বড় প্রস্থের জাহাজে আমদানি পণ্য এনে বিপাকে

0
8

কালের কণ্ঠ:: বড় প্রস্থের একটি জাহাজে আমদানি পণ্য এনে বিপাকে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বার্থ অপারেটর ও শিপিং এজেন্ট। ‘টিআর আরামিস’ নামের এই বিদেশি জাহাজ গত ৫ এপ্রিল বন্দর জেটিতে ভিড়েছে। এর দৈর্ঘ্য ও গভীরতা বন্দর জেটিতে প্রবেশের উপযোগী হলেও গোল বেধেছে এর প্রস্থ নিয়ে। বন্দরের ইতিহাসে এ ধরনের জাহাজ কখনো ভেড়েনি। আর বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এ ধরনের জাহাজ থেকে পণ্য নামানোর অভিজ্ঞতা নেই।

জাহাজ পরিচালনাকারীরা বলছে, প্রস্থ বেশি থাকায় জাহাজে থাকা এক হাজার ১৮৩ একক কনটেইনারের (প্রতি ২০ ফুটে এক একক কনটেইনার) মধ্যে ১৯১ একক কনটেইনার জাহাজ থেকে নামানো সম্ভব হচ্ছে না। এমনিতেই মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বহির্নোঙরে ৪৮ দিন অলস বসে থাকার পর জাহাজটি জেটিতে ভিড়েছে। জাহাজে ১৯১ একক কনটেইনার নামানোর জটিলতা এই শঙ্কা আরো বাড়িয়েছে আমদানিকারকদের। আর্থিক ক্ষতির বোঝাও বাড়ছে। দেশের শীর্ষ শিল্প গ্রুপগুলোর কয়েক হাজার কোটি টাকার আমদানি পণ্য রয়েছে জাহাজটিতে।

জানতে চাইলে জাহাজটির নতুন শিপিং এজেন্ট মেডিটেরানিয়ান শিপিং লাইনসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) আজমীর হোসেন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, “জাহাজটি সম্পূর্ণ নতুন এবং প্রথমবার পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে। জাহাজটি জেটিতে ভিড়িয়ে ‘কি গ্যান্ট্রি ক্রেন’ দিয়ে সর্বোচ্চ ১৩ সারি পর্যন্ত কনটেইনার নামানো যাবে। বাকি এক সারির কনটেইনার নামাতে হলে জাহাজটি ঘুরিয়ে আবারও জেটিতে লাগাতে হবে। এতে কিছুটা সময় লাগবে, কিন্তু এটা সম্ভব। বন্দরে পাইলট, টাগবোটসহ যত খরচ আসে সব আমরা বহন করব বলে নিশ্চয়তা দিয়েছি।”

তিনি বলেন, ‘আমরা জাহাজ পরিচালনা ও অনুমোদন কাজের সঙ্গে জড়িত বন্দরের মেরিন ও ট্রাফিক বিভাগ সবাই একমত হয়েছেন। এমনকি নেভাল আর্কিটেক্ট দিয়ে জরিপ করে সেই কনটেইনার নামানোর বিষয়ে সনদপত্রও জমা দিয়েছি। কিন্তু এখনো অনুমোদন মেলেনি। এই অবস্থায় ১৯১ একক আমদানি পণ্য নিয়ে জাহাজ রওনা দিলে নতুন জটিলতার সৃষ্টি হবে। ৫০ দিন পর আবারও যদি পণ্য না নামিয়ে জাহাজটি জেটি ছেড়ে যায় তাহলে আমদানিকারকরা আরো ক্ষতির মুখে পড়বে এবং বিদেশেও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জাহাজের এই জটিলতা এড়াতে ১৩ সারি কনটেইনার নামিয়েই চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ছিল। গত বৃহস্পতিবার জেটিতে ভেড়ার পরও একই সিদ্ধান্ত বহাল ছিল। কিন্তু দেশের ব্যবসায়ীদের স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে জাহাজটির সব আমদানি কনটেইনার নামিয়ে বন্দর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

নতুন সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর শাহীন রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমদানিকারকদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত দেন বন্দর চেয়ারম্যান। আমরা ভাটার সময় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও সতর্কতা নিয়ে জাহাজটি জেটিতে আবারও ঘুরিয়ে লাগাব। এর বাকি কনটেইনার নামানো হবে। আশা করছি নির্ধারিত ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই জাহাজটি বন্দর ছেড়ে যাবে।’

জানা গেছে, জাহাজটি ভিড়েছে চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনালে (সিসিটি)। সেখানে আধুনিক কি গ্যান্ট্রি ক্রেন দিয়ে জাহাজের কনটেইনার নামানো হবে।

জানতে চাইলে সিসিটির টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার ক্যাপ্টেন তানভীর হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের চারটি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন আছে, সেগুলোর সবই ১৩ এক্রস বা সারি পর্যন্ত পৌঁছে কনটেইনার তুলে জেটিতে আনতে পারে। সবগুলোর সক্ষমতা একই। আর চট্টগ্রাম বন্দরে আগে কখনো ১৪ সারির কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ আসেনি। ফলে বিষয়টি যথেষ্ট সতর্কতা ও কৌশল নিয়েই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হয়েছে।’

তানভীর হোসাইন বলেন, গতকাল শুক্রবার ভাটার সময় বিকেলে কিছু আমদানি পণ্য নামিয়ে ব্যালেন্স বা ভারসাম্য রেখেই জাহাজটি ঘুরিয়ে আনতে এক ঘণ্টা ১০ মিনিট সময় লেগেছে। তবে কোনো সমস্যা হয়নি।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ মিটার এবং ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ জেটিতে প্রবেশের অনুমতি রয়েছে। কিন্তু কত বড় প্রস্থের জাহাজ জেটিতে প্রবেশ করতে পারবে এ নিয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে বড় প্রস্থের জাহাজ এনে বিপাকে পড়েছে বন্দর, বার্থ অপারেটর ও শিপিং এজেন্ট।

মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী টিআর আরামিস জাহাজটি ২০১৭ সালে তৈরি হয়েছে। জাহাজটি পোর্ট কেলাং থেকে প্রথমবার আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার বোঝাই করে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে।

জাহাজের শিপিং এজেন্ট মার্কো শিপিং লাইনস বলছে, ভবিষ্যতেও এই জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে পণ্য নিয়ে ভিড়বে, তবে ১৩ সারি পর্যন্ত কনটেইনার বোঝাই করা হবে। এবার মূলত ১৪ সারি কনটেইনার বোঝাই করে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পরই আমাদের অবহিত করা হয়েছে। তখন আসলে করার কিছুই ছিল না।