শোকে মাতমের দিন

0
45

আজ বেদনার দিন/আজ পিতা হারানোর শোকে মাতমের দিন/আজ ইতিহাসের জন্মদাতা বাঙালির মুক্তিদাতাকে হত্যার ঘৃণ্যতম দিন/আজ ৩২ নম্বরে, টুঙ্গিপাড়ায় আবেগমথিত শ্রদ্ধা জানানোর দিন/ইতিহাসের রাখাল রাজাকে বিনম্র স্মরণের পাশাপাশি আজ হত্যাকারীদের শাপান্ত করার দিন/আজ জাতি জেগে উঠবে নতুন শপথে চির জাগরূক চেতনার উদগীরণে/আজ জাতি আবারও সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত হবে বঙ্গবন্ধুর অমর আদর্শকে সঙ্গী করে।’ আজ রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট। রক্তঝরা আর অশ্রম্নভেজা ১৯৭৫ সালের এই দিনে বাঙালি জাতি হারিয়েছিল তাদের চিরকালীন আস্থার মানুষটিকে। তাদের চিরচেনা প্রিয়জনকে। ‘৭৫-এর এই দিনে ভোরের আলো মাত্র ফুটবে। কিন্তু তার আগেই বাংলাদেশের চিরন্তন আলো নিভিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রকারী নরঘাতকরা স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। ১৫ আগস্ট সুবেহ সাদেকের সময় পবিত্র আজানের ধ্বনিকে বিদীর্ণ করে ঘাতকের মেশিনগানের ঝাঁক ঝাঁক গুলি। ঝাঁঝরা হয়ে ওঠে স্বাধীন বাংলার বুক। দেশের কিছু বিপথগামী সেনাসদস্য ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরে ইতিহাস স্রষ্টার বুকেই শুধু গুলি চালায়নি, একইসঙ্গে তার ছায়াসঙ্গী নিরীহ-নিরপরাধ নারী, শিশু, অন্তঃসত্ত্বাকেও হত্যা করে। বাংলার রাজনীতির চিরকালীন জ্যোতিষ্ক, বাঙালির বটবৃক্ষ বঙ্গবন্ধু, যে মানুষকে ভালোবেসে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করলেন, সে মানুষের ভেতরে থাকা হায়েনার দল তার সে প্রেম ও ত্যাগকে অবজ্ঞা করে নির্মম হত্যাকান্ডের মাধ্যমে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে সেদিন ছিল একটি কালো দিবস। বাংলাদেশের মানচিত্রসম মানুষটির রক্তে সেদিন ভিজে গিয়েছিল পুরো বাংলাদেশ। আজ জাতীয় শোক দিবস। সরকারি ছুটির দিন। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ভবনসহ বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। সঙ্গে শোকচিহ্ন বহন করবে কালো পতাকা। যথাযোগ্য মর্যাদায় ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কমর্সূচি পালন করবে। এদিকে দিবসটি ঘিরে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৫ আগস্টের এই নারকীয় হত্যাকান্ডে প্রকাশ্যে বিপথগামী কিছু সেনাসদস্যকে বঙ্গবন্ধু, তার পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের বুকে গুলি চালাতে দেখা গেলেও নেপথ্যে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক চক্র, সামরিক-বেসামরিক আমলাচক্র ও স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত শক্তির ইন্ধন, পরিকল্পনা ও নির্দেশনার কথা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, বাংলার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পাশাপাশি হায়েনার দল সেদিন নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল তার সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেলকে। একই সঙ্গে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, ছোটভাই শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাতসহ বেড়াতে আসা কয়েকজন নিকটাত্মীয়কে। বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে গিয়ে ঘাতকদের হাতে প্রাণ হারান তার সামরিক সচিব জামিলউদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারী। দেশের বাইরে থাকায় সেদিন বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে বতর্মান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর স্বাধীনতাবিরোধী চক্র রাষ্ট্রক্ষমতায় পুনর্বাসিত হতে থাকে। যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে বীর বাঙালি ন্যায়ের পক্ষে অস্ত্র ধরেছিল, সেই বাঙালিকে হায়েনার দল অস্ত্রের মুখে অন্যায় মেনে নিতে বাধ্য করে। ঘাতকচক্র ও তাদের দোসররা বাংলাদেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে দিয়ে দেশকে আবারও পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। খুনিচক্রের অন্যতম প্রধান জাতীয় বেঈমান মীরজাফরসম খন্দকার মোশতাক ও তার সরকারে থাকা সঙ্গীরা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ঠেকাতে ও খুনিদের রক্ষা করতে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করে। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটিকে আইন হিসেবে অনুমোদন করেন। শুধু তাই নয়, তৎকালীন জিয়া সরকার খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেয়। পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার সরকার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রম্নয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে খুনি কর্নেল রশীদকে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বানায়। হত্যাকান্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিলের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত হয়। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর বিচারকাজ শুরু হয়। প্রায় ৩৫ বছর পর ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি রাষ্ট্রপিতা হত্যার কলঙ্ক থেকে জাতির মুক্তি ঘটে। বঙ্গবন্ধু হত্যার চূড়ান্ত বিচারের রায় অনুযায়ী ওই দিন মধ্যরাতের পর বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি বরখাস্তকৃত লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, লে. কর্নেল (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার) এবং লে. কর্নেল (অব.) মুহিউদ্দিন আহমেদকে (আর্টিলারি) ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ফাঁসির মাধ্যমে মৃতু্যদন্ডের রায় কার্যকর করা হয়। তবে বঙ্গবন্ধুর আরও ছয় খুনি এখনো রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এদের মধ্যে চারজনের অবস্থান এখনো শনাক্তই করা যায়নি। বাকি দুজনের অবস্থান বিদেশে শনাক্ত হলেও তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে দন্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে চলমান আলোচনায় এখনো কোনো সুফল আসেনি। মুজিব হত্যাকান্ডে মৃতু্যদন্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিরা হলেন- আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এম রাশেদ চৌধুরী, এসএইচএমবি নূর চৌধুরী, আব্দুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেমউদ্দিন। তাদের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা আছে। এদের মধ্যে নূর চৌধুরী কানাডায় এবং এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ইন্টারপোলসহ বিভিন্ন সংস্থা। বাকিরা কোথায় আছে সেটা নিশ্চিতভাবে কারও জানা নেই। তবে এদের কারও বর্তমান মুখাবয়ব নিশ্চিত নয় কেউই। এদিকে শোকাবহ এই দিবস স্মরণে রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর ও জাতির পিতার সমাধিস্থল টুঙ্গিপাড়ায় একাধিক কর্মসূচি পালিত হবে। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনের চত্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে সময় সশস্ত্র বাহিনী জাতির পিতাকে গার্ড অব অনার প্রদান করবে। এ ছাড়া ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। পরে প্রধানমন্ত্রী বনানী কবরস্থানে গিয়ে ১৫ আগস্টে পরিবারের শাহাদাতবরণকারী সদস্য ও অন্য শহীদদের কবরে পুষ্পস্তবক অপর্ণ, ফাতেহা পাঠ এবং মোনাজাত করবেন। এরপর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানেও ফাতেহা পাঠসহ বিশেষ মোনাজাত ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন থাকবে। এদিকে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন শোক দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারসহ বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে। দেশের টিভি চ্যানেলগুলো, বেসরকারি বেতার, এফএম রেডিও, কমিউনিটি রেডিও দিবসটি উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে। সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। আওয়ামী লীগের কর্মসূচি: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে দেশবাসীকে সাথে নিয়ে পালন করার জন্য সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতীম, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মী-সমর্থকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সূর্যোদয় ক্ষণে বঙ্গবন্ধু ভবন এবং কেন্দ্রীয় কাযার্লয়সহ সংগঠনের সর্বস্তরের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন। সকাল সাড়ে ৬টায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। এ সময় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন এবং ঢাকা নগরীর প্রতিটি শাখা থেকে শোক মিছিলসহ বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। সকাল সাড়ে ৭টায় বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, মাজার জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ, মোনাজাত ও মিলাদ মাহফিল। সকাল ১০টায় গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। বাদ জোহর দেশের সকল মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল। মন্দির, প্যাগোডা, গির্জা, উপাসনালয়ে দেশব্যাপী বিশেষ প্রার্থনা কর্মসূচি পালিত হবে। বাদ আসর বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনা সভা : এদিকে ১৬ আগস্ট শুক্রবার বিকাল ৪টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা করবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আলোচনায় অংশ নেবেন জাতীয় নেতা ও বরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একইসঙ্গে আওয়ামী লীগের সকল জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডসহ সব শাখার নেতাদের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। এসব কর্মসূচি থেকে আবারও সেই গগণবিদারী ধ্বনিতে চিরকালীন সেস্নাগান ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান, ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’ আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত অন্নদাশংকর রায়ের অমর এই কবিতার মতোই আদিগন্ত বিস্তৃত হয়ে অনন্তকাল বাঙালি জীবনে, ইতিহাস-ঐতিহ্যে আর বিশ্বের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের লড়াই-সংগ্রামে চিরভাস্বর হয়ে আলোর পথ দেখাবেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।