মাতৃভাষা ভাব ও চেতনার বাহন

0
79

মাতৃভাষা প্রাকৃতিক ভাষা। আর যা কিছু প্রাকৃতিক তাই প্রাণসক্তিতে ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। তাই তো মাতৃভাষা নিশ্চিত চেতনার ভাষা, তা চেতনার বাহন।

মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ বা মায়ের দুধের মতো। মায়ের দুধের যেমন বিকল্প নেই, কোনো দুধই মায়ের দুধের সমকক্ষ নয়। তেমনি মাতৃভাষারও কোনো বিকল্প নেই, কোনো ভাষাই মায়ের ভাষার সমকক্ষ নয়। কেবল মাতৃভাষাই এমন একটি ভাষা যে ভাষা কাউকে বিশেষভাবে শিক্ষা দিতে হয় না এবং যে ভাষা একটা জাতির সবার জন্যই সমভাবে বোধগম্য।

মানব শিশু প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকেই মাতৃভাষা শিখে এবং তার অধিকারী বা হকদার হয়ে যায়। প্রকৃতি থেকে পাওয়া বলেই মাতৃভাষা প্রাকৃতিক ভাষা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই বান্দার অন্তরে মাতৃভাষার প্রতি সৃষ্টি করেছেন অকৃত্রিম আকর্ষণ, অনুরাগ ও ভালোবাসা। বান্দার মাতৃভাষা খোদার মনের অনুরাগে রাঙানো ভাষা।

তাই তো তিনি তার বান্দাদের জাতিসত্ত্বার ভাষা বা মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ সম্মান, মর্যাদা, মূল্য, গুরুত্ব ও তাৎপর্য দিয়ে প্রত্যেক রাসূলের কাছে নিজ নিজ জাতিসত্ত্বার ভাষা বা মাতৃভাষায় তারই কিতাব, সহিফা কিংবা ওহি নাজিল করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তার বান্দাদের জাতিসত্ত্বার ভাষা বা মাতৃভাষার প্রতি তার সেই চেতনা বোধেরই জানান দিয়েছেন।

তিনি স্পষ্টই ঘোষণা করেছেন, প্রত্যেক রাসূলকেই আমি স্বজাতির ভাষা দিয়ে পাঠিয়েছি যেন তাদের (স্বজাতিকে) পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পারে (সূরা ইবরাহিম-৪ আয়াত)। আর এ আয়াতই প্রমাণ করে দেয়, ভাষার বিষয়ে বোঝা ও বোঝানোটাই হচ্ছে বড় কথা। মানুষের অভিব্যক্তির প্রকাশ, ভাবের আদান প্রদান, শিক্ষাদিক্ষা ও হেদায়েতের জন্য ভাষার সৃষ্টি ও ভাষার ব্যবহার। তাই ভাষা (মাতৃভাষা) যেমন ভাবের বাহন তেমনি চেতনার বাহন।

বান্দাদের মাতৃভাষা বা জাতিসত্ত্বার ভাষায় তিনি এমনই হক বা অধিকার দিয়েছেন, কোনো অবস্থায় তিনি তার বান্দাদের এই হক বা অধিকার থেকে বঞ্চিত করেননি। তার কোনো নবী-রাসূল কিংবা কোনো জাতিকেই মাতৃভাষার বিকল্প পথ দেখাননি। মাতৃভাষাই আল্লাহর হেদায়েতের ভাষা এবং শিক্ষার বাহন ও মাধ্যম।

তাই তো তারই কিতাব (একেক কিতাব) একেক জাতির জাতিসত্ত্বার বাষা বা মাতৃভাষায় নাজিল করেছেন। বান্দাদের মাতৃভাষা যদি বিশেষ ভাষাই না হতো তাহলে তিনি কেন তারই কিতাব বিভিন্ন ভাষায় নাজিল করতে যাবেন? আরবি যদি বিশেষ ভাষাই হতো তাহলে তাওরাত, যাবুর, ইনজিল ও সহিফাগুলো আরবি ভাষাতে নাজিল করা যেত।

আল্লাহ তার একেক কিতাব একেক জাতির মাতৃভাষা বা জাতিসত্ত্বার ভাষায় নাজিল করে পৃথিবীর বাস্তবতায় অকাট্টভাবেই প্রমাণ করে দিয়েছন। তার কাছে গুরুত্ব পেয়েছে বান্দাদের জাতিসত্ত্বার ভাষা বা মাতৃভাষাই। কেননা কেবল মাতৃভাষা বা জাতিসত্ত্বার ভাষাই একমাত্র প্রাকৃতিক বোধশক্তি সম্পন্ন বা বোধগম্য ভাষা যা একটা জাতির উচ্চশিক্ষিত থেকে নিরক্ষর পর্যন্ত সবাই সমভাবে বুঝতে পারে।

দাউদ (আ.)-এর মাতৃভাষা বা জাতিসত্ত্বার ভাষা ছিল ইউনানি। আল্লাহ তার কাছে তারই (আল্লাহর) কেতাব যাবুর ইউনানি ভাষায় নাজিল করেছেন। দাউদ (আ.) ইউনানি ভাষায়ই নামাজ-কিতাব পাঠ করেছেন। এমনকি দাউদ (আ.)-এর সুমধুর সুরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে পাহাড়গুলো আল্লাহর তসবিহ পাঠ করত। এমনভাবে মূসা (আ.) তার জাতির ভাষায়, ঈসা (আ.) তার জাতির ভাষা, ইবরাহিম (আ.) তার জাতির ভাষায় নামাজ-কিতাব পাঠ করেছেন।

আল্লাহ তো তাদের অনারবি ভাষার নামাজকেই কবুল করেছেন। আল্লাহর নবী-রাসূলরাই তো মাতৃভাষাকে অবলম্বন করেই জান্নাতের ঠিকানায় পৌঁছিয়েছেন।

আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, (এই সরল-সঠিক পথের সন্ধান দিতেই) আমি এভাবে তোমাদের কাছে তোমাদর মাঝে থেকেই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছি, যে ব্যক্তি (প্রথমত) তোমাদের কাছে আমার ‘আয়াত’ পড়ে শোনাবে, (দ্বিতীয়ত) সে তোমাদের (জীবন) বিশুদ্ধ করে দেবে এবং (তৃতীয়ত) যে তোমাদের আমার কিতাব ও তার অন্তর্নিহিত জ্ঞান শিক্ষা দেবে, (সর্বোপরি) সে তোমাদের এমন বিষয়গুলোর জ্ঞানও শেখাবে যা তোমরা কখনও জানতে না (সূরা বাকারা-১৫১ আয়াত)।

অর্থাৎ আল্লাহর শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের জন্য তার কিতাব পাঠ করতে হবে এবং পাঠ করে শোনাতে হবে। সুতরাং হে যুগের আলেম ও ধর্মপ্রাণ সমাজ! তাহলে বলুন না বুঝে নামাজ কোরআন পাঠের অবকাশ থাকে কোথায়? আল্লাহ তো স্পষ্টই বলে দিয়েছেন তার কিতাব পড়তে হবে তার শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের জন্য। তার কিতাবের আন্তর্নিহিত জ্ঞানার্জনের জন্য। তাহলে না বুঝেও নামাজ কোরআন আরবিতে পাঠের যুক্তি থাকে কোথায়? সূরা বাকারার ১২২৯ নং আয়াতের একই কথা বলা হয়েছে।