রমজানে নারীর ইবাদত

0
15

নারী-পুরুষ প্রত্যেকের ওপর রোজা ফরজ। রোজা রাখার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তবে রোজার দায়িত্ব ও আমলের দিক থেকে নারীদের বিষয়টি একটু আলাদা। ঘরোয়া পরিবেশে রমজানের পূর্ণাঙ্গ দাবি পূরণ, আল্লাহর কৃত ওয়াদার সর্বোচ্চ প্রাপ্তি ও রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় তাদের সুযোগ পুরুষদের তুলনায় একটু বেশি। তাই রমজানের সঠিক পরিকল্পনা বা রুটিন করে নারীরা আমল করবেন। এ ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে বিশেষ নারীরা গুরুত্ব দিতে পারেনÑ তা নিম্নরূপ।
ইবাদতে ভারসাম্য আনা
রমজানে প্রতিটি ইবাদতেই সত্তর গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। রোজা হচ্ছে রমজানের প্রধান ইবাদত। তবে রোজার চেয়ে নামাজের গুরুত্ব অনেক বেশি। রোজা রাখার ক্ষেত্রে মহিলারা এগিয়েÑ এটা অবশ্যই খুশির কথা। অনেক মহিলা রোজা রাখে কিন্তু নামাজ পড়ে না। এটা খুবই অন্যায়। অন্য সময়ে তো নামাজ পড়বেই, রমজানে তা গুরুত্বসহকারে আদায় করবে। তা ছাড়া অন্যান্য ইবাদতের পরিমাণও বাড়িয়ে দিতে হবে। এমন যেন না হয় একটি ইবাদতই সারাদিন করলাম, অন্যান্য ইবাদত ছেড়ে দিলাম। বরং কিছু সময় নামাজ পড়া, কিছু সময় তাসবিহ তাহলিল পড়া, কিছু সময় কোরআন তেলাওয়াত করা, কিছু সময় বিভিন্ন মাসআলার বই পড়া। এভাবে সব ইবাদতের মধ্যে ভারসাম্য থাকলে সবগুলো সুন্দরভাবে আদায় হবে।
বাক সংযম
অধিক বাকপ্রবণ বলে মহিলাদের পরিচিতি আছে। পরচর্চা, কুৎসা, নিরর্থক বিষয় নিয়ে মাতামাতি ইত্যাদি পরিহার করা। এসব রোজার জন্য খুবই ক্ষতিকর। না খেয়ে উপোস থাকা যেমন রোজার অংশ তেমনি বাক সংযমও প্রয়োজন। জিহŸাকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিয়ে পেটকে শাস্তি দেওয়ায় কোনো কল্যাণ নেই। তাই রমজানে যথাসম্ভব বাক সংযম জরুরি।
পর্দা ও শালীনতা
নারীদের কখনও প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে হয়। ইসলাম তাদের পর্দা রক্ষা করে ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। রমজানে মহিলাদের বের হতে হলে এ বিধান বিশেষভাবে পালন করা জরুরি। অনেকেই রোজা রেখে খোলামেলাভাবে বাইরে ঘুরে বেড়ায়। এটা তার রোজার পবিত্রতার জন্য যেমন ক্ষতিকর তেমনি পরপুরুষের রোজা নষ্ট কিংবা হালকা করার জন্যও দায়ী। এ জন্য প্রয়োজনের তাগিদে বের হতে হলে শালীনভাবে বের হওয়া উচিত।
দান-সদকায় মনোযাগী হওয়া
অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় রমজানে দান-সদকার ফজিলত বেশি। এ মাসে নফল ইবাদতের দ্বারা সওয়াব অর্জনের ক্ষেত্রে দান-সদকার গুরুত্ব অনেক। এ কাজটি নারীদের দ্বারাই ভালোভাবে করা সম্ভব। সাংসারিক বিষয়াদি তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে তাদের বেশ সুযোগ রয়েছে। তাই রমজানে প্রত্যেক মহিলা গরিব-দুঃখীদের প্রতি সহানুভ‚তি প্রদর্শন করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে আল্লাহর কৃপা কুড়াতে পারেন।
অহেতুক কাজ বর্জন
নিরর্থক কাজ থেকে বেঁচে থাকার কথা বলা হয়েছে হাদিসে। রোজা রেখে অনেকের দিন কাটতে চায় না। এই অজুহাতে বিভিন্ন আজেবাজে কাজে সময় ব্যয় করে। কিন্তু এটা সমীচীন নয়। কেননা রোজাদারের সারাদিন ইবাদতের শামিল। বাহ্যিক কোনো ইবাদত না করলেও তার ধ্যান-ধারণা থাকবে ইবাদতের প্রতি। যথাযথভাবে রোজা আদায় ও এর পবিত্রতা রক্ষায় থাকবে সার্বক্ষণিক প্রয়াস। সময় কাটানোর কথা বলে গল্প-গুজব করে কিংবা অহেতুক কাজে যেন মূল্যবান সময় ব্যয় না হয়।
সন্তান ও অধীনস্থদের খোঁজ নেওয়া
অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে খুবই ধার্মিক। কিন্তু তার পরিবারের অন্যরা, বিশেষত সন্তানেরা ধর্ম-কর্মের ধার ধারে না। নিজে রোজা রাখে, কিন্তু সন্তানরা রোজা রাখে না। পিতামাতা এর দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। সন্তান-সন্ততি ও অধীনস্থদের রোজা রাখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা এবং এর ব্যবস্থা করে দেওয়া পিতামাতার দায়িত্ব। এ দায়িত্ব আঞ্জাম না দিলে জবাবদিহি করতে হবে। অনেক মা পড়ালেখা বা পরীক্ষার অজুহাতে কিংবা অতিদরদের কারণে সন্তানকে রোজা রাখতে নিষেধ করে। এটা মারাত্মক গুনাহ। এর ফলে সন্তানও জাহান্নামের পথে অগ্রসর হবে, মাতাপিতাও অগ্রসর হবে।
কোরআন তেলাওয়াত
রমজান হচ্ছে কোরআন নাজিলের মাস। এ মাসের সঙ্গে রয়েছে কোরআনের নিবিড় সম্পর্ক। নফল ইবাদতের মধ্যে কোরআন তেলাওয়াতের স্থান সর্ব শীর্ষে। রমজানে কোরআন তেলাওয়াতের সওয়াব আরও বেশি। যারা কোরআন পড়তে পারে না তারা এ মাসে কোরআন তেলাওয়াত শিখে নিতে পারেন। মহিলাদের কোরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে রমজানকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠে। প্রত্যেক মহিলার জন্য এ সুযোগ কাজে লাগানো চাই।
ঘরে তালিম চালু করা
ঘরোয়া পরিবেশে একত্রিত হয়ে দীনি জ্ঞান হাসিলের জন্য রমজান মাস হচ্ছে উপযুক্ত সময়। এ মাসে সাংসারিক ঝামেলা কিছুটা কম থাকায় ইচ্ছা করলে ঘরের সবাইকে নিয়ে তালিমের ব্যবস্থা করা যায়। প্রতিবেশী মহিলাদের নিয়ে একটি মজলিস করে সবাই দীনের প্রয়োজনীয় বিষয়াবলী শিখতে পারে। এ ক্ষেত্রে বেহেশতি জেওর, আহকামুন নিসা, ফাজায়েলে আমাল ইত্যাদি কিতাবের সহায়তা নেওয়া যায়।
ইতেকাফ করা
ইতেকাফ রমজান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল। মহিলারাও ইচ্ছে করলে ইতেকাফ করতে পারে। মহিলারা একটি রুমে বা রুমের এক পাশে পর্দা টেনে সেখানে ইতেকাফ করবে। অজু ইস্তেঞ্জার প্রয়োজন ছাড়া এই রুম থেকে বের হবে না। অন্য কেউ এখানে খাবার দিয়ে যাবে। বা অন্যরাও এখানে এসে খেতে পারবে। কিন্তু যিনি এতেকাফে আছেন তিনি বের হবেন না। সম্ভব হলে পুরো রমজান মাস এতেকাফ করবে। না হয় শেষ দশকে করবে।
অপচয় রোধ করা
রমজানে যত খুশি খরচ কর; তাতে কোনো বাধা নেইÑ এ ধরনের একটি কথা আমাদের সমাজে প্রচলিত। এর ওপর ভিত্তি করে রমজানে খরচের মাত্রা অপচয়ের গÐি পেরিয়ে যায়। কিন্তু এটা ঠিক নয়। রমজানও অন্যান্য মাসের মতোই। এ মাসেও হিসেবে করে চলা উচিত। ইফতার ও সাহরিকে কেন্দ্র করে যে অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা হয়ে থাকে তা রোধ করার ক্ষেত্রে নারীদের যতœশীল হতে হবে।

লেখক : শিক্ষক, জামিয়া আম্বরশাহ আল ইসলামিয়া কারওয়ান বাজার, ঢাকা