শুভ জন্মদিন মাশরাফি বিন মর্তুজা

0
63

বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়ার কারিগর মহানায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার ৩৭তম জন্মদিন আজ।

কাকতালীয়ভাবে একই দিন মাশরাফির সঙ্গে তার ছেলে সাহেলেরও জন্মদিন।

১৯৮৩ সালের আজকের ৫ অক্টোবর নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ে মহিষখোলা গ্রামে জন্মেছিলেন এই কিংবদন্তী ক্রিকেটার মাশরাফি। তিনি নড়াইলে কৌশিক নামেই সমধিক পরিচিত।

ছোটবেলা থেকেই দুরন্ত টাইগার সেনাপতি মাশরাফি। শৈশব কেটেছে চিত্রা নদীর পাড়ে।

ছোটবেলায় বন্ধুদের সর্দার (দলনেতা) ছিল কৌশিক। তার সঙ্গে চিত্রা নদীর এক ধরণের মিতালী ছিল। এই নদী তাকে খুব টানত। সময় পেলেই ঢাকা থেকে নড়াইল ছুটতেন মাশরাফি।

চিত্রা নদী তোলপাড় করায় সম্ভবত নড়াইলের কিশোরকুলের সর্বকালের সেরা ছিল এই কৌশিক।

‘মাশরাফি’ নামক বইয়ে তার মামা নাহিদুর রহমান বলেছিলেন, ‘ছেলেটা তার বাবার মতো খেলোয়াড় হতে পারে। তবে ফুটবল-ক্রিকেট নয়; ছেলেটা হবে হয়তো সাঁতারু।’

চিত্রা নদীই ছিল কৌশিকের ঘর, চিত্রাই তার বাড়ি। নদীতে সাঁতার কেটে তার আনন্দ যেন অন্য কিছুতে হতো না। নদী যেন তার পোষ মানা কেউ।

একই রকম দখল বৃক্ষরাজির ওপর। আম-জাম-লিচু-নারকেল সব গাছেই তার শাখামৃগের আদলে বিচরণ। সেই দুরন্ত কিশোরটিই আজকের মাশরাফি। যিনি নির্বাচন নামক আরেকটি নদী পাড়ি দিয়েও সফল হয়েছেন।

গত বছর ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় দলের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা।

ক্রিকেটের ২২ গজে তুখোড় অধিনায়ক রাজনীতির ময়দানে নবীন হলেও সমান জনপ্রিয়।

মাশরাফির পিতা গোলাম মর্তুজা ও মাতা হামিদা মুর্তজা। ডাকনাম স্বপন ও বলাকা।

১৯৮৩ সালের ৫ অক্টোবর রাত ৮টায় নানাবাড়িতে জন্ম হয় মাশরাফির। মাতামহ ডাকনাম রাখলেন কৌশিক। নানির কাছেই শিশু কৌশিক লালিত হতে থাকে। সেই থেকে আজও কৌশিককে নানাবাড়িতেই আটকে রেখেছে।

এখনও মামা বাড়ির প্রতি ঝোঁক কাটেনি তার। মা বলাকা নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া ছেলেকে কাছে পান না। নানী-মামাদের কোলে-পিঠে চড়েই বড় হয়েছেন কৌশিক।

মাশরাফির বাবা স্বপন ছিলেন ফুটবলার ও অ্যাথলেট। যদিও তিনি চাইতেন না ছেলে ক্রিকেট খেলুক। তবে মাশরাফির মা স্কুলশিক্ষিকা হামিদা মর্তুজা চাইতেন মাশরাফির সব ইচ্ছা পূরণ করতে। তিনিই ক্রিকেট খেলার সামগ্রী কেনার টাকা দিতেন মাশরাফিকে।

মাশরাফির শিক্ষাজীবন শুরু হয় নড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০১ সালে এসএসসি পাস করেন। এইচএসসি পাস করেন নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ২০০৩ সালে। এরপর দর্শন শাস্ত্রে অনার্স কোর্সে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ক্রীড়াঙ্গনে তিনি ‘নড়াইল এক্সেপ্রেস’ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের এ যাবৎকালের সেরা পেসার।

নব্বইয়ের দশকে নড়াইলের ক্রিকেটার-সংগঠক শরীফ মোহাম্মদ হোসেন উঠতি তরুণদের যত্ন নিতেন। তিনি ১৯৯১ সালের দিকে মাগুরায় বিকেএসপির প্রতিভা অন্বেষণ ক্যাম্পের বিকেএসপি কোচ বাপ্পির সান্নিধ্যে এসে বোলিংয়ের অনেক মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হন।

পরের বছর জাতীয় কোচ ওসমান খান নড়াইলে এক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালাচ্ছিলেন। ওই সময় কৌশিকের আমন্ত্রণ আসে খুলনায় খেলার জন্য।

খুলনায় তার গতি ও সুইং হইচই ফেলে দেয়। সেই সূত্রে খুলনা বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৭ দলে সুযোগ, ঢাকায় আসা এবং আর পেছনে ফিরে না তাকানো। এভাবেই একদিন সুযোগ পেয়ে গেলেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলে।

সেখান থেকেই তিনি চোখে পড়েন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলিং কোচ অ্যান্ডি রবার্টসের। তার হাতে পড়েই ক্যারিয়ার বদলে যায় মাশরাফির। যে কারণে তিনিই একমাত্র ক্রিকেটার যিনি প্রথম শ্রেণির কোনো ম্যাচ না খেলেই টেস্টে অভিষিক্ত হন।

২০০১ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেকেই নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। একই বছর ২৩ নভেম্বর ওয়ানডে ক্রিকেটে মাশরাফির অভিষেক হয়।

অভিষেক ম্যাচে মোহাম্মদ শরীফের সঙ্গে বোলিং ওপেন করে তিনি ৮.২ ওভারে ২৬ রান দিয়ে নেন ২টি উইকেট। সেই থেকে যে শুরু পথচলা।

তবে ইনজুরি তার টেস্ট ক্যারিয়ার দীর্ঘ হতে দেয়নি। মাত্র ৩৬ টেস্ট খেলে নিয়েছেন অবসর। এরই মাঝে নিয়েছেন ৭৮টি উইকেট। একই সঙ্গে তিনটি হাফ সেঞ্চুরিসহ রান করেছেন ৭৯৭।

টি-টুয়েন্টিতে থেকে সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন তিনি। ক্রিকেটের এ ফরম্যাটে ৫৪ ম্যাচ খেলে নিয়েছেন ৪২টি উইকেট। সেই সঙ্গে ব্যাট হাতে করেছেন ৩৭৭ রান।

১৮ বছর যাবৎ দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছেন। দুই পায়ে সাতটি অস্ত্রোপচার। তবে এসব ইনজুরির দোহাই দিয়ে দলে টিকে নেই তিনি। বল হাতে, অধিনায়ক হিসেবে পারফর্ম করছেন বলেই টিকে আছেন।

চোটের সঙ্গে বসবাসের এই ক্যারিয়ারে ২০০১-২০১১ পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে ১১৮ ম্যাচ খেলেছেন তিনি। এ সময় দেশের হয়ে মিস করেছেন ৭৮ ম্যাচ।

মাশরাফির পায়ে সর্বশেষ বড় অস্ত্রোপচার হয়েছিল ২০১১ সালে। তারপর থেকে এখন অব্দি দেশের হয়ে ৯৪টি ম্যাচ খেলেছেন নড়াইল এক্সপ্রেস, মিস করেছেন ৩৩টি ম্যাচ। ফিটনেসের দিক থেকে বড়সড় উন্নতির প্রমাণ তার এই ধারাবাহিক অংশগ্রহণ।

২০১৪ সালে আবার ওয়ানডে দলে নেতৃত্বে ফেরার পর থেকে তার পারফরম্যান্সে চোখ রাখলে সমালোচকরা লজ্জাও পেতে পারেন। টানা ব্যর্থতায় ভঙ্গুর একটা দলের ভার মাশরাফির কাঁধে তুলে দিয়েছিল বিসিবি।

২০১৪ সালের শেষ দিকে, নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে সিরিজ দিয়ে তার নতুন যাত্রা। সেই থেকে ওয়ানডে দলের নেতৃত্বে এখনও আছেন তিনি। নেতৃত্বের পাশাপাশি বোলার মাশরাফিও সমানভাবে উজ্জ্বল এই সময়ে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সেরা বোলার মাশরাফি। ৭৩ ম্যাচে তিনি নিয়েছেন ৯২ উইকেট। সবমিলিয়ে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী (২৬৬) মাশরাফি।

চলতি বছরে বিশ্বকাপে ডানহাতি এই পেসারের প্লান পারফরম্যান্স ১৮ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার, দেশের জার্সিতে তার অর্জন, অধিনায়কের ভূমিকায় দেশের ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান,নিবেদন সবই বাংলাদেশের ক্রিকেটের মহানায়কের খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছে মুহূর্তের সমালোচনার তোড়ে।

৩৭ বছরের মাশরাফি আর কত দিবে দেশের ক্রিকেটকে। মাশরাফির বিদায়টা অত্যাসন্ন বলতেই হচ্ছে।

সাতটি অস্ত্রোপচারের পরও দেশের জন্য অদম্য সাহসিকতায় ছুটে বেড়ানো এই কিংবদন্তির শেষটা সম্মানের সঙ্গে বিদায়ের কথা শোনা যাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের মহানায়কের বিদায় ধ্বনি বাজছে। দেশজুড়ে তারুণ্যেও প্রেরণার উৎস মাশরাফির অবসর এখন দৃষ্টিসীমায়।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অধিনায়ক হিসেবে, একজন আদর্শ দলনেতা হিসেবে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন ভক্তদের হৃদয়ে।

তার নেতৃত্বে মুগ্ধ হয়ে সাবেক অস্ট্রেলিয়ান দলের ওপেনার ও বর্তমানে ধারাভাষ্যকর ম্যাথু হেইডেন বলেছিলেন, ‘অধিনায়ক তো অনেকেই হতে পারে কিন্তু মাশরাফির মত ‘দলের মা’ কয়জন হতে পারে!’