মাছেদের আনন্দ দিন, ধন্যবাদ ইউএনও হাটহাজারী

0
45

মির্জা ইমতিয়াজ শাওন, এডিটর-ইন-চিফ- নিউজ চট্টগ্রাম ::
মুখে প্রাণের হাসি! মাছ আলতো ছোঁয়ায় মুঠোয় নিয়ে হালদায় ছাড়তে তুমুল ব্যস্ত তিনি। আজ নিজ হাতে নানা প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে রেনু থেকে পরম যত্নে লালন পালন করে বড় পোনা মাছগুলো ছাড়তে পারাই যেন প্রাণের মহানন্দ! সাধারণের মাঝে সেই উল্লাসধ্বনি। মাছেদের আনন্দ আর ধরে না। অবাধ সাঁতারের জন্য অস্থির ওঠা মাছগুলো ছড়িয়ে পড়লো পুরো হালদায়। একটা মাছ হঠাৎ ঝলাৎ করে উঁকি দিয়ে লাফিয়ে উঠলো! এ যেন মাছেদের মুক্তির আনন্দ! আর মুক্তির আনন্দে পরম ভালোবাসায় অভিনন্দন জানালো। মাছেরা ছুটে বেড়ায় নিজেদের নতুন ঠিকানা হালদার মিঠা পানিতে। চমৎকারকাজটি করে যিনি দেখালেন তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন। মানবিক, আধুনিক, পরিশ্রমী, সংগঠক, লেখক, প্রজ্ঞাবান, চৌকশ, রুচিশীল, সফল একজন মানুষের কথায় বলছি। তাকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারলাম না, অনেক ধন্যবাদ “মো. রুহুল আমিন”।

পোনাদের ছটফটানির অবসান হয় বিশাল হালদার দেখা পেয়ে বড় মা মাছ ছোটদের পেয়ে বলে তোমরা হালদার পরিচিতি শুনো- হালদা নদী পার্বত্য চট্টগ্রামের বদনাতলী পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎসারিত হয়ে ফটিকছড়ি উপজেলার উত্তর-পূর্ব কোণ দিয়ে চট্টগ্রাম জেলায় প্রবেশ করেছে। সুউচ্চ শ্রেণীমালা উত্তরে রেখে হালদা নদী দক্ষিণ-পশ্চিম বরাবর প্রবাহিত হয়ে আবার দক্ষিণ গতিপথে এর মূল অববাহিকা গঠনকারী ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান ও চট্টগ্রাম শহরের বিবিরহাট, নাজিরহাট, সাত্তারঘাট ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান অতিক্রম করে গেছে। কালুরঘাটের কাছে এটি কর্ণফুলী নদীতে এসে মিশেছে। এর মোট দৈর্ঘ্য ৮০.৪৫ কিমি, যার মধ্যে নাজিরহাট পর্যন্ত ২৮.৯৬ কিমি সারা বছরই বড় নৌকা পরিবহণের উপযোগী, আর ছোট নৌকাগুলো আরও ২০/২৫ কিমি অভ্যন্তরে অর্থাৎ নারায়ণহাট পর্যন্ত চলাচল করতে পারে। কাঠ, বাঁশ, ছন ইত্যাদি বনজ সম্পদ রামগড়ের দক্ষিণাঞ্চল থেকে এই নদী দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে আসা হয় এবং চট্টগ্রাম শহরের পণ্যসামগ্রীর অধিকাংশই হালদা নদীপথে বড় মালবাহী নৌকার মাধ্যমে পরিবহণ করা হয়।

হালদার প্রধান উপনদী ধুরুং খুবই খরস্রোতা। এটি পার্বত্য এলাকার পাকশমিমুরা রেঞ্জ থেকে বের হয়ে পূর্বদিকে হালদা নদীর প্রায় সমান্তরালে সমগ্র ফটিকছড়ি উপজেলা ঘুরে পূর্ব ধলাই নামক স্থানে হালদা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। গত এক শতাব্দীর মধ্যে নদীটি বেশ কয়েকবার গতিপথ পরিবর্তন করেছে। ধুরুং-এর স্রোতধারাকে তার নিজস্ব প্রবাহপথে নিয়ন্ত্রিত রাখার কয়েকটি প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছিল, কিন্তু কোনটাই সফল হয় নি। এটি বর্তমানে ফটিকছড়ি উপজেলা সদরের দক্ষিণ-পশ্চিমে হালদা নদীতে মিশেছে, ফলে প্রায় ২৪ কিমি লম্বা মূল গতিপথটি শুকিয়ে আসছে। হালদা নদীর বেশ কিছু পাহাড়ি ছড়াও রয়েছে, যেগুলো পূর্বদিকের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো থেকে নেমে এর সঙ্গে মিশেছে। কর্ণফুলী নদীতে পতিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অর্থাৎ কালুরঘাট পর্যন্ত সমগ্র হালদা অববাহিকার জলের অভাব আংশিকভাবে পূরণ হচ্ছে এই ছড়াগুলোর মাধ্যমে; উপরন্তু আশপাশের কৃষি জমিতে সেচ সুবিধাও প্রদান করা যাচ্ছে।

হালদা নদীতে এতোদিন স্থানীয় হ্যাচারি থেকে কিনে কার্প জাতীয় মাছ ছাড়া হতো। ফলে এসব মাছ থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যেত না। এ কারণে হালদা থেকে নেওয়া রেণু প্রক্রিয়া করে তৈরি মাছ ফের হালদায় ছাড়ার উদ্যোগ নেন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন।

উল্লেখ্য মাছের পরিমাণ সমৃদ্ধ করতে দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীতে এক লাখ মাছ ছাড়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে উপজেলা প্রশাসন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রথম পর্যায়ে গতকাল মঙ্গলবার (০৮ অক্টোবর) হালদা নদীর সাত্তারঘাট অংশে ১০ হাজার এবং গড়দুয়ারা নয়াহাট এলাকায় ১০ হাজার পোনা ছাড়া হয়েছে।

প্রথমবারের মত উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে হালদা নদীর পোনা হালদায় ফেলার লক্ষ্যে একটি প্রকল্প গ্রহণ করি। তারই ধারাবাহিকতায় প্রথম পর্যায়ে সাত্তারঘাট অংশে ১০ হাজার এবং গড়দুয়ারা নয়াহাট এলাকায় ১০ হাজার পোনা ছাড়া হয়েছে। বাকিটা বিভিন্ন ধাপে ধাপে ফেলা হবে বলে জানিয়েছেন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন। এবারই প্রথম হালদা নদী থেকে সংগ্রহ করা মাছের রেণু প্রক্রিয়া করে তৈরি মাছ ফের হালদায় ছাড়া হয়েছে।

রুহুল আমিন জানান, গত ২৫ মে হালদা নদীতে মা মাছ ডিম ছাড়ে। এরপর স্থানীয়রা সেই ডিম সংগ্রহ করে হ্যাচারি অথবা মাটির তৈরি কুয়ায় স্থানীয় পদ্ধতিতে রেণু উৎপাদন করে। উৎপাদিত এককেজি রেণু ক্রয় করে গত জুন থেকে গড়দুয়ারা ইউনিয়নের একটি পুকুরে নিবিড় পরিচর্যা করা হয়। বর্তমানে মাছগুলো ৬ ইঞ্চি বা তার বেশি আকার ধারণ করায় আজ স্থানীয় জনগণ ও যারা হালদাকে ভালবাসে তাদের নিয়ে হালদা নদীতে অবমুক্ত করেছি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিভার রিচার্স ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। অতীতে স্থানীয় হ্যাচারি থেকে পোনা নিয়ে ছাড়া হলেও হালদার পোনা হালদাতে ছাড়ার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এবার হালদার পোনা হালদায় ছাড়ার কারণে মাছের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।