২২ টাকা দিয়েই চট্টগ্রাম থেকে আকাশপথে কক্সবাজার গিয়েছিলাম

0
67

হ্যাঁ, ২২ টাকা দিয়েই চট্টগ্রাম থেকে আকাশপথে কক্সবাজার গিয়েছিলাম। যতটুকু মনে পড়ে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে। জীবনে প্রথম বার প্লেনে চড়া এবং প্লেনে চড়েই কক্সবাজার গমন। ঐ সময় চট্টগ্রাম বিমান বন্দর থেকে কক্সবাজার -ঢাকা-ইয়াঙ্গুন (রেঙ্গুনের) ফ্লাইট ছিল। মাস জুলাই-আগস্টের দিকে হতে পারে। সময়টা ছিল বর্ষাকাল। ঐ সময় সারাদেশে দূরযাত্রায় কাঠের বডির বাস ছিল। তখন বিদেশ থেকে দেশে চেসিস আমদানী করা বাসের বডি তৈরি করা হত কাঠ দিয়ে। বাকলিয়ার কাঠ মিস্ত্রীরাও বাসের বডি তৈরি করত। চট্টগ্রাম শহরের বাদুড়তলা এলাকায় চেসিসের উপর বাসের কাঠের বডি তৈরি করতে দেখা যেত। সম্ভবত সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতি ইন্ডাস্ট্রি (তখনকার নাম গান্ধারা ইন্ডাস্ট্রি) স্টিল বডির বাস প্রথম তৈরি করে। এতে দাউদকান্দি-মেঘনা-কাঁচপুর নদীতে ফেরির মাধ্যমে চট্টগ্রাম-ঢাকা বিলাসবহুল বাস সার্ভিস হিসেবে চালু করা হয়। যদিওবা এসি ছিল না।
বাংলাদেশ বিমান তথা তখনকার পি.আই.এ এ-বাস দ্বারা স্টেডিয়ামের পূর্বপাশের্^ থেকে পতেঙ্গা বিমান বন্দরে যাত্রী নিয়ে যেত। এ বাসে বিমান যাত্রী বাদে অন্য কেউ উঠার সুযোগ ছিল না। ভাড়া নিত জন প্রতি ৫ টাকা। এর জন্য এক্সট্রা টিকেট দেয়া হত। বাসগুলো একদিকে ৩ জন, আরেকদিকে ২ জন, এক সাড়িতে ৫ জন বসা যেত। স্টেডিয়ামের পূর্বপাশে সাবেক পি.আই.এ পরবর্তী কাল বাংলাদেশ বিমানের অফিস ছিল। ১০/১৫ বছর আগে ষোলশহর বিমানের নিজস্ব ভবনে এখান থেকে স্থানান্তরিত হয়। সেই সময় প্রগতি ইন্ডাস্ট্রির স্টিল বডির বাসগুলো সারাদেশে সাড়া লাভ করে, বিলাসবহুল আরামদায়ক বাস হিসেবে।
ঐ সময়, তথা ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যেতে কাঠের বডির বাসের ভাড়া নিত ৬ টাকা। চট্টগ্রাম-ঢাকা যাতায়াতে ট্রেনই জনপ্রিয় ছিল। দৈনিক অতি জনপ্রিয় তিনটি ট্রেন চট্টগ্রাম-ঢাকা, ঢাকা-চট্টগ্রামে যাওয়া আসা করত। সকালে উল্কা, দুপুর ১২ টায় গ্রীনএ্যারো, রাত ১০ টায় মেইল। কাঠের ফ্রেমের তৃতীয় শ্রেণীর ট্রেনের ভাড়া ছিল ৭ টাকা। নারকেলের খোসার মাধ্যমে রেক্সিনের বেডে ইন্টার ক্লাসের ভাড়া ছিল ১১ টাকা। একটি কোচের মধ্যখানে পার্টিশনের দুই দিকে দুইটি টয়লেট রেখে ফার্স্ট ক্লাস ও সেকেন্ড ক্লাস দু’টি কক্ষ করা থাকত। যতটুকু মনে পড়ে সেকেন্ড ক্লাস ভাড়া ছিল ২২ টাকা, ফার্স্ট ক্লাস ২৪/২৬ টাকা।
স্টেডিয়ামের পূর্বপাশে বাংলাদেশ বিমানের অফিস থেকে ৫ টাকা ভাড়া দিয়ে অধিকাংশ যাত্রী এ বাসেই যেত, যেহেতু সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং হাতেগোনা কতেক বিত্তবান লোক ছাড়া একালের মত ব্যক্তিগত গাড়ি রাখা সহজ ছিল না। যতটুকু মনে পড়ে চট্টগ্রাম -কক্সবাজার দৈনিক একটি ফ্লাইট ছিল। চট্টগ্রাম-ঢাকা ফ্লাইট ছিল দৈনিক কয়েকটি।
ছোট আকৃতির এ বিমানগুলিকে F-27 Focker বলা হত। আসন সংখ্যা ছিল পর পর দশ লাইনে চল্লিশ জন। মধ্যখানে যাতায়াতের পথ রেখে একপাশে ২ জন করে এক রো ৪ জন। আমাদের ফ্লাইটটি সম্ভবত বেলা ১১ টার দিকেই হবে। আমাদের বহন করা এ বাসে ঢাকার যাত্রীও ছিল মনে পড়ে। বিমান বন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে চিকন লম্বাকৃতির বোয়িং কার্ড নিয়ে হেঁটে হেঁটে গিয়ে বিমানে আরোহন করি। ঢালের বোয়িং কার্ডে সিট নাম্বারে টিক্ চিহ্ন দেয়া। বিমানে আরোহনকালে বিমানবালা একালের মত স্বাগত জানায়। সিটে আরোহনের সাথে সাথে আমাদেরকে বিমানবালারা ট্রেতে করে সরবরাহ করে লেবুর স্বাদের লেমন চকলেট।

জীবনে প্রথম বিমানে চড়া। মনের ভিতর কৌতুহল কাজ করছিল। তবে ভয় ছিল না। ঘোষণা শুনে সিট বেল্ট বাঁধলাম। বিমান আকাশে উঠার সাথে সাথে ঝাঁকুনি চলছিল মেঘের কারণে। মেঘের কারণে বিমান যে কম্পন করছিল জানালা দিয়ে তা সহজে বুঝা যাচ্ছিল। এরই মধ্যে বিমানবালা প্লাস্টিকের ট্রে করে নাস্তা সরবরাহ করে। ট্রেটি ৩/৪ ইঞ্চি প্রস্থ ৮/৯ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যে হবে। এতে ছোট একটি স্যা-উইচ, এক পিস চমুচা ও এক পিস কেক। সাথে তথা পাশে পি.আই.এ লেখা ভাঁজ করা একটি টিস্যু রুমাল। জীবনে প্রথম টিস্যু দেখলাম।
আমাদের দেশের হুজুরেরা টয়লেট পেপার নয়ই, মাটির টুকরার সমান্তরালে বাজারের দর্জির কাছ থেকে ছোট ছোট কাপড়ের টুকরা নিত পকেটে রাখার জন্য। নাস্তাগুলো খেতে খেতে স্টিললেস জগে করে পানি এনে প্লাস্টিকের গ্লাসে করে সরবরাহ করল। এর পর পর পি.আই.এ লেখা ডালের গ্লাসে করে গরম পানি, চা/কফি সাথে চিনি বিমানবালা দিয়ে গেলেন। এদিকে মেঘের কারণে বিমান কাঁপতেই আছে। এখনকার মত বিমানের গতি না থাকায় কক্সবাজার পৌঁছতেও সময় লাগছিল। চা-নাস্তা খাওয়ার আরও কয়েক মিনিট পর আমাদের বহন করা বিমানটি কক্সবাজার বিমান বন্দরে নামতে শুরু করে। তখন দেখতে পাচ্ছিলাম সাগরের পাড়ে বিমান বন্দর। আমরা যাত্রীরা বিমান থেকে নেমে পায়ে হেঁটে হেঁটে টার্মিনাল ভবনে প্রবেশ করি। টার্মিনাল ভবন থেকে ব্যাগ নিয়ে অপরপাশে গিয়ে রিক্সায় করে শহরে চলে যাই।
এরপর পায় ২ বছরের ব্যবধানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসার সুযোগ হয়। ওই একই আকৃতির বিমানে। তখন ঘোষণা শুনে মনে পড়ে সময় নিয়েছিল ৫৫ মিনিট। বিমানের অভ্যন্তরে আতিথেয়তা ঠিক চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের ফ্লাইটের মত। তবে বিমানের ভাড়া নিয়েছিল ৪০ টাকা। বাংলাদেশ বিমান তথা পি.আই.এ মতিঝিল অফিস থেকে তেজগাঁও বিমান বন্দরে যাত্রীদের পৌঁছে দেয়ার জন্য বিমানের পক্ষ থেকে যানবাহন থাকত বলে মনে হয় না। ঢাকা থেকে এসে চট্টগ্রাম পতেঙ্গা বিমান বন্দর থেকে বিমানের বাসে টিকেটের মাধ্যমে ভাড়া দিয়ে চট্টগ্রাম শহরে এসেছিলাম, মনে পড়ে। এটি ছিল ঢাকা থেকে দুপুর ১২ টার ফ্লাইট এবং শীতকালে।

>>> সম্পাদকীয়, দৈনিক পূর্বকোণ।ফেব্রুয়ারী ১১, ২০১৯