শবেবরাত অস্বীকার করা ঠিক নয়

mirza imtiaz প্রকাশ:| শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল , ২০১৯ সময় ১২:৩৪ অপরাহ্ণ

মরক্কোর ক্যাসাব্লাঙ্কায় অবস্থিত ‘দ্বিতীয় হাসান মসজিদ’ হচ্ছে বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার বিশিষ্ট মসজিদ। এটি একই সঙ্গে বিশ্বের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু। এই মসজিদের একমাত্র মিনারটির উচ্চতা ২১০ মিটার, যা প্রায় ৬০ তলা ভবনের সমান! ১৯৯৩ সালে নির্মিত এ মসজিদটির মুসল্লি ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার। এর মিনারের চূড়ায় একটি লেজার বিম অবস্থিত, যা থেকে কাবাঘরের দিক বরাবর সর্বদা একগুচ্ছ আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হতে থাকে। 

মসজিদটিতে ইসলামিক এবং মরোক্কান স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণ ব্যবহার করা হয়েছে। এর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন বিখ্যাত মসজিদ এবং ইসলামিক স্থাপত্যের আদলে নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদটির ভেতর এবং বাইরে যে অসাধারণ কারুকাজ, তার প্রায় সবই হস্তশিল্প। ছয় হাজার শিল্পী এবং কারিগর পাঁচ বছর ধরে মসজিদটির দৃষ্টিনন্দন মোজাইক, পাথর এবং মার্বেলের মেঝে ও স্তম্ভ এবং খোদাইকৃত কাঠের ছাদে নকশার কাজ করেছেন।
মসজিদে ব্যবহৃত সব গ্রানাইট, মার্বেল, প্লাস্টার, কাঠসহ অধিকাংশ নির্মাণসামগ্রী মরক্কো থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে, শুধু বিশেষ কিছু গ্রানাইটের নির্মিত স্তম্ভ এবং ৫৬টি কাচের তৈরি ঝাড়বাতি বাদে, যেগুলো ইতালির ভেনিস থেকে আনা হয়েছে। মসজিদটিতে রয়েছে বিশালাকৃতির দৃষ্টিনন্দন স্তম্ভ এবং ঘোড়ার ক্ষুরাকৃতির খিলান এবং অসংখ্য খাঁজ কাটা জ্যামিতিক নকশা। ছবিতে দেখা যাচ্ছে মসজিদের কেন্দ্রীয় হলঘরের দৃশ্য

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) (মৃ. ৭২৮ হি.) বলেন, ১৫ শাবানের রাতের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক ‘মারফু’ হাদিস এবং সাহাবিদের ‘আসার’ বা উক্তি বর্ণিত হয়েছে। এগুলো দ্বারা ওই রাতের ফজিলত ও মর্যাদা প্রমাণিত হয়। সালাফে সালিহিনের কেউ কেউ এ রাতে নফল নামাজের ব্যাপারে যতœবান হতেন। আর শাবানের
রোজার ব্যাপারে তো সহিহ হাদিগুলোই রয়েছে​

আজকাল কিছু কিছু বন্ধু কারও কারও কথা শুনে কিংবা কোনো কোনো লেখা দেখে সংশয়ে পড়েন যে, আদৌ ১৫ শাবানের রাতের কোনো ফজিলত বা বিশেষত্ব আছে কি না। বাস্তব কথা হলো, শাবানের পুরো মাসটাই ফজিলতপূর্ণ এবং বরকতময়। নবীজি (সা.) এ মাসের বরকত কামনা করে দোয়া করতেন। রমজান মাসের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে এই মাসে তিনি বেশি বেশি রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবীজি (সা.) কে রমজান ছাড়া কখনও পূর্ণ কোনো মাস রোজা রাখতে আমি দেখিনি। আর শাবান মাসে তিনি যেভাবে অধিক হারে রোজা রাখতেন, বছরের অন্য কোনো মাসে এমনটা করতেন না।’ (বোখারি : ১৬৮৬, মুসলিম : ১৯৫৬)। উসামা ইবনে জায়েদ (রা.) নবীজিকে শাবান মাসে অধিক রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষ এ মাসের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। অথচ এটি এমন একটি মাস; যখন আল্লাহ তায়ালার কাছে বান্দাদের আমলনামা পেশ করা হয়। অতএব আমি চাই, আমার আমলনামা এমন অবস্থায় পেশ করা হোক; যখন আমি রোজাদার।’ (মুসনাদ আহমাদ : ২১৭৫৩)।
এভাবে নবীজি (সা.) তাঁর উম্মতকে এই মাসের একটি রাত সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তখন দোয়া কবুল হয়। মুআয ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, ‘অর্ধ শাবানের রাতে আল্লাহ সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। অতঃপর শিরককারী ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া তার সমগ্র সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে হিব্বান : ৫৬৬৫)।
সনদ বা বর্ণনাসূত্রের বিবেচনায় হাদিসটি আমলযোগ্য। অনেক হাদিস বিশারদ এ বিষয়ে স্পষ্ট মন্তব্য করে গেছেন। আজকাল আমাদের যেসব বন্ধু এ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছেন, তারা যেসব মনীষীর অনুসরণ ও অনুকরণ করে থাকেন; তাদের সেসব বরেণ্য আলেমও কিন্তু ১৫ শাবানের রাতের ফজিলত আছে বলে স্বীকার করেছেন এবং এ সংক্রান্ত হাদিস গ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। উদাহরণস্বরূপ এখানে কয়েকজনের উদ্ধৃতি পেশ করা হলো :
১. শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) (মৃ. ৭২৮ হি.) বলেন, “১৫ শাবানের রাতের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক ‘মারফু’ হাদিস এবং সাহাবিদের ‘আসার’ বা উক্তি বর্ণিত হয়েছে। এগুলো দ্বারা ওই রাতের ফজিলত ও মর্যাদা প্রমাণিত হয়। সালাফে সালিহিনের কেউ কেউ এ রাতে নফল নামাজের ব্যাপারে যতœবান হতেন। আর শাবানের রোজার ব্যাপারে তো সহিহ হাদিসগুলোই রয়েছে। কোনো কোনো আলেম যদিও এই রাতের ফজিলত অস্বীকার করেন; কিন্তু হাম্বলি ও অ-হাম্বলি অধিকাংশ আলেমই এই রাতের ফজিলতের কথা স্বীকার করে থাকেন। ইমাম আহমাদ (রহ.) এর মতও তা-ই। কেননা এর ফজিলত সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে এবং এগুলোর সমর্থনে সালাফ (সাহাবি ও তাবেয়ি) এর উক্তিও বিদ্যমান আছে; যেগুলো ‘সুনান’ ও ‘মুসনাদ’ শিরোনামে সংকলিত হাদিসের কিতাবে (বরং কতক ‘সহিহ’ শিরোনামের কিতাবেও যেমন সহিহ ইবনে খুযায়মা, সহিহ ইবনে হিব্বান প্রভৃতিতে) রয়েছে।” (দেখুন : ইকতিযাউস সিরাতিল মুসতাকিম, ২/৬৩১, মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ, এ বিষয়ে তার আরও উক্তি জানতে দেখুন : মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩/১৩১-১৩২)।
২. মুহাদ্দিস আবদুর রাহমান মুবারকপুরি (রহ.) (মৃ. ১৩৫৩ হি.) বলেন, ‘শাবানের ১৫ তারিখের রাতের ফজিলতের ব্যাপারে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে; যেগুলোর সমষ্টি থেকে বোঝা যায় যে, এর একটা ভিত্তি রয়েছে।’ তিনি এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করে বলেন, ‘যারা এ রাতের ফজিলত ভিত্তিহীন বলে মনে করেন তাদের বিরুদ্ধে এসব হাদিস অকাট্য দলিল।’ (দেখুন : তুহফাতুল আহওয়াজি শারহু সুনানিত তিরমিজি, ৩/৪৪১-৪৪২, দারুল ফিকর, বয়রুত, ১৩৯৯ হি.)।
৩. বর্তমান সময়ের সালাফি বন্ধুদের নন্দিত মুহাদ্দিস, মরহুম শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানি (মৃ. ১৪২০ হি.) ১৫ শাবানের রাতের ফজিলতবিষয়ক একটি হাদিস সম্পর্কে ‘সহিহ হাদিস’ বলে মন্তব্য করেছেন। (দেখুন : সিলসিলাতুল আহাদিসিস সাহিহা, ৩/১৩৫, হাদিস : ১১৪৪, শাবাকা)।
১৫ শাবান রোজা রাখার বিষয়েও কোনো কোনো বর্ণনায় উৎসাহিত করা হয়েছে। যদিও এসব বর্ণনার সনদ নিয়ে হাদিস বিশেষজ্ঞদের কিছু কথা আছে, তথাপি ওইদিন সাধারণ নিয়ম ও নিয়তে কেউ রোজা রাখলে অসুবিধার কিছু নেই। অন্যদিকে এ বিষয়ক হাদিসগুলো মওজু বা একেবারে ভিত্তিহীন এমন তো নয়! আর পূর্বোক্ত হাদিসগুলোর ভাষ্যমতে নবীজি তো শাবানের শেষ কিছুদিন ব্যতীত বাকি সবদিনই রোজা নিজে রাখতেন এবং অন্যকে রাখতে অনুপ্রাণিত করেছেন।
বস্তুত প্রতি ইসলামি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখার বিশেষ সওয়াবের কথা একাধিক সহিহ হাদিসে বিধৃত হয়েছে; যেগুলোকে ‘আইয়ামে বিজে’র রোজা বলা হয়। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘প্রিয় নবী (সা.) আমাকে তিনটি জিনিসের অসিয়ত করে গেছেন। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, প্রতি মাসের এই তিনটি রোজা রাখা।’ (বোখারি : ১১২৪, মুসলিম : ১১৮২)।
এ রাতে আমাদের করণীয়
এ রাতে আমাদের কী করণীয় উচিত আল্লামা ইবনে রজব (রহ.) (মৃ. ৭৯৫ হি.) এর ভাষায় : ‘মোমিনের কর্তব্য এই যে, এ রাতে খালিস দিলে তওবা করে জিকির, দোয়া ও ইস্তেগফারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। যতেœর সঙ্গে নফল নামাজ পড়বে। কেননা কখন মৃত্যু আসে যায় বলা যায় না। তাই কল্যাণের মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই তার মূল্যায়ন করা জরুরি। আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে সওয়াব লাভের আশা নিয়ে ১৫ তারিখের রোজাও রাখবে। তবে অত্যন্ত জরুরি বিষয় হলো, ওইসব গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা, যেগুলো এ রাতের সাধারণ ক্ষমা ও দোয়া কবুল হওয়া থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে দেয়। যথা : শিরক, হত্যা, হিংসা-বিদ্বেষ। এ সবগুলোই কবিরা গোনাহ। আর হিংসা-বিদ্বেষ তো এতই গর্হিত বিষয় যে, এটা অধিকাংশ সময়ই মানুষকে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যে কোনো মুসলমান সম্পর্কেই বিদ্বেষ পোষণ করা অত্যন্ত মন্দ প্রবণতা। তবে সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালিহিন সম্পর্কে অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষ বিদ্যমান থাকা অত্যন্ত ভয়াবহ ও গর্হিত অপরাধ। এ জন্য মুসলমানদের কর্তব্য হলো, সর্বদা অন্তরকে পরিষ্কার রাখা এবং হিংসা-বিদ্বেষ থেকে পাক-পবিত্র রাখা। বিশেষত উম্মাহর পূর্বসূরি ব্যক্তিদের সম্পর্কে অন্তর পুরোপুরি পরিষ্কার থাকা অপরিহার্য, যাতে রহমত ও মাগফিরাতের সাধারণ সময়গুলোতে বঞ্চিত না হতে হয়।’ (লাতাইফুল মাআরিফ, পৃ. ২৬৫-২৬৬, দারু ইবনি কাসির, বয়রুত, ৫ম সংস্করণ ১৪২০ হি./১৯৯৯ ঈ.)।

লেখক : লন্ডনপ্রবাসী বিজ্ঞ আলেম ও ইসলাম প্রচারক