মন জুড়ানো ফুলে ভালোবাসার ছোঁয়া

0
58

মির্জা ইমতিয়াজ শাওন:: চোখ ধাঁধানো ফুল ছড়িয়েছে অন্য আলো। জিপসি, গ্লাডিওলাস, ডালিয়া, গাঁদা, জারবেরা, কাঠমালতী, কামিনী, বেলি, জবা, গন্ধরাজসহ নানা প্রজাতির ফুলে ছেয়ে গেছে বন্দর নগরীর সবগুলো ফুলের দোকান। নগরীর চেরাগী পাহাড়, মোমিন রোডসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ফুলের দোকান। গত তিন চার বছরের মধ্যে শুধুমাত্র চেরাগী পাহাড় ও মোমিন রোড এলাকাতেই গড়ে উঠেছে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫০টি ফুলের দোকান।

ভালোবাসা দিবস আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে ঘিরে এসব ফুল দোকানে চলে রাজ্যের ব্যস্ততা। বসন্তকে স্বাগত জানাতে পহেলা ফাগুনকে নিয়ে আশায় বুক বেঁধেছেন চট্টগ্রামের এসব ফুল ব্যবসায়ীরা।
ফুলের কদর বেড়ে দিবসের আমেজ বইতে শুরু করেছে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল জাতীর ভেতর । বসন্ত বরণ, ভ্যালেন্টাইনস ডে উপলক্ষে উৎসব মুখর হয়ে উঠেছে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। মানুষের ভালোবাসার বহুমাত্রিক রূপ প্রকাশের আনুষ্ঠানিক দিন আজ। বসন্তবরণ আর ভালোবাসা দিবসে দেশের হাজারো তরুণ তরুণী ছোট্ট একটি ফুল প্রিয় মানুষটির হাতে তুলে দিয়ে প্রকাশ করে হৃদয়ের জমে থাকা গভীর ভালোবাসার কথা। তবে এ ভালোবাসা কেবল তরুণ-তরুণীর নয়, বাবা-মার প্রতি সন্তানের, তেমনি মানুষের প্রতি মানুষেরও। ভালোবাসা ও অনুরাগে উদযাপিত হচ্ছে দিবসটি। সারাদেশের মতো উৎসবের ছোঁয়া লেগেছে চাটগ্রজুড়ে। ভালোবাসা দিবসে প্রিয় মানুষকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা অভিন্দন জানানোর জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করে রাখছে ভালোবাসার ভক্ত প্রেমিকরা।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সারা বছর ধরে ফুলের ব্যবসা চললেও, মূলত ফুলের ব্যবসা জমজমাট হয় পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি এবং পহেলা বৈশাখে। অন্য সময় দাম হাতের নাগালে থাকলেও, দিবসভিত্তিক ফুলগুলোর দাম হয় আকাশ ছোঁয়া।

নগরের বহু এলাকাতেই কমবেশি ফুলের দোকান মেলে। তবে চেরাগীর মোড় ফুলের জন্য বিখ্যাত, এখান থেকে পাইকারী দরে ফুল চালান হয় পুরো চট্টগ্রামে। এ পাইকারী বাজার ঘুরে দেখা গেল, প্রতিটি গোলাপ ২০ থেকে ৫০ টাকা, রজনীগন্ধার স্টিক ১৫ টাকা, প্রতিটি গাঁদার মালা ২০ থেকে ৫০ টাকা, জারবেরা ফুল ২০ থেকে ২৫ টাকা, অর্কিড স্টিক ৫০ টাকা, লিলি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, গ্লাডিওলাস রংভেদে ১৫ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উৎসবের মৌসুমে ফুলের দাম এমনিতেই বেশি থাকে। তবে এবার ফুলের বাজার আরও চড়া। ফুল ব্যবসায়ী ও চাষিরা বলছেন, অসময়ে বৃষ্টি ও ফুলে ছত্রাকের আক্রমণে বাজারে চাহিদার তুলনায় জোগান কম। তাই ফুলের দাম এ সময় অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুনতাসির জানান, দিবসকে ঘিরে ফুল দোকানিরা গলাকাটা ব্যবসা করছে। তিনি চেরাগী এলাকা থেকে চারটি লাল গোলাপ কিনেছেন ২০০ টাকা দিয়ে। যদিও অন্য সময় চারটি লাল গোলাপের দাম মাত্র ২০ টাকা।

পাইকারীতে বিভিন্ন রঙের গোলাপ ১০০টি ৬০০ টাকা, গ্লাডিওলাস ১০০টি ৭০০-১ হাজার টাকা ও প্রতিটি ১৪ টাকা, হলুদ ও কমলা রঙের গাঁদা ফুল ১০০টি ২০০-২৫০ টাকা, রজনীগন্ধা প্রতিটি ১৫ টাকা, বিভিন্ন জাতের রঙিন ফুল দিয়ে তৈরি একটি ফ্লাওয়ার বাস্কেট ৩০০ টাকা, বিভিন্ন ফুলের প্রতিটি বুকেট ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, জিপসি এক আঁটি ৩০ টাকা, চন্দ্রমল্লিকা এক আঁটি ৫০-৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

এ দোকানদার আলীমের ব্যাখ্যা, উৎসবের কারণে দাম বাড়তি। আর গ্লাডিওলাস ছাড়া অন্য সব ফুলের জোগান কম। দোকানদারদের কিনতে হয় বেশি দামে। ফলে ক্রেতাদের একটু বেশি খরচ গুনতেই হবে। একই কথা আরেক বিক্রেতা মো. দেলোয়ার বললেন, ‘পয়লা ফাল্গুন আর ভালোবাসা দিবসে ফুলের দাম বেশি থাকে। এবার প্রেমিকদের খরচাটা আরও বেড়ে যাবে।’

চট্টগ্রাম ফুল ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জসিম বলেন, ভালোবাসা দিবস ও বসন্ত বরণে ৩০-৩৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করার আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রামের চাষীদের কাছ থেকে ৪০ শতাংশ ফুলের যোগান আসে। আর ৪০ শতাংশ ফুল আসে ঢাকা ও যশোরের চাষীদের কাছ থেকে। যশোর থেকে আসে উন্নতজাতের রজনীগন্ধা, গাঁদা ও গ্লাডিওলাস। চট্টগ্রামের চকরিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, হাটহাজারীর চাষীরা সরবরাহ করেন গোলাপ, গ্লাডিওলাস ও জারবেরা ফুল। এছাড়া থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া থেকে আসে বাহারি রঙের অর্কিড। মোমিন রোডের ফুলের দোকানগুলোতে পাইকারি ও খুচরা ফুল বিক্রি করা হয়।

ফুলের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অমিত। অমিত নিউজচট্টগ্রামকে বলেন, ‘মানুষ ভালোবাসার পূজারী। আর ফুল হলো ভালোবাসার নিদর্শন। তাই ভালোবাসা দিবসে ফুলের কদর বেড়ে যায়।’ ‘আগে ভালোবাসা দিবসের প্রচলন ছিল না। ২০০০ সালের পর থেকে ভালোবাসা দিবস আস্তে আস্তে প্রসার লাভ করে। প্রতিবছর শুধু ভালোবাসা দিবস ঘিরে চেরাগীতে লক্ষ লক্ষ টাকার ফুল বিক্রি হয়।’

সংস্কৃতি কর্মী প্রিয়া আইস বলেন, ‘ভালোবাসা দিবস যতখানি না ভালোবাসার, তার চেয়ে বেশি ফুল বেচাকেনার বলে মনে হয়। যদিও বিষয়টা কিছু ঋণাত্মক হয়ে গেল, তাও এটাই বেশিরভাগ অর্থে সত্যি। পুজিঁবাদি সমাজে ফুলের দামেই যেন আজ ভালোবাসা বিক্রি হয়।’

ক্যাব সাধারণ সম্পাদক ইকবাল ছাবেরী বলেন ভালোবাসাবাসির মুর্হুত গুলো হয়ে উঠে অনেকটা সুমধুর। সামর্থ্য যাদের আছে তাঁরা প্রিয়জনকে নামি-দামি গিফ্ট উপহার দেন। আবার অনেকে ভালোবাসার নির্দশন হিসেবে প্রিয় মানুষকে শুভেচ্ছা জানান ফুল দিয়ে। তাইতো ভালোবাসা দিবসটি উপলক্ষে এদিন সারাদেশে বেড়ে যায় ফুলের কদর। এ উলক্ষে দাম বেশ বাড়ে এটা সহনীয় পর্যায়ে থাকা দরকার।