মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী খাবার ভেবে প্লাস্টিক খাচ্ছে

0
74

প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় পরিবেশ দূষণের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী দিয়ে বছরে ২০ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য বঙ্গোপসাগরে এসে পড়ছে। চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটান থেকেও এসব প্লাস্টিক বর্জ্য এসে পড়ছে বঙ্গোপসাগরে। ইতোমধ্যে বঙ্গোপসাগর থেকে আহরিত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও অণুজীবের পেটে ক্ষুদ্র আকারের প্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এমনকি পরিশোধিত-অপরিশোধিত উভয় প্রকার লবণেই ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণায় সম্প্রতি এ ঘটনা ধরা পড়ে। প্লাস্টিকের কণার উপস্থিতির কারণে মানব শরীরে ক্যান্সারসহ দুরারোগ্য ব্যাধি বাসা বাঁধে বলে জানান চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীরা জানান, মাইক্রো প্লাস্টিক বা প্লাস্টিক কণা আকারে খুবই ছোট বলে মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী এগুলোকে নিজেদের খাবার ভেবে ভুল করে খেয়ে ফেলে। আর প্লাস্টিক খাওয়া সেই মাছ আমরা খাই। মানে পরোক্ষভাবে আমরাও প্লাস্টিক খাই। তাই বঙ্গোপসাগরে এই প্লাস্টিক দূষণের ঘটনাকে ভবিষ্যৎ জনস্বাস্থের জন্য একটি ভয়াবহ ও মারাত্মক হুমকি হিসাবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. হারুণুর রশীদ বলেন, প্লাস্টিক কণা বর্জ্যের কারণে আমাদের বঙ্গোপসাগরে পরিবেশ দূষণের মাত্রা নির্ণয় করতে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে যৌথভাবে গবেষণা করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় এ পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে তা আঁতকে ওঠার মতো।
তিনি বলেন, আমরা যেখানেই প্লাস্টিকের দূষণ করি না কেন তা সাগরে গিয়ে পৌঁছায়। এসব প্লাস্টিকের মধ্যে বড় আকারের যেমন আছে, তেমনি আছে ৫ মাইক্রোমিটার বা তারও চেয়ে ক্ষুদ্র। আবার বড় প্লাস্টিকও সমুদ্রে গিয়ে ক্ষুদ্র আকারে ভেঙে যায়। সাগরে কিছু প্লাস্টিক ভাসমান আর কিছু প্লাস্টিক তলদেশে থাকে। এ উভয় প্রকার প্লাস্টিকই সমুদ্রের প্রাণীকূলের জন্য ক্ষতিকর।
ড. হারুনুর রশীদ বলেন, সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণের পর তা পানির তোড়ে দীর্ঘদিন ধরে ভাঙে। ভাঙা অংশগুলো পুনরায় সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে পুনরায় ভেঙে ন্যানো, মাইক্রো ও ম্যাক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়।
তিনি বলেন, এই ভাঙনের ফলে সৃষ্ট প্লাস্টিকের কিছু উপাদান (ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য, যেমন বিসফিনল) মানুষের দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। প্লাস্টিকে দূষিত মাছ খাওয়ার ফলে আমরা বিসফিনলের দূষণ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারি। মাছ ছাড়াও সমুদ্রের অমেরুদণ্ডী প্রাণীও মাইক্রোপ্লাটিক ‘ফিল্টার করে’ গ্রহণ করে বলে জানান তিনি। এছাড়া সমুদ্রের ক্ষুদ্র প্রাণী কণা বা জু-প্লাংকটন এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক ভক্ষণ করে। আবার এসব ক্ষুদ্র প্রাণিকণা বিভিন্ন মাছের খাদ্য বলে মাছ এদেরকে খায়। সেই মাছ খেতে গিয়ে আমরাও মাইক্রোপ্লাস্টিক খাই।
বিজ্ঞানী হারুন জানান, মাছের পেটে ছোট-বড় প্লাস্টিক পাওয়া থেকে বোঝা যায়, কিছু কিছু মাছ সরাসরি প্লাস্টিক ভক্ষণ করে থাকে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জুলফিকার আলী বলেন, কক্সবাজারস্থ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় বাঁকখালী নদীর মোহনা ও সোনাদিয়ার পাশে সমুদ্রের উপরিভাগের পানি থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে। লাবণী পয়েন্ট সৈকতের ও কাঁকড়া বিচের বালিতে প্লাস্টিকের দূষণ নির্ণয় করা হয়েছে এবং অপরিশোধিত ও পরিশোধিত (বাণিজ্যিক) লবণে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ পরীক্ষা করা হয়েছে।
গবেষক দলে ছিলেন ময়মনসিংহ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের প্রফেসর, কক্সবাজারের সন্তান ড. হারুনুর রশীদ, একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. কইজার আহমেদ সুমন এবং কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শাহনুর জাহেদুল হাসান।
গবেষক দলের প্রধান ড. হারুনুর রশীদ বলেন, বাঁকখালী নদীর মোহনার পানির উপরিভাগে ভাসমান অবস্থায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২০ হাজারেরও বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এছাড়া মহেশখালী, টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপ থেকে সংগৃহীত অপরিশোধিত লবণে কেজিতে প্রায় ১০০০টি এবং দেশের নাম করা বাণিজ্যিক কোম্পানির পরিশোধিত লবণে প্রতি কেজিতে পাওয়া গেছে ৭০০ থেকে ৯০০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক।
তিনি জানান, লাবণী পয়েন্ট সমুদ্র সৈকত ও উখিয়া-রামুর সংযোগস্থল কাঁকড়া বিচেও প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা নির্ণয় করা হয়েছে। যেখানে দেখা গেছে, কাঁকড়া বিচে প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা কক্সবাজার শহরের তুলনায় তিন গুণের বেশি। কাঁকড়া বিচটি রেজু নদীর মোহনায় হওয়ায় এ নদীর দীর্ঘ পথ দিয়ে নেমে আসা বিশাল এলাকার প্লাস্টিক বর্জ্য এখানে এসে বঙ্গোপসাগরের সাথে মিলিত হচ্ছে।
প্লাস্টিক বর্জ্য শুধু বঙ্গোপসাগরের জন্য নয়, পৃথিবীর নদ-নদী ও সমুদ্রগুলোর দূষণের জন্য প্রধানত দায়ী। পৃথিবীর নদীগুলো থেকে সমুদ্রে প্রতি বছর ১২ থেকে ২৪ কোটি মেট্রিক টন প্লাস্টিক বর্জ্য যায় বলে জানান বিজ্ঞানীরা।