লাল পাহাড়ের দেশে যা…

0
210

অভিলাষ মাহমুদ, নিউজ চিটাগাং২৪

আমি খুবই ভ্রমণ পিয়াসী ।   ভ্রমণের কথা ওঠলেই রাঙ্গামাটি ভ্রমণের কথা মনে পড়ে যাই ।  আর তার সাথে মনে পড়ে যাই এই গানটির কথা ।  গান বাজছে আর আমার মন ময়ূরী নাচছে ।

লাল পাহাড়ের দেশে যা
রাঙ্গামটির দেশে যা
ইত্থাক তুকে মানাইছে না রে
ইক্কেবারে মানাইছে না রে ।

তখন ছিলো আমার যতেষ্ট অবসর সময় ।   আর তাই ভ্রমণে যাওয়ার কথা ভাবলাম ।  যেই ভাবা সেই কাজ রাঙ্গামাটি যাওয়ার পরিকল্পনা করে নিলাম ।  অবশ্যই আমার কিছু প্রিয় জায়গা আছে যা দেখতে আমি ভুল করি নি।  কোন দর্শনীয় বা ঐতিহাসিক স্থানে ঘুরতে গিয়ে যদি আপনার কোন কিছুই ভাল না লাগতেও পারে ।    এর কারণ কি জানেন? আপনি সে জায়গাটির ইতিহাস এবং গুরুত্ব সম্পর্কে অবিহিত না।  তবে দেখবেন জায়গাটি ঘুরে আসার পর যখন কোথাও সে জায়গা সম্পর্কে কোন ডকুমেন্টারি অথবা কারও কাছে গল্প শুনছেন তখন ঐ ঘুরে আসা দর্শনীয় বা ঐতিহাসিক জায়গাটিকে মিস করছেন।
এসব ভাবছি আর আমার গন্তব্য রাঙ্গামাটি ঠিক করে নিলাম ।  তার আগেই কিছু ধারণা নিয়েছিলাম সেখানকার বিখ্যাত স্থানগুলো সম্পর্কে।

 

রাঙামাটি শহর ও আশপাশের স্পট
রাঙামাটিতে ঝুলন্ত সেতু, রাজবাড়ি, জেলা প্রশাসকের বাংলো, সুবলং ঝরণা, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আবদুর রউফের স্মৃতিসৌধ, পেদা টিং টিং, ইকো টুক টুক ভিলেজসহ দেখার মতো অনেক কিছু রয়েছে। এগুলো দেখবো বলে সারাদিনের জন্য বোট ভাড়া নিয়েছিলাম।

পর্যটন মোটেল ও ঝুলন্ত সেতু

ওখানকার জায়গা জায়গাগুলো ভালোবাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাতে পারবে এমন একজন আগ্রহী তরুণকে সঙ্গে নিলাম । সে প্রথমে নিয়ে গেলো
পর্যটন ব্রিজ শহরের শেষপ্রান্তে কর্ণফুলী হ্রদের কোল ঘেঁষে ‘পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স’।  সে জানালো ১৯৮৬ সালে এটি গড়ে তোলা হয়।  আকর্ষণীয় পর্যটন মোটেলটি এখানেই।  এ এলাকাটি ‘ডিয়ার পার্ক’ নামেই পরিচিত।  মোটেল এলাকা থেকে দৃশ্যমান হ্রদের বিস্তীর্ণ জলরাশি আর দূরের নীল উঁচু-নীচু পাহাড়ের সারি বিমোহিত করবে যে কাউকেই।  এখানেই হ্রদের ওপর ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু। যা কমপ্লেক্সের গুরুত্ব ও আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।  এ সেতুকে বলা হয় ‘সিম্বল অব রাঙামাটি’।  দুটি পাহাড়ের মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে কাপ্তাই হ্রদের উপর ঝুলে আছে সেতুটি।  এটি দেখতে পর্যটন করপোরেশনকে দিতে হয়েছিলো পাঁচ টাকা।  এছাড়াও এখানে আছে সময় কাটানোর অনেক উপকরণ।   আছে অডিটোরিয়াম, পার্ক, পিকনিক স্পট, স্পিড বোট ও দেশীয় নৌ-যান।  রাঙামাটি শহরের তবলছড়ি হয়ে সড়ক পথে সরাসরি ‘পর্যটন কমপ্লেক্সে’ ঘুরে দেখেছিলাম।  এখানে গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা রয়েছে।  যারা ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে সার্ভিস বাসে করে আসবেন তাদের তবলছড়িতে নেমে অটোরিক্সা রিজার্ভ ভাড়া করে আসতে হবে।

রাজ বনবিহার
রাঙামাটির দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাজ বনবিহার।  এ অঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর প্রধান তীর্থ স্থান এটি।  এখানে আছে একটি প্রার্থনালয়, একটি প্যাগোডা, বনভান্তের (বৌদ্ধ ভিক্ষু) আবাসস্থল ও বনভান্তের ভোজনালয়।  প্রতি শুক্রবার ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে এখানে চলে প্রার্থনা।  রাজ বনবিহারে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে পারেন কাপ্তাই লেকের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য।  রাজবনবিহারের পাশেই কাপ্তাই লেকের ছোট্ট একটি দ্বীপজুড়ে রয়েছে চাকমা রাজার রাজবাড়ি।
পরে রওনা দিলাম জেলা প্রশাসকের বাংলো ।

কীভাবে যাওয়া যায়:

রাঙ্গামাটি শহরের যে কোন স্থান হতে অটোরিক্সা যোগে যাওয়া যায়।  ভাড়ার পরিমাণ ১০০-১৫০/- টাকা।  তবে বাংলো এলাকায় প্রবেশের জন্য অনুমতি আবশ্যক।সে ক্ষেত্রে আমার কোন বাধা ছিলো না ।  সহজেই পেয়ে গেলাম অনুমতি ।

রাঙ্গামাটি শহরের জিরো পয়েন্টে কর্ণফুলী হ্রদের গা ঘেঁষে জেলা প্রশাসকের ঐতিহ্যবাহী বাংলো অবস্থিত।  শুধু সংযোগ সড়ক ছাড়া বাংলোর তিনদিকেই ঘিরে রেখেছে হ্রদের বিস্তীর্ণ জলরাশি।  জেলা সদর দপ্তর চন্দ্রঘোনা থেকে রাঙ্গামাটিতে স্থানান্তরের পর এটি ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করা হয়। সম্প্রতি ব্যাপক আঙ্গিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের ফলে বাংলো এলাকাটি আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।  বাংলোর পাশে ছোট টিলার উপরে রয়েছে একটি বাতিঘর ও কোচপানা নামক ছাউনী – যা একটি সুদৃশ্য সেতু দ্বারা বাংলোর সাথে সংযুক্ত।  সেতু এবং ছাউনী থেকে পর্যটক ও দর্শনার্থীগণ অকাতরে হ্রদের রূপ-সুধা অবগাহণ করতে পারে।
অবস্থান:
রাঙ্গামাটি সদর
জেলা প্রশাসকের বাংলো

সুবলং ঝরণা
রাঙামাটি সদর হতে সুবলং এর দূরত্ব মাত্র ২৫ কিলোমিটার। রাঙামাটির রিজার্ভ বাজার, পর্যটন ঘাট ও রাঙামাটি বিভিন্ন স্থান থেকে স্পিড বোট ও নৌ-যানে করে সহজেই সুবলং যাওয়া যায়। কাপ্তাই লেক ঘুরতে হ্রদে দেশীয় ইঞ্জিন চালিত বোট অথবা স্পীড বোটে চড়ে বেরুলে প্রথমেই চোখ যাবে পাহাড়ের কোল থেকে নেমে আসা সুভলং ঝর্ণার দিকে। বোটে করে সুভলং যাওয়ার আনন্দটাই অন্যরকম। বর্তমানে ঝর্ণায় পানি খুব বেশি নেই তবে ভরা বর্ষা মৌসুমে মূল ঝর্ণার জলধারা প্রায় ৩০০ ফুট উচু থেকে নীচে আছড়ে পড়ে এবং অপূর্ব সুরের মুর্ছনায় পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বর্তমানে এ এলাকায় উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক কিছু স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এরপরও ঝর্ণার সৌন্দর্য পর্যটকদের মন ভরিয়ে দিতে যথেষ্ট। পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসা ঝর্ণার পানি পাথুরে মাটিতে আছড়ে পড়ার অপূর্ব দৃশ্য না দেখলে বলে বোঝানোর নয়। ইচ্ছে করলে স্নান করতে পারেন ঝরনার শীতল পানিতে। ক্যামেরা থাকলে ঝটপট তুলে নিতে পারেন দুর্লভ কিছু ছবিও। ঝর্ণা দেখা শেষ হলে কিছুক্ষণের জন্য সুভলং বাজার ঘুরে আসতে পারেন। এখানে সেনাবাহিনীর একটি ক্যান্টিন রয়েছে। চাইলে সেখানে সেরে নিতে পারেন চা-নাস্তা পর্ব।
অটোরিক্মা কিংবা প্রাইভেট গাড়িযোগে কে.কে.রায় সড়ক হয়ে হ্রদের এই পাশে যেতে হবে। অতঃপর নৌকাযোগে হ্রদ পার হয়ে রাজবাড়িতে যাওয়া যাবে। কাপ্তাই হ্রদের মাধ্যমে নৌপথেও এ স্থানে আসা যায়।

আবারও এর মধ্যে আমার কানে বাজছে সেই গানের সুর ।  আর চোখে ভেসে ওঠছে সেই লাল পাহাড়ের ছবি ।

লাল পাহাড়ি দেশে যাবি
হাঁড়ি আর মাদল পাবি
মেয়ে মরদের আদর পাবি রে
ও নাগর… ও নাগর…
ইক্কেবারে মানাইছে না রে

লাল পাহাড়ি দেশে যা
রাঙ্গামটির দেশে যা
ইত্থাক তুকে মানাইছে না রে
ইক্কেবারে মানাইছে না রে

নদীর ধারে শিমুলের ফুল
নানা পাখির বাসা রে নানা পাখির বাসা
সকালে ফুটিবে ফুল মনে ছিল আশা রে
এমন ছিল আশা ।
কিন্তু এইখানেই আশাহত হয়েছিলাম কিছুটা ।  তবে পিছু না হটে তা কাটিয়ে ওঠার জন্য আরো এগিয়ে গেলাম ।  আর গানটার কথা স্মরণ করছিলাম ।

তুই ভালোবেসে গেলি চলে
কেমন বাপের ব্যাটা রে তুই কেমন ব্যাটা?
লাল পাহাড়ি দেশে যা
রাঙ্গামটির দেশে যা
ইত্থাক তুকে মানাইছে না রে
ইক্কেবারে মানাইছে না রে

ভাদর মাসে ভাদু পূজা ভাদু গানের ঘটা
ঐ কালো মেয়েটার মন মজেছে
গলায় দিব মালা রে
তার গলায় দিব মালা

তুই মরবি তো মরে যা
ইকেবারে মরে যা মরবি তো মরে যা
ইকেবারে মরে যা
ইত্থাক তুকে মানাইছে না রে
ও নাগর… ও নাগর…
ইক্কেবারে মানাইছে না রে ।
সাজেক উপত্যকা
এমনিতে বাংলাদেশের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে পর্যটকদের আকর্ষণ একটু বেশি। আর সে আকর্ষণকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে ‘সাজেক’ উপত্যকা। আয়তনের দিক দিয়ে দেশের বৃহত্তম ইউনিয়ন পাহাড়িয়া ‘সাজেক’। বর্তমানে চাইলে যেকেউ নিজস্ব পরিবহনে অথবা ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে বাঘাইছড়ি হয়ে ভারত সীমান্তবর্তী অন্যতম সৌন্দর্য্যমন্ডিত এই উপত্যকায় যেতে পারেন। এখানে আঁকা-বাকাঁ উচুঁ নিচু পাহাড়ি পথ ও আকাশের সাথে মেঘের লুকোচুরি খেলা দেখার পাশাপাশি অতি নিকটতম সীমান্ত ভারতীয় অংশের পাহাড়ি দৃশ্য উপভোগ করার মতো।

অবশেষে রাঙ্গামাটির সূর্য আস্ত দেখতে লাগলাম মগ্ন হয়ে ….