হিমালয় কন্যা পঞ্চগড় ২

0
89

তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো, মহানন্দা নদী এবং জলপাইগুড়ি ব্রিজ

তিন্নু বাজার নেমে আবার অটো নিলাম তেঁতুলিয়া বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে। যাত্রাপথে আঁখ ক্ষেতে দেখলাম আঁখ কাটা চলছে, আর তখনই দলের সবাই অটো থামিয়ে একজনকে পাঠালো আঁখ চেয়ে নিয়ে আসতে। অটোর চালক নিজে থেকেই নেমে গেলেন যেন আরো খানিকটা বাড়িয়ে দেয়। প্রায় ৩/৪টা আস্ত আঁখ কেটে কয়েক টুকরো করে আমাদের হাসিমুখেই দিয়ে দিল তারা। কিন্তু আফসোস, এই আঁখগুলো সাধারণত চিনিকলের জন্য করা হয়, তাই এগুলো খুব মিষ্টি হলেও রস একদমই নেই এবং প্রচণ্ড শক্ত। এরপর চলে এলাম তেঁতুলিয়া বাস স্ট্যান্ডে। ভোর বেলা তেঁতুলিয়ার বিখ্যাত তেঁতুল গাছটা ঠিকমত না দেখলেও তখন দেখে নিয়ে আবার হোটেল নূরজাহানে ঢুকে গেলাম হালকা চা-নাস্তা খেতে।

খাওয়া শেষে আমাদের বাসের ড্রাইভার দেলোয়ার ভাইকে ফোন দিলে তিনি এসে একটা অটো ঠিক করে দিলেন। সেটাতে করে প্রথমে গেলাম তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো দেখতে। প্রায় ৩০০ বছরেরও বেশি পুরনো গাছগাছালি পরিবেষ্টিত এই বাংলোটি মনোমুগ্ধকর। পাশেই আছে পিকনিক স্পট। এবং ডাকবাংলোর সামনে একটি জায়গা আছে, যেখানে লেখা- কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার স্পট। সাধারণত দু’দেশের আকাশ পরিষ্কার থাকলে তবেই ভোরে কিংবা সন্ধ্যায় খুব ভালোভাবেই এই পাহাড়ের চূড়া দেখা যায়। কিন্তু, আমাদের দুর্ভাগ্য, কেননা আমরা যেদিন পৌঁছেছি সেদিন প্রচুর কুয়াশা ছিল। কয়েকটা ছবি তুলে দ্রুতই চলে গেলাম পুরাতন বাজার।
পুরাতন বাজার হচ্ছে আগের হাট, যেটা এখন আর নেই। পুরাতন বাজারে অটো থেকে নেমেই প্রথমে চোখে পড়বে সামনে ভারতের সীমানা অতিক্রম করা নিষেধ। একটি প্রাচীন ঘাট আছে, যেটা দিয়ে নীচে নেমে কিংবা সেটার উপর থেকে দাঁড়িয়েই দেখা যায় হাঁটু-সমান মহানন্দা নদীর পানিতে পাথর উত্তোলনের দৃশ্য।

টারশিয়ারী যুগে সমুদ্রের এক প্রলয়ংকারী জলোচ্ছাস এবং প্লাবনে পশ্চিমবঙ্গসহ এ দেশের অনেক অঞ্চলই পানির নীচে তলিয়ে গিয়েছিল। সেজন্যে সমুদ্রজাত পাললিল শিলাস্তর দিয়ে এ দেশের বেশ কিছু অঞ্চল পরিপূর্ণ, যার মধ্যে পঞ্চগড় অন্যতম। তেঁতুলিয়া উপজেলার নির্দিষ্ট কয়েকটি জায়গায় ৫/৬ ফুট গর্ত করলেই দেখা মেলে পাথর এবং পানিশাল কাঠের। তাই এই অঞ্চলের অনেক লোকই পাথর উত্তোলন করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।
পাথর উত্তোলনের জন্যে বিশালাকারের রাবারের টিউব নিয়ে মহানন্দা নদীর মাঝে চলে যান পাথর সংগ্রহকারীরা। নদীর মাঝ থেকে কখনো কয়েকজন মিলে, আবার কখনো নিজে একাই পাথর তুলে রাবার টিউব ভর্তি করে পাড়ে নিয়ে আসেন। তারপর বিভিন্ন আকৃতির পাথরগুলো থেকে ময়লা ছাঁকিয়ে একটা কাঠের বাক্সে ভর্তি করে নেয়। একটা কাঠের বাক্স একবার ভর্তি হলে সেটাকে এক সেপটিক বা এক ফেরা বলে।

নদীর পাথর উত্তোলনের মাঝে ওপাড়ে চোখ পড়তেই ভারতের কাঁটাতারের সীমানা দেখলাম এবং বামপাশে দূরে একটা ব্রিজ দেখলাম। সেটাকে অনেকে বড় ব্রিজ বলে, আবার অনেকে স্লুইস গেট বলে কেননা একইসাথে স্লুইস গেটের কাজ এবং যানবাহন চলাচলের কাজ হয় এই ব্রিজ দিয়ে। অনেকে আবার জলপাইগুড়ি ব্রিজ বলে, কেননা ধারণা করা হয়, ভারতের জলপাইগুড়ি অংশটা ঐদিকেই অবস্থিত।
পঞ্চগড় যাত্রা ও কিছু কথা

অটোতে করে ফিরে এলাম তেঁতুলিয়া বাস স্ট্যান্ড। বোর্ডবাজার যাওয়ার বাসের জন্যে অপেক্ষায় আছি সবাই। বোর্ডবাজার নেমে ৫ কিলোমিটার ভেতরেই মহারাজার দীঘি এবং ভেতরগড় দুর্গ। আমাদের দলের মধ্যে দুজন হঠাৎ করেই বলে বসলো তাদের শরীর খারাপ লাগছে। আর তখন রোদের তাপে বেশ খানিকটা ভ্যাপসা গরমও লাগছিল। টানা ১৩ ঘন্টার যাত্রা, ঘুমহীন রাত, কাঁধে ব্যাকপ্যাক নিয়ে ঘোরাঘুরি, তার উপর ভ্যাপসা গরম- এত ধকল তাদের শরীর সামলাতে পারেনি হয়তো। যা-ই হোক, যেহেতু সেখানকার বেশিরভাগ বাসই লোকাল, তাই দুজনের কথা চিন্তা করে এককথায় বাধ্য হয়েই অটো ঠিক করলাম একেবারে পঞ্চগড় সদর পর্যন্ত।

অটোতে করে যখন বোর্ডবাজারের কাছাকাছি, তখন অটো চালককে আমি বললাম ভেতরে যেতে, এজন্য আলাদা করে ভাড়া বাড়িয়ে দেবো। তিনি আমাকে বললেন, সকালেই এক দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু অতিরিক্ত কুয়াশা থাকার কারণে ভেতরগড় দুর্গ পুরোটা পলিথিন দিয়ে ঢাকা। আরো বললেন, সাধারণত বৃষ্টির দিনে এবং অতিরিক্ত কুয়াশার দিনে এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের খনন কাজ বন্ধ থাকে এবং পলিথিন দিয়ে পুরোটা নিদর্শন ঢেকে রাখা হয়। ভেতরে ১০ কিলোমিটার রাস্তা গিয়ে যদি কিছুই দেখতে না পারি, তবে না যাওয়াটাই ভালো- এমন চিন্তাতেই মহারাজার দীঘি দেখার কথাও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম।
তেঁতুলিয়া থেকে পঞ্চগড় সদর আসতে প্রায় সবকটা থানাই পেড়িয়ে আসতে হয়। এবং প্রত্যেকটা থানাতেই কিছু না কিছু দেখার আছেই। তবে দেখতে চাইলে অবশ্যই আপনাকে সময় নিয়ে আসতে হবে এবং গ্রামের ১০/১২ কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে দেখতে হবে। আমাদের সময় ছিল সীমিত। তখন বাজে তিনটার কাছাকাছি। পঞ্চগড় মহিলা কলেজ চলে এলাম বাংলাদেশের একমাত্র রকস মিউজিয়াম দেখে যাব বলে। অটো থেকে নেমে পারমিশন নেয়ার জন্যে কলেজের ভেতরে গেলাম।

কিন্তু ভেতরে ঢুকেই মনটা খারাপ হয়ে গেল কেননা সেদিন কলেজে পরীক্ষা চলছিল যা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। তারপরও অধ্যক্ষ স্যারের দেখা পেলাম। তিনি আমাদের দেখাতে পারছেন না বলে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। আর তার পরেরদিনও দেখার কোনো সুযোগ নেই, কেননা পরের দিন বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজের অনুষ্ঠান আছে। কী আর করা! অগত্যা চলে এলাম সেখান থেকে। পঞ্চগড় সদরে খুব সম্ভবত এক ব্রাহ্মণ হোটেলে খাবার খেয়ে বের হয়েই শুনলাম শীতকালের জন্যে পঞ্চগড় থেকে ঠাকুরগাঁওগামী শেষ বাস যায় ৫-৫:৩০ এর মধ্যে। তাই যতটুকু ঘুরে দেখতে পেরেছি ততটুকুর শান্তি নিয়েই ঠাকুরগাঁওয়ে গেস্ট হাউজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। যেতে সময় লাগে আরো দেড় থেকে দুই ঘন্টা। কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তি এবং বিভিন্ন স্থান না দেখতে পারার দুঃখ এক নিমিষেই মিলিয়ে গেল ঠাকুরগাঁওয়ের আরডিআরএস গেট হাউজে বাইরের আর ভেতরের চমৎকার পরিবেশ দেখে। পরের পর্বে ঠাকুরগাঁও এবং দিনাজপুর নিয়ে বিস্তারিত থাকছে।
পঞ্চগড়ের দর্শনীয় স্থান সমূহ

একটা পর্যটন নগরীর হওয়ার জন্যে যেসব উপাদানের প্রয়োজন তার সবকিছুই পঞ্চগড়ে আছে এবং পঞ্চগড়ে দর্শনীয় স্থানও অনেক আছে। তবে পঞ্চগড় ছোট জেলা হলেও দর্শনীয় স্থানগুলোর দূরত্বের উপর ভিত্তি করে একদিনে ঘুরে দেখা সম্ভব নয়। আর আমাদের মতো ভরা শীতকালের দিনে তো সম্ভবই না, তবে দীর্ঘ লম্বা দিনে হয়তো সম্ভব হতেও পারে।

১. ভিতরগড় দুর্গ;
২. মহারাজার দীঘি (প্রায় ১৫০০ বছর প্রাচীন) ও কাজল দীঘি;
৩. রকস মিউজিয়াম; (বাংলাদেশের একমাত্র পাথরের যাদুঘর)
৪. বাংলাবান্ধা স্থল বন্দর ও জিরো পয়েন্ট;
৫. তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো এবং পিকনিক স্পট;
৬. মির্জাপুর শাহী মসজিদ; (প্রায় ৪০০ বছর পুরানো)
৭. ছেপড়াঝাড় পাহাড়ভাঙ্গা মসজিদ; (প্রায় ৪০০ বছরের পুরানো)
৮. বার আউলিয়ার মাজার;
৯. গোলকধাম মন্দির;
১০. বদেশ্বরী পিঠ মন্দির; (এ মন্দির বাংলাদেশে দুটি আছে কেবল। এটি এবং সীতাকুন্ডে একটি)
১১. জগবন্ধু ঠাকুরবাড়ি;
১২. সমতল ভূমির চা-বাগান এবং কাজী এন্ড কাজী টি এস্টেট বাংলো;
১৩. দেবীগঞ্জ সেতু ও ধরধরা রেল সেতু;
১৪. এশিয়ান হাইওয়ে, রবীন্দ্র চত্বর ও নজরুল চত্বর;
১৫. মীরগড়ের অবশিষ্ঠাংশ; হোসেনগড় বর্তমানে ভারতীয় ভূখন্ডে চলে গেছে। দেবেনগড়, রাজনগড় এবং মীরগড়ের বেশিরভাগ অংশই এখন বিলুপ্তপ্রায়।
১৬. মহানন্দী নদী, পাথর উত্তোলন এবং ভারতের জলপাইগুড়ি ব্রীজ;
১৭. কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন; (হেমন্তকালে এবং শীতের শুরুতে কিংবা শেষের দিকে);
১৮. বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেডিয়াম;

পঞ্চগড়ের আঞ্চলিক সংস্কৃতির জনপ্রিয় গান হচ্ছে ‘হুলির গান’। অনেকটাই পালা শ্রেণীর গান। যদিও বা, সনাতন ধর্মের হুলি পূজার নাম থেকে এই নামের উৎপত্তি তা সত্ত্বেও এই গানে ফুটে ওঠে সমসাময়িক জীবনযাপনের অসংগতির চিত্র, দুঃখ-বেদনা-সুখ কিংবা প্রেমের ইতিহাস। কখনো তা রসাত্মকভাবে আবার কখনো তা ব্যাঙ্গত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়। এই গানে একজন ছোকরা (মেয়ের সাজে ছেলে) এবং একজন সং (জোকার) থাকেন যারা বিভিন্ন নাটকীয়তার সাথে সাথে কাহিনীর ধারাবাহিক বিন্যাস করেন। বর্ণিল পোশাকে সজ্জিত হতে হয় এই গানে অংশগ্রহণ করতে চাইলে। একেকটা গানে প্রায় ১০-১২ জন পর্যন্ত অংশগ্রহণ করে থাকেন। কাসর, সারঙ্গী, ঢোল বাঁশি সহ আরো বিভিন্ন বাদ্য যন্ত্র ব্যবহার করা হয় এ গানে।
আবাসন ব্যবস্থা

পঞ্চগড় পরিপূর্ণভাবে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে উঠতে না পারলেও পঞ্চগড়ে আবাসন ব্যবস্থার স্বল্পতা নেই।

সরকারি আবাসনসমূহ

১. পঞ্চগড় সার্কিট হাউজ;
২. জেলা পরিষদ ডাকবাংলো;
৩. তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো;
৪. বাংলাবান্ধা ডাকবাংলো;
৫. পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের রেস্ট হাউজ;

এছাড়া, তেঁতুলিয়া পিকনিক কর্ণার, দেবীগঞ্জ ডাকবাংলো, বোদা ডাকবাংলো, আটোয়ারী ডাকবাংলো, কৃষি ফার্ম গেস্ট হাউজ, রেশম প্রকল্প গেস্ট হাউজসহ আরো অনেকগুলো সরকারিভাবে থাকার আবাসনের ব্যবস্থা আছে।

বেসরকারি আবাসনসমূহ

১. মৌচাক আবাসিক হোটেল;
২. সেন্ট্রাল গেস্ট হাউজ;
৩. হোটেল রাজনগর আবাসিক;
৪. হিলটন বোর্ডিং;
৫. হোটেল প্রীতম আবাসিক;

এছাড়া, হোটেল ইসলাম, এইচ কে প্যালেস, নীরব গেস্ট হাউজ, রোকসানা বোর্ডিং, ইসলাম আবাসিক হোটেল, মুন স্টার সহ আরো অনেকগুলো আবাসিক হোটেলে থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা আছে। আমাদের ট্যুরের ভিডিও পাবেন এখানে।
পঞ্চগড়ের মানুষজন সহজ সরল এবং অতিথিপরায়ণ স্বভাবের। তাদের সাথে আন্তরিকভাবে কথা বললে তারা খুব খুশি হন এবং নিজে থেকেই যেকোনো সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসেন। পঞ্চগড়ের মানুষজনের আরেকটা স্বভাব হচ্ছে, তারা চান তাদের জেলাটাও যেন পর্যটনের নগরী হিসেবে পরিচিতি পায়। তাই তারা চান আরো বেশি পর্যটক আসুক। সাধারণত অন্যান্য জায়গায় অপরিচিত বা পর্যটক দেখলেই দাম বাড়িয়ে নেয়, কিন্তু পঞ্চগড়ে এটা খুবই কম। পঞ্চগড় দুর্যোগপ্রবণ জেলা নয়, আবার এখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্য যেকোনো জেলার চাইতে শান্তিপূর্ণ। তবে পঞ্চগড়ে ঘুরতে হলে সবচাইতে ভালো হেমন্তকাল কিংবা শীতের শুরু অথবা শীতের একদম শেষে। দিনটা বড় থাকলে একদিনে অনেকগুলা দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণ করা সম্ভব।

তবে পঞ্চগড়ের যাতায়াত ব্যবস্থা অন্যান্য পর্যটন নগরীর মতো উন্নত নয়। তাই যেখানেই যাবেন রিজার্ভ করে যাবেন যাতে ঘুরে দেখে বের হয়ে আবার অন্য কোথাও যেতে পারেন। অথবা দল বেঁধে গেলে মাইক্রো বা ভ্যান ভাড়া করে নিতে পারেন। যদিও অনেক জায়গায় মাইক্রো ছেড়ে অটোতেই উঠতে হতে পারে। আর পঞ্চগড়ের স্থানীয় বাসের ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য দেয়াটা মুশকিল, কেননা আগে সাদা পতাকা লাগানো বাসগুলো ছিল গেটলক সার্ভিস। কিন্তু বর্তমানে কয়েক রঙের পতাকা লাগানো বাস আছে এবং সবাই-ই নিজেদের গেটলক বলে। আদতে কে যে গেটলক তা খুঁজে বের করা মুশকিল!