বৈসাবির বর্ণিল উৎসব মাতিয়ে তুলেছে পাহাড়

0
111

তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়িতে নানান আয়োজনে বৈসাবির বর্ণিল উৎসব মাতিয়ে তুলেছে পাহাড়ি নানান আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে। পাহাড়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সম্প্রদায়ের প্রাণের উৎসব বৈ-সা-বি। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু, মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিঝু- এ তিন সম্প্রদায়ের উৎসবের নামের প্রথম অক্ষর নিয়েই বৈসাবি’র নামকরণ। আর এটিই বর্তমানে পাহাড়ে উদ্যাপিত সবচেয়ে বড় উৎসব। উৎসবটি পাহাড়ের নৃ-গোষ্ঠীদের ঐতিহ্যবাহী প্রধান সমাজিক উৎসবও।
বর্ষবরণ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বৈসুক বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা বৈসাবি নামেই পরিচিত। বাংলা বছরের শেষ দু’দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন- এই তিন দিন মিলেই মূলত পাহাড়ে বর্ষবরণ উৎসব পালন করে নৃ-গোষ্ঠীরা।
বান্দরবান :
সাঙ্গু নদীতে ফুল ভাসানোর মাধ্যমে বান্দরবানে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিষু উৎসব শুরু হয়। গতকাল শুক্রবার সকাল ৭ টায় এ উৎসবের প্রথমদিন ছিল। তঞ্চঙ্গ্যারা বৈসাবিকে তাদের ভাষায় বিষু বলে থাকে। একইদিন চাকমারাও ভিন্ন নামে পালন করছে বিজু উৎসব। ফুল বিষু উপলক্ষে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণীরা সকালে বান্দরবানের বালাঘাটা মুখে সাঙ্গু নদীতে বাহারি রঙের ফুল ভাসিয়ে পরিবার ও জাতির জন্য মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনা করেন। শহরের বালাঘাটাসহ বিভিন্ন পল্লীতে তরুণ-তরুণীরা মেতে উঠেছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলায়। পূণ্য লাভের আশায় আয়োজন করেন এই ঘিলা খেলা। জেলা শহরের বালাঘাটা বিলকিচ বেগম উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলার আয়োজন করা হয়। রাতব্যাপি তঞ্চঙ্গ্যা যুবক-যুবতীরা ঘিলা খেলায় মেতে উঠেন।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধান অতিথি হিসেবে ঘিলা খেলার উদ্ধোধন করেন পার্বত্য মন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি। এসময় জেলা প্রশাসক মো. দাউদুল ইসলাম, পুলিশ সুপার জাকির হোসেন মজুমদার, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য কাজল কান্তি দাশ। এছাড়াও তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থার সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, বিষু উৎসব কমিটির আহবায়ক কাঞ্চন জয় তঞ্চঙ্গ্যাসহ তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ এতে উপস্থিত ছিলেন।
বান্দরবানে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিষু উৎসব কমিটির সদস্য সচিব উজ্জল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ঘিলা তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের জন্য পবিত্র বস্তু। বিভিন্ন এলাকার তঞ্চঙ্গ্যারা এই খেলায় অংশগ্রহণ করেন। আগে ছোট পরিসরে আয়োজন করা হলেও এখন বর্ণাঢ্যভাবে এই খেলার আয়োজন করা হয়। ঘিলা খেলায় বান্দরাবন জেলা ছাড়াও রাঙামাটি থেকে এই খেলায় অংশগ্রহণ করেন। সারারাতব্যাপি তঞ্চঙ্গ্যা যুবক-যুবতীরা ঘিলা খেলা খেলে পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে বরণ করে নিবেন। তরুণ-তরুণীরাই মূলত এ ঘিলাখেলায় অংশ নেয়।
খাগড়াছড়ি :
চাকমা সম্প্রদায়ের নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এই উৎসবের। এই উৎসবকে তারা ফুল বিঝু বলে থাকেন। উৎসবকে ঘিরে মুখরিত এই পার্বত্য জনপদ। উৎসবের সূচনা উপলক্ষে খাগড়াছড়িতে কিরণের আলো ছড়ানোর আগেই ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ও বর্ণিল সাজে দল বেঁধে হাতে বাহারি রঙের ফুল নিয়ে চেঙ্গী নদীর পাড়ে ভীড় জমান বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। বাদ যায়না ছোট ছোট শিশুরাও।
ভোরের সূর্য উদয়ের সাথে সাথে গঙ্গা দেবীর প্রার্থনার উদ্দেশ্যে নদীতে ফুল ভাসিয়ে দেয়া হয়। ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে তারা পুরাতন বছরের জরাজীর্ণ গ্লানি, দুঃখ, কষ্টকে ভাসিয়ে দেয় এবং একই সাথে ফুলের পবিত্রতায় বরণ করে নেয় নতুন বছরকে। নতুন বছরের শুভ কামনায় নিজেদের পবিত্রতা কামনা করে থাকেন। ফুল ভাসানোর পর নদীতে স্নান শেষে ঘর সাজানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তারা। এসময় নদীর পাড়ের পরিবেশ হয়ে উঠে উৎসবমূখর। শুরু হয় পাহাড়ের নৃ-গোষ্ঠীদের তিন দিনের বৈসাবি উৎসব।
আজ শনিবার চাকমা সম্প্রদায় মূল বিজু আর পহেলা বৈশাখ বা গজ্জাপয্যা পালন করবেন। আজ ঘরে ঘরে চলবে অতিথি আপ্যায়ন। সেই সাথে সব বয়সী মানুষ নদী, খাল অথবা ঝরণায় গঙ্গা দেবীর পূজা আরাধনা করবেন। এছাড়াও ১৪ এপ্রিল নববর্ষের দিন থেকে মারমা অদিবাসীদের সাংগ্রাইং উৎসব শুরু হয়। ঐদিন মারমা স¤প্রদায়ের জলকেলি বা পানি খেলা দিয়ে সাংগ্রাইং উৎসব শুরু হবে।
রাঙামাটি :
বৈসাবি উপলক্ষে পাহাড়ি বাঙালি সকলের মাঝে বিঝু ও বৈসাবি ঘিরে পাহাড়ে রং লেগেছে। গতকাল শুক্রবার সকালে উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রাণের উৎসব বিঝু শুরু হয় পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে। শুক্রবার সকালে কাপ্তাই লেকের গর্জনতলী, কেরানি পাহাড় ও রাজবাড়ি ঘাটে তরুণ তরুণীরা নদীতে ফুল ভাসিয়ে তাদের পেছনের সকল পাপ পানিতে বর্ষণ করে দিয়েছেন। তারা মনে করেন বিভিন্ন রকমের ফুল পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে তাদের অতীতের সকল পাপ মোছন হয়ে গেছে। তাই তারা হাঁটু পানিতে নেমে তাদের নিজ নিজ ধর্ম মতে প্রার্থনা করে নদীতে ফুল ভাসিয়ে দেন।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা ও পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী গর্জনতলী সংলগ্ন ত্রিপুরা ঘাটে কাপ্তাই লেকে ফুল ভাসিয়ে ফুল বিঝুর উদ্ধোধন করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদ সদস্য স্মৃতি বিকাশ ত্রিপুরা ও গর্জনতলী এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা বলেন, পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করে নিতে কাপ্তাই লেকে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসানোর মধ্যে দিয়ে শুরু হলো বৈসাবির আনন্দ যাত্রা।
আজ শনিবার থেকে উপজাতি সম্প্রদায় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গাসহ ১১ টি ক্ষুদ্র জাতিসত্ত¡ার ধর্মীয় উৎস বিঝু, বিষু, বিহু, বৈসুক ও সাংগ্রাইন নামে পালন করা হচ্ছে। এই উৎসব চলবে টানা তিন দিন। উৎসবের ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি হয় নানান সবজির পাঁচন। ঐতিহ্যবাহী এই পাঁচন তৈরি করতে হলে ১৮-২০ প্রকারের সবজির প্রয়োজন হয়। পাঁচনকে আবার কেউ কেউ গন্ড বলেও আখ্যায়িত করেন।

বৈসাবি উৎসবে যেন রং লেগেছে পাহাড়ে। পাহাড়ের ক্ষুদ্র-নৃজনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসবকে ঘিরে নতুন সাজে সেজেছে পাহাড়ি পল্লীগুলো।

আজ শনিবার (১৩ এপ্রিল) বান্দরবানে মারমা সম্প্রদায়ের ৪ দিনব্যাপী সাংগ্রাই উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি।

উদ্বোধনের পর স্থানীয় রাজারমাঠ থেকে ‘সাংগ্রাই উৎসবে মিলবো আমরা সকলে একত্রিত হয়ে, শুদ্ধ হবো মৈত্রী বারি বর্ষণে’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রায় মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাকমা, ত্রিপুরা, ম্রো, চাক, খেয়াং, খুমী, বম, লুসাই, পাঙ্খোয়া সহ ক্ষদ্র-নৃ-গোষ্ঠী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণী এবং শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষরা নিজস্ব সাজসজ্জা, পোষাকে ব্যানার ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড নিয়ে অংশ নেয়।

শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে স্থানীয় রাজারমাঠে মারমা সম্প্রদায়ের বয়স্ক নারী-পুরুষদের প্রণাম করা বয়স্ক পূজা এবং শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং বলেন, ‘ধর্ম যার যার কিন্তু উৎসব সবার। সাংগ্রাই মারমা সম্প্রদায়ের সামাজিক উৎসব হলেও এ উৎসবে সবগুলো পাহাড়ি জনগোষ্ঠী অংশ নেয়। পাহাড়ি-বাঙালি সকলে উৎসবটি দেখতে ভিড় জমায়। এ উৎসবের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষ পুরনো বছরের সকল দুঃখ কষ্ট ভুলে গিয়ে ধুয়ে মুছেনতুন বছরকে বরণ করে।

সাংগ্রাই উৎসব উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক কোকোচিং মারমা বলেন, ‘উৎসবের দ্বিতীয় দিন আগামীকাল রবিবার দুপুরে উজানী পাড়াস্থ সাঙ্গু নদীচরে হবে পবিত্র বুদ্ধমূর্তি স্নান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। রাজগুরু বিহার থেকে সারিবদ্ধভাবে বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুরা (ভান্তেরা) কষ্টি পাথর এবং স্বর্ণের বুদ্ধ মূর্তি সহকারে পায়ে হেঁটে নদীচরে গিয়ে সমবেত হবেন। সেখানে সম্মিলিত প্রার্থনায় বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ এবং তরুণ-তরুণ, শিশু-কিশোররা অংশ নেবে। রাতে পাহাড়ি পল্লীগুলোতে চলবে তরুণ-তরুণদের পিঠা তৈরির প্রতিযোগিতা।’

তিনি আরো বলেন, ‘আগামী ১৫ ও ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে মৈত্রী পানি বর্ষণ পানি খেলা। সাংগ্রাই উৎসবের মূল আকর্ষণ- জলকেলী উৎসবের মাধ্যমে পাহাড়ি তরুণ-তরুণরা সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। ঐদিন সন্ধ্যায় রাজবাড়ি মাঠে অনুষ্ঠিত হবে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়াও বৌদ্ধ বিহারগুলোতে চলবে হাজারো মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন এবং ধর্মীয় প্রার্থনা।

প্রসঙ্গত, বাংলা নববর্ষ বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানকে পাহাড়ি সম্প্রদায়েরা ভিন্ন ভিন্ন নামে পালন করে আসছে বহু বছর ধরে। মারমা ভাষায় সাংগ্রাই, ত্রিপুরা ভাষায় বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বিসু এবং চাকমা ভাষায় বিজু’র সংক্ষেপিত রুপ হচ্ছে বৈসাবি। পাহাড়ি চার সম্প্রদায়ের প্রধান এই সামাজিক উৎসবকে সমষ্টিগতভাবে বৈসাবি বলা হয়। পাহাড়ে বর্ষবরণ উৎসব চলবে আগামী ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত।