হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্য হালের লাঙল-বলদ

0
163

লাঙল-বরদমিজান মনির, সহসম্পাদক নিউজচিটাগং২৪: একসময় জমি চাষাবাদের জন্য লাঙলই ছিল কৃষকদের একমাত্র ভরসা। গরুর হালে লাঙ্গল জোয়াল আর মই গ্রাম-গঞ্জের জমিতে হরহামেশাই দেখা যেত। এখন আর চোখে পড়ে না গরুর হাল লাঙ্গল জোয়াল।

হাল চাষীদের অনেকে নিজের জমিতে হাল চাষ করার পাশাপাশি অন্যের জমি চাষ করে পারিশ্রমিক হিসেবে কিছু অর্থও উপার্জন করতেন। তারা হাজারো কর্মব্যস্ততার মাঝে কখনো কখনো মনের সুখে ভাওয়াইয়া গান গেয়ে গেয়ে জমি চাষ করতো।

ভোর রাত থেকে শুরু করে প্রায় দুপুর পর্যন্ত জমিতে হাল চাষ করতেন তারা। চাষীরা জমিতে হাল নিয়ে আসার পূর্বে চিড়া গুড় অথবা মুড়ি-মুড়কি দিয়ে হালকা জল খাবার খেয়ে নিতেন। পরে একটানা হট্ হট্, ডাইনে যা, বাঁয়ে যা, বস্ বস্ আর উঠ্ উঠ্ করে যখন ক্লান্তি আসত, তখন সূর্য প্রায় মাথার উপর খাড়া হয়ে উঠতো। এ সময় চাষীরা সকালের নাস্তার জন্য হাল চাষ বিরতি রেখে জমির আইলের উপর বসতেন। তাদের নাস্তার ধরণটাও ছিল ঐতিহ্যবাহী।

এদিকে লাঙল-মইসহ কৃষি সরঞ্জাম তৈরির সাথে সংশ্লিষ্টরা দিন দিন বেকার হয়ে যাচ্ছেন। তবে পুরনো সেই ঐহিত্য ধরে রাখার নিরন্তর চেষ্টায় এখনো মহশেখালী উপজেলার কিছু কিছু হাট-বাজারে ওই সকল কৃষি সরঞ্জামের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়িরা। তবে সেগুলোর চাহিদা কম থাকায় সেই কারিগররা বাধ্য হয়েই চলে যাচ্ছেন ভিন্ন পেশায়।

অথচ এমন একদিন ছিল প্রতিটি ফসল লাগানোর মৌসুমে এসব কৃষি সরঞ্জাম তৈরির কারিগরের ব্যাপক চাহিদা ছিল গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে। তারা পেত সম্মান আর কুড়াত গ্রামজুড়ে সুনাম। আর তাদের কদর ছিল আকাশ-ছোঁয়া। আজ সেই অতীত হারিয়ে হাজার বছর ধরে ব্যবহার হয়ে আসা লাঙলসহ অন্যান্য কৃষি সরঞ্জামের স্থান হবে জাদুঘরে।

মহেশখালী উপজেলার অফিস পাড়া গ্রামের কৃষক মনির আহমদ বলেন, এক সময় লাঙল, জোয়াল, মই ও বলদ ছাড়া চাষাবাদ কল্পনা করা যেত না। কিন্তু এখন কালের বিবর্তনে যান্ত্রিকতার এ যুগে সব হারিয়ে যাচ্ছে।

মহেশখালী উপজেলার মোহম্মদ শাহঘোনা গ্রামের কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, লাঙ্গল বলদ দিয়ে চাষাবাদে প্রচুর সময় লাগার কারণে কৃষকরা ট্রাক্টর দিয়ে হাল চাষ করে। ট্রাক্টর দিয়ে এক বিঘা জমি চাষ করতে খরচ হয় ৮‘শ থেকে ১ হাজার টাকা। এক বিঘা জমি চাষে সময় লাগে ৩/৪ ঘন্টা। এদিকে বদল দিয়ে সেই পরিমান জমি চাষ করতে খরচও অনেক বেশি লাগতো। সময় লাগতো প্রায় পুরো দিন।

একই গ্রামের কৃষক গুরা মিয়া বলেন, আগে তিনি মাসে অন্তত ২০/২৫টি হাল বিক্রি করতাম। এখন মাসে পাঁচটি হালও বিক্রি করতে পারি না। মানুষ এখন হাল না কিনে ট্রাক্ট্রর দিয়ে জমি চাষ করায়।
এ যুগে মানুষের অসীম চাহিদা আর অভাবময় জীবনে উন্নয়নের ছোঁয়া দিতে আবির্ভূত হয়েছে দামি দামি যান্ত্রিক হাল। কৃষকদের কাঠের লাঙলের পরিবর্তে এখন পাওয়ার টিলারসহ যান্ত্রিক অন্যান্য পদ্ধতি স্থান করে নিয়েছে।

সাথে এসেছে ফসলের বীজ, বপন-রোপণ এবং ফসল কাটা মাড়াই করার যন্ত্র। আর এসব যন্ত্র চালাতে মাত্র ১ থেকে ২ জন লোক প্রয়োজন। ফলে বিত্তবান কৃষকরা ওই যন্ত্র কিনে মজুরের ভূমিকায় কাজ করলেও গ্রামের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও দিনমজুরের জীবন থেকে ওই সব ঐতিহ্যময় স্মরণীয় দিন চিরতরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এখন আমাদের কাছে এসব শুধুই স্মৃতি। ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে গরুর হাল, কাঠের লাঙ্গল, জোয়াল, বাঁশের মই লোকগল্প।