতল পানিতেই গা এলিয়ে দিয়ে পাথরের পিঠে ইচ্ছেমত শরীরটাকে ঘষে শীতল করা যাবে।

আরেকটু সামনে গেলে আরো উঁচুতে অপর ঝর্ণাটি পর্যটকদের ক্লান্তি দূর করে বিমোহিত করবে। কখনো ইস্পাত-কঠিন পাথরের দেয়াল দেখে মনে হবে এ আপনার চেনা জানা বাংলা নয়, অন্য কোনো দূরের দেশ। কখনো পাথরের উপর থেকে নিচে বিশাল গর্ত দেখে আলুটিলার গুহাও মনে হতে পারে। আর শেষ বিকেলে ঝর্ণাধারায় যখন সূর্যের লালচে-হলুদ আলো পড়বে, তখনকার সূর্যালোক আর জলধারার সঙ্গম আপনাকে মুগ্ধ করতেই পারে।

এভাবে একেকটা ঝর্ণাধারা পেরিয়ে একের পর এক যত উঁচুতে উঠবেন ততই আপনি মুগ্ধ হতে থাকবেন। উপর থেকে নিচের দিকে তাকালে মনে  হবে আপনি ছোটখাটো এভারেস্ট জয় করে ফেলেছেন। সবশেষ আকাশচুম্বী যে ঝর্ণাটি রয়েছে তার উচ্চতা এত বেশি যে কোন পর্যটক তার কাছে ঘেঁষতে ভয় পেয়ে যাবেন। তবে জলপ্রপাতের সৌন্দর্য সুধা পান করতে এসে ভড়কে না গিয়ে ঝুঁকি নিয়েও অনেক সেলফিবাজরা সাহসিকতার পরিচয়ও দিচ্ছেন।

মনোরম এই প্রাকৃতিক ঝর্ণাগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সমতল থেকে স্তরে স্তরে অন্তত দেড় থেকে দুইশ ফুট উঁচু থেকে পানি ঝড়ে পড়া। প্রতিটি ঝর্ণারই রয়েছে একেবারে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, যা স্বচক্ষে না দেখলে কারো বিশ্বাস হবে না। কলাবাগানের ঝর্ণাধারার পানি এত বেশি পরিস্কার ও স্বচ্ছ যে ঝর্ণার উপরিতল থেকে ইচ্ছেমত হাত-পা ছেড়ে দিয়ে ৫০-৬০ ফুট নিচে অবলীলায় নেমে যাওয়া যায়। পা পিছলে পড়ে যাওয়ার কিংবা পাথরকুচির সাথে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনার লেশমাত্র এখানে নেই। তবে সাবধানের তো আর মার নেই! এখানকার পানি স্বচ্ছতা দেখে অনেক পর্যটক বিমোহিত হয়েছেন। অনেককে নিজেদের মিনারেল ওয়াটারের বোতলের পানি ফেলে দিয়ে ঝর্ণাধারার পানি পান করতেও দেখা গেছে।

অপার সম্ভাবনাময় প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া অপরূপ এই সৌন্দর্য্যের সমারোহ উপভোগ করতে ইদানিং চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে নির্জন কলাবাগান। বিশেষ করে শুক্রবার বিকেলে দারুণ জমজমাট হয়ে পড়ে চাকমা অধ্যুষিত এই এলাকাটি। তবে নিরাপত্তা ঝুঁকিই এখানকার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা।

প্রকৃতি এখানে যতই উদারতা দেখাক না কেন, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে না এলে হয়তো পাহাড়েই কেঁদে মরতে হতে পারে দেশের দীর্ঘতম (সম্ভবত!) প্রাকৃতিক ঝর্ণাধারাটির। এখানে পর্যটকদের জন্য নেই কোন হোটেল-রেস্টুরেন্ট কিংবা বিশ্রামের জন্য রেস্ট হাউজ। তবে কিছু স্থানীয় কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক  প্রায়শই বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করার পাশাপাশি চুরি-ছিনতাইয়ের ঝুঁকিতেও আতঙ্কিত থাকেন পর্যটকরা।

তবে নিরাপদ থাকতে খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন এখানে হবে না। প্রথমত পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য একটি পুলিশ ফাঁড়ি এবং ঝর্ণা এলাকায় কিছু নিরাপত্তাকর্মীদের জানানো। তারপর মাত্র আধা কিলোমিটারের মত একটা যাতায়াতের ছোট্ট রাস্তা।

পর্যটকদের দাবি, দারুণ দৃষ্টিনন্দন এই প্রাকৃতিক ঝর্ণারাশিকে পর্যটন সুবিধার আওতায় আনতে পারতে ‘কলাবাগান ঝর্ণা’ হয়ে উঠতে পারে রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সবচাইতে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রের একটি।

লেখকের ই-মেইল: rashedcu2014@gmail.com