১ম মৃত্যুবার্ষিকীতে সুনীলকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ

0
40

মোমিন স্বপন, নিউজরুম এডিটর, বাংলামেইল২৪ডটকম>>
সুনীল‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল…’ কবিতাটি পড়েননি এমন কবিতা প্রেমির সংখ্যা খুঁজে পাওয়াই কঠিন। শুধু কবিতাই নয় গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ সাহিত্যের অনেক শাখায় বিচরণ যে লেখকের তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ২৩ অক্টোবর বুধবার তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এপার-ওপার দুইবাংলার প্রিয় কবিকে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুরে। মাত্র ৪ বছর বয়সে তিনি কলকাতায় চলে যান। ১৯৫৩ সাল থেকে তিনি কৃত্তিবাস নামে একটি কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। ১৯৫৮ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ একা এবং কয়েকজন এবং ১৯৬৬ সালে প্রথম উপন্যাস আত্মপ্রকাশ প্রকাশিত হয়।

তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই হলো- আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি, যুগলবন্দী (শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে), হঠাৎ নীরার জন্য, রাত্রির রঁদেভূ, শ্যামবাজারের মোড়ের আড্ডা, অর্ধেক জীবন, অরণ্যের দিনরাত্রি, অর্জুন, প্রথম আলো, সেই সময়, পূর্ব-পশ্চিম, ভানু ও রাণু, মনের মানুষ ইত্যাদি।

শিশুসাহিত্যে তিনি ‘কাকাবাবু-সন্তু’ নামে এক জনপ্রিয় গোয়েন্দা সিরিজের রচয়িতা। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি ভারতের জাতীয় সাহিত্য প্রতিষ্ঠান সাহিত্য অকাদেমি ও পশ্চিমবঙ্গ শিশুকিশোর আকাদেমির সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম বাংলাদেশে হলেও তিনি বড় হয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। পড়াশুনা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। ব্যাংকের পিয়নের চেয়েও স্কুল মাস্টারের বেতন ছিল কম। সুনীলের মা কখনোই চাননি তার ছেলে শিক্ষকতা করুক। পড়াশুনা শেষ করে কিছুদিন তিনি বিভিন্ন অফিসে চাকরিও করেছেন। তারপর থেকে সাংবাদিকতায়। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান মি. পলেন কলকাতায় এলে সুনীলের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। সেই সূত্রে আমেরিকা যান সুনীল ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসাবে। ডিগ্রি শেষে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপগ্রন্থাগারিক হিসেবে কিছুদিন কাজও করেন সুনীল।

সুনীলের বাবা তাকে টেনিসনের একটা কাব্যগ্রন্থ দিয়ে বলেছিলেন, প্রতিদিন এখান থেকে দু’টি করে কবিতা অনুবাদ করবে। এটা করা হয়েছিল তিনি যাতে দুপুরে বাইরে যেতে না পারেন। তিনি তাই করতেন। বন্ধুরা যখন সিনেমা দেখতো, বিড়ি ফুঁকত, বাইরে আড্ডা দিতো সুনীল তখন বাবার কথামতো দুপুরে কবিতার অনুবাদ করতেন। অনুবাদ একঘেঁয়ে হয়ে উঠলে তিনিই নিজেই লিখতে শুরু করেন। ছেলেবেলার প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করা লেখা কাবিতাটি তিনি ‘দেশ’ পত্রিকায় পাঠালে তা ছাপা হয়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বেশ কিছু গল্প-উপন্যাসের কাহিনী চলচ্চিত্রে রূপায়ণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত অরণ্যের দিনরাত্রি এবং প্রতিদ্বন্দ্বি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া কাকাবাবু চরিত্রের দু’টি কাহিনী ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’ ও ‘কাকাবাবু হেরে গেলেন’ চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। ‘হঠাৎ নীরার জন্য’ সুনীলের আরেকটি ছবি।

২০০২ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতা শহরের শেরিফ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭২ ও ১৯৮৯ সালে আনন্দ পুরস্কার এবং ১৯৮৫ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।

হার্টের সমস্যার কারণে তিনি ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর মারা যান। ২০০৩ সালের ৪ এপ্রিল তিনি কলকাতার ‘গণদর্পণ’কে সস্ত্রীক মরণোত্তর দেহদান করে যান। কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একমাত্র ছেলে সৌভিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ইচ্ছেতে তাকে দাহ করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ব্যবস্থাপনায় ২৫ অক্টোবর ২০১২ তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।

এপার ও ওপার বাংলার তুমুল জনপ্রিয় লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ১ম মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলামেইলের পাঠকের উদ্দেশ্যে তার সর্বাধিক পঠিত কবিতাটি নিচে দেয়া হলো।

কেউ কথা রাখেনি

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি
ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমী তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল
শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে
তারপর কত চন্দ্রভূক অমাবস্যা চলে গেলো, কিন্তু সেই বোষ্টুমী
আর এলোনা
পঁচিশ বছর প্রতিক্ষায় আছি।
মামা বাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর
খেলা করে!
নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো? আমার মাথা এ ঘরের ছাদ
ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায়
তিন প্রহরের বিল দেখাবে?

একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা
ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি
ভিতরে রাস-উৎসব
অবিরল রঙের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণীরা
কত রকম আমোদে হেসেছে
আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি!
বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন, আমরাও…
বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই
সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস-উৎসব
আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবেনা!

বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,
যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে
সেদিন আমার বুকেও এ-রকম আতরের গন্ধ হবে!
ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি
দূরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীলপদ্ম
তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ
এখনো সে যেকোনো নারী।
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না!