সৌন্দর্যের লীলাভূমি রহস্যময় সৃষ্টি বগালেকে

0
85

‘দে-ছুট’ ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা প্রকৃতিকে ভালোবেসেই ছুটে চলে দেশ-দেশান্তরে। ‘এসো বন্ধু দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের ছায়াতলে ঘুুরে বেড়াই পাহাড়-পর্বত আর প্রকৃতির মায়াবী অরণ্যে’ এ স্লোগানকে ধারণ করেই এবার অগাধ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবানের রুমা থেকে পায়ে হেঁটে গিয়েছিলাম প্রকৃতির রহস্যময় সৃষ্টি বগালেকের প্রান্তরে।

ঢাকার ফকিরাপুল থেকে রাত্রে নানা ঝক্কি ঝামেলার পরে রাত ১১টায় গাড়ি ছেড়ে ছিল দেড়টায়। কাঁচপুর গিয়ে গাড়ি পুরাই ব্রেক, পরিস্থিতি অনুমান করে বুঝতে পারলাম, সারা রাত পার হলেও ঘটনার রফাদফা হবে না, বরং ত্রিমুখী সংঘর্ষ হওয়ার বিপুল সম্ভবনা, এমন নাজুক অবস্থায় মোস্তাকের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তায় গাড়ি পুনরায় স্টার্ট নিল। পরের দিন বেলা ১২টায় বান্দরবান পৌঁছাই।

যোহরের নামাজ আদায় করেই চান্দের গাড়িতে চড়ে ছুটি রুমার উদ্দেশে, সেখানে পৌঁছে-দুপুরের আহার সারতে বিকাল হয়ে এলো। ফলে ওইদিন রুমাতেই রাতযাপন। তাই বিকালটা সাঙ্গু নদীতে ইঞ্জিন নৌকায় চেপে ছুটলাম রিজুক জলপ্রপাতের পথে। আমার চোখে একযুগ আগে দেখা রিজুক জলপ্রপাতের সৌন্দর্য এখন যেন অনেকটাই করুণ। অবশ্য পরিবেশের এ ভারসাম্যহীনতার জন্য সভ্য সমাজের মানুষরা অনেকাংশে দায়ী। প্রপাতের পাশে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে আলো-আঁধারিতে ফিরে এলাম রুমা বাজারে। পরের দিন দুর্গম পথ পারি দিয়ে যেতে হবে বগালেকের অপার্থিব সৌন্দর্য অবলোকন করতে, তাই গাইডকে নিয়ে প্রয়োজনীয় রসদ কিনে নিলাম।

সবাই সকাল সকাল প্রস্তুত। কিন্তু জসিম ও করিম ১৭ কিলোমিটার হাঁটতে হবে জেনে শারীরিক অসুস্থতার ভান করে বেঁকে বসল। একজনের হার্ট আরেক জনের লিভার, আমি ওদের কাহিনী বুঝতে পেরেও না বোঝার ভাব করে তাল মিলিয়ে বললাম, ঠিক আছে তোমরা গাড়িতে যাও। হঠাৎ করিম ভাই কি যেন ভেবে হেঁটেই যেতে রাজি হল।

আর জসিম এবার নতুন বাহানা তুলে রনে ভঙ্গ দিয়ে সোজা ঢাকার পথে। আর্মি ক্যাম্পে নাম, ঠিকানা, এন্টি করে দুর্গম ঝিরিপথে হাইকিং শুরু! ওই সময় সুবহানল্লাহ্ আর আল্লাহু আকবর ধ্বনি তুলে পাহাড়, অরণ্য আর অগণিত ঝিরি মাড়িয়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলছি। ফরমালিন মুক্ত কলা, পেপে খেয়ে শক্তি জুগিয়ে নিচ্ছি।

চারপাশে পাহাড় আর ঘন অরণ্য তার মাঝ দিয়ে ‘দে-ছুট’ দল মনের আনন্দে হেঁটেছে। দেহ মনে কোনো ক্লান্তি আসেনি, আসেনি কোনো ভাবনা, শুধুই আমরা। ঢাকায় মাত্র কয়েক গজ হাঁটলেই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা আর সেখানে ভরদুপুরেও মাইলের পর মাইল হাইকিং।

নৈঃশব্দের গভীর অরণ্যের পথে হেঁটে চলা কতটা যে রোমাঞ্চকর অনুভূতির তা শুধু অনুভবই করা যাবে।

দীর্ঘপথ পরিক্রমায় এক সময় মনে হবে নাম না জানা সুর তুলে ডেকে যাওয়া বনের পাখিও ‘দে-ছুট’ স্লোগান দিচ্ছে। প্রায় চার ঘণ্টা হাঁটার পর প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি আবিষ্কার করি।

দু’পাশের পাহাড় খাড়া হয়ে যেন দিগন্তের সঙ্গে দোস্তি পেতেছে, বিশাল আকৃতির বৃক্ষগুলো যেন প্রহরী হয়ে শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

চারপাশে অজস্র ছড়িয়ে থাকা পাথরের মধ্যে বেশ কিছু পাথরের আকৃতি অদ্ভুদ। দেখলে মনে হবে মানুষরূপী হায়েনাদের কবল থেকে বাঁচার জন্য বড় পাথরের মাঝে ছোট্ট পাথরটি লুকাতে চাচ্ছে। সত্যিই সৃষ্টিকর্তার অপার রহস্য।

পায়ের নিচে বড় বড় পাথর আর মাথার ওপর প্রখর রোদের তাপ। একটা সময় পথের মায়ায় মনে চেয়েছিল-সেল ফোন ছুড়ে ফেলে হারিয়ে যাই অজানায়! কিন্তু পেটের তাড়নায় তা আর হল না। পাহাড়ের কুল ঘেঁষা উম্বংপাড়া ম. ইউ কারবারির ঘরে নুডলস খেয়ে আপাতত পেট বাবাজিকে থামালাম। আমাদের মতো আরও অনেক আদিবাসী এই পথ মাড়ালে তার ঘরে খাবার খেয়ে খানিকটা সময় বিশ্রাম নেয়।

প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টা হাঁটার পর পড়ন্ত বিকালে নারিশ্বা ঝর্ণা মুখে ব্রেক দেই। কী অদ্ভুদ! কত সুন্দর তার রূপ। শুকনো মৌসুমেও রিমঝিম শব্দ তুলছে পানির অবিরাম ধারা।

বিকেলে আবার হাইকিং অতঃপর ট্র্যাকিং। ঘন জঙ্গলের কারণে এবার দিনের আলোতেই অন্ধকার। টর্চের আলোতে পাহাড় বেয়ে উপরে উঠছি।

এক সময় অমাবস্যা অন্ধকারেই পাহাড় চূড়ায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ি। চিড়া-মুড়ি-মিঠাই-খেজুর খেয়ে আবারও হাঁটা। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এসে পৌঁছাই সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২৭৪১ ফিট ওপরে প্রকৃতির আপন খেয়ালে সৃষ্টি অনিন্দ্য সুন্দর বগা লেকের নিসর্গে।

হাস্যোজ্জ্বল কিম আমাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। আজ রাতে তার কটেজেই থাকব। লেকের জলে সাফ সুতরা হয়ে বার বি-কিউ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। লেকের ধারে গভীর রাত পর্যন্ত জম্পেশ আড্ডা চলে।

ফেরার দিন সময় বেথেলপাড়া ও উম্মনপাড়ার মাঝামাঝি টেবিল হিল দেখতে গেলাম। পৃথিবীতে সুইজারল্যান্ডের টেবিল হিল একমাত্র টেবিল হিল হিসেবে স্বীকৃত। অথচ দেখতে প্রায় কাছাকাছি প্রকৃতির দান আমাদের গর্ব বান্দরবানের টেবিল হিল সম্পর্কে বিশ্ব তথা এ দেশবাসীর কাছেই রয়েছে অনেকটা অজানা!

কিভাবে যাবেন

ঢাকা, গাবতলী ও ফকিরাপুল থেকে বিভিন্ন পরিবহনে বান্দরবান যাওয়া যায়। ননএসি/এসি দু-ধরনেরই সুবিধা রয়েছে। বান্দরবান শহর থেকে রুমা বাজার চান্দের গাড়ি/বাস/জিপে যাওয়া যাবে।

কোথায় থাকবেন

রুমা বাজারে রাত যাপন করতে চাইলে বিভিন্ন রিসোট/কটেজ/হোটেল ও বোর্ডিং আছে, ভাড়া ৫০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত।