বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারিদের ঈদের বোনাস ও বেতন প্রাপ্তিতে আর কত দুর্ভোগ পোহাতে হবে?

0
42

শিমুল কান্তি মহাজন:: সারাদেশের ৯০% শতাংশ জনগোষ্ঠীর সন্তানকে শিক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বেসরকারি স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রতিবার ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহার পূর্বে বেতন ও বোনাসের টাকা উত্তোলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। পরিবার পরিজনদের ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত রাখতে হয়। এবারো ৩০ হাজার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঁচ লক্ষাধিক এমপিও ভূক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আনন্দ ও তাদের পরিবার পরিজন ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবেন। নতুন পোশাক ও কেনাকাটা করা যাবে না বেতন ও বোনাসের টাকায়।

আগামী ৫ জুন পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। গত ২৬ মে চলতি মে মাসের সরকারি বেতনের অংশ ও ঈদ বোনাসের চেক ছাড় হলেও টাকা তোলার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে ৩ জুন পর্যন্ত। চলতি সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আদেশ না পৌঁছালে এবারো ঈদের আগে টাকা তোলা সম্ভব হবে না। সোমবার (২৭ মে) পর্যন্ত কোন আদেশ আসেনি। আগামী সপ্তাহে শুধু সোমবার (৩ জুন) ব্যাংক খোলা থাকবে। উপজেলা সদরের একটি ব্যাংকের শাখায় বেতন ও বোনাসের বিল ব্যাংক জমা নিয়ে সেদিনই তা প্রত্যেক হিসাবে পোষ্টিং করা সম্ভব হবে না। শিক্ষক-কর্মচারিদের বোনাস ও বেতন উত্তোলনের শেষ দিন ৩ জুন হওয়ায় এ ভোগান্তি। এক সপ্তাহ আগে আদেশ জারি করলে এ ভোগান্তির আশংকা ছিল না।

জানি না পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে সরকার তার নিজ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত মানুষ গড়ার কারিগর বলে খ্যাত শ্রেষ্ঠ মানুষদের উপর এমন অমানবিক অবিচার করে কিনা! এখনো পর্যন্ত শিক্ষকরা সব দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষ। যারা সমাজে এখনো সবচেয়ে কম দুষ্কর্মের সঙ্গে জড়িত। বেসরকারি শিক্ষকরা শুধু দিয়েই যাচ্ছে সমাজকে। সমাজের ভবিষ্যত বংশধরকে গড়ে তোলার কাজে তাঁরা প্রতিনিয়ত শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর শিক্ষক কর্মচারিদের এসব বঞ্চনার সম্মুখীন হতে হয় না। বেসরকারি শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত সরকারের অমানবিক বৈষম্যমূলক পীড়াদায়ক আচরনের শিকার। বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারিদের কতটুকু দুর্ভোগ পোহাতে হয় একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কারো পক্ষে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। সীমাহীন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শিক্ষা ব্যবস্থার চাকাটি মোটামুটি সচল রাখার ব্যাপারে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছেন এমপিও ভূক্ত বেসরকারি শিক্ষ কর্মচারিরা।

সারা দেশের প্রায় ত্রিশ হাজার বেসরকারি এমপিও ভূক্ত স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় কর্মরত পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষক কর্মচারি। এমপিও ভূক্ত এসব শিক্ষক কর্মচারিরা জাতীয় স্কেলে মূল বেতন পেলেও বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও উৎসব ভাতায় ব্যাপক বৈষম্য। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের ঈদ ও পূজা পার্বনের সময় মূল বেতন স্কেলের সমমানের পূর্ণ বোনাস প্রদান করা হয়। অনশন, ক্লাস বর্জন ও ধর্মঘট করে কিঞ্চিত টনক নড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। অনেক আন্দোলন সংগ্রামের পর বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য ২৫% ও কর্মচারিদের ৫০% বোনাস দেয়া হচ্ছে। প্রতিবছর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার পূর্বে বেতন ও বোনাস নিয়ে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারিদের সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। ফি বছর শিক্ষক কর্মচারিদের পরিবার পরিজনদের ঈদের আনন্দ ও কেনাকাটায় হতাশা বিরাজ করে।

অথচ সরকার ২০৩০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বদ্ধ পরিকর। এসডিজি (ঝউএ)-৪ এ টার্গেট নির্ধারন করা হয়েছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা মানসম্মত ও সর্বজনীন হবে। অথচ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এখনো সঠিক পরিকল্পনা নেই। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে বঞ্চনার অবসান ঘটেনি বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারিদের। কল্পনায়-স্বপ্নে-প্রত্যাশায় দিন কাটছে বেসরকারি শিক্ষক সমাজের। স্বপ্নবন্দি শিক্ষক সমাজ অবহেলায় অবজ্ঞায় দিন কাটাচ্ছে। শিক্ষক সমাজের মান, দক্ষতা ও যোগ্যতা ধরে রাখতে না পারলে আমাদের উন্নয়নের লক্ষ অর্জন হবে না।

লেখক: প্রধান শিক্ষক, ড. শহীদুল্লাহ একাডেমী, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখা। simulmohajan@gmail.com