৭৭টি বধ্যভূমি আছে চট্টগ্রাম নগরীর ভেতরেই

0
47

মানবজমিন:: চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ৭৭টি বধ্যভুমিতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে শতাধিক প্রতিষ্ঠান। যদিও গত একদশক ধরে এসব বধ্যভূমি সংরক্ষণে নানামুখী উদ্যোগের কথা বলেছেন প্রশাসন। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাস। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় ট্রেন থেকে নামিয়ে আর আশপাশের এলাকা থেকে ধরে এনে একদিনে জবাই করে পাঁচ হাজারের বেশি নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করা হয় ফয়্থস লেকে। পুরো ৯ মাস ধরে এ স্থানটিকে বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছিল পাকিস্তানী বাহিনী ও বিহারীরা।

এরপর কেটে গেছে চারযুগ-কিন্তু এ বধ্যভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি কেউ। উল্টো সেই বধ্যভূমিতে একটি বিশাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে একটি বিশেষ মহল। বধ্যভূমি থেকে কিছু দূরে নির্মাণ করা হয়েছে লোক দেখানো একটি স্মৃতিস্তম্ভ।
একই অবস্থা হালিশহরের মধ্যম নাথপাড়া ও আবদুরপাড়া বধ্যভূমির। এখানে বিহারিরা হত্যা করেছিল ৩৬ নিরীহ বাঙালিকে। কয়েক বছর আগে বেসরকারি উদ্যোগে দায়সারা গোছের একটি স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা হয় এই বধ্যভূমিতে। তবে তদারকির অভাবে সেখান থেকে মুছে গেছে শহীদদের নাম।
শুধু পাহাড়তলী ফয়‘স লেক, নাথ পাড়া বা আবদুরপাড়া নয়, চট্টগ্রাম নগরীতে একাত্তরের স্মৃতি বিজড়িত এমন ৭৭টি স্থান রয়েছে। যেগুলো মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলার অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষদের ওপর চালানো নির্যাতন-হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে আছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের পরে এসব বধ্যভূমিতে মিলেছে পাকিস্তানি হানাদারদের নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার সেইসব মানুষদের কঙ্কাল ও নিপীড়নের দাগ। যাদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য বছরের পর বছর দাবি উঠলেও একটি বধ্যভূমিও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
তবে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াছ হোসেনের দাবি, চট্টগ্রামের বধ্যভূমিসহ মুক্তিযুদ্ধের সবস্মৃতি চিহ্ন সংস্কার ও সংরক্ষণের প্রক্রিয়া চলছে। পাহাড়তলী বধ্যভূমির জমি অধিগ্রহণ নিয়ে দুটি মামলা হয়েছে। একটিতে আপিল বিভাগ জমি অধিগ্রহণ করে বধ্যভূমি সংরক্ষণের আদেশ দিয়েছেন। হাইকোর্টে এই সংক্রান্ত আরো একটি মামলা রয়েছে। ওই মামলার আদেশ হাতে পেলেই জমি অধিগ্রহণ করবো। অন্য বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বধ্যভূমি সংরক্ষণের বিষয়ে সরকারের একটা আলাদা প্রকল্প আছে। তবে সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছুই বলতে পারেননি।

প্রজন্ম ৭১ এর সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মুক্তিযোদ্ধা ড. গাজী সালেহ উদ্দিন বলেন, মুক্তিযুদ্ধেও স্মৃতি বিজড়িত ৭৭টি বধ্যভূমি আছে চট্টগ্রাম নগরীর ভেতরেই। তম্মধ্যে মহামায়া ডালিম হোটেল বধ্যভূমি, গুডসহিল বধ্যভূমি, পূর্ব পাহাড়তলী বধ্যভূমি, পশ্চিম পাহাড়তলী বধ্যভূমি, দক্ষিণ বাকলিয়া মোজাহের উলুম মাদ্রাসা বধ্যভূমি, বাটালী পাহাড়ের রেলওয়ে বাংলো বধ্যভূমি, পাঁচলাইশ সড়কের আল বদর বাহিনী ক্যামপ বধ্যভূমি, চট্টগ্রাম জেনারেল পোস্ট অফিস বধ্যভূমি, সিআরবি নির্যাতন কেন্দ্র বধ্যভূমি, চন্দনপুরা রাজাকার ক্যামপ বধ্যভূমি, চাক্তাই খালপাড় বধ্যভূমি, চামড়ার গুদাম চাক্তাই খাল পাড় বধ্যভূমি, তুলশী ধাম সেবায়েত মন্দির বধ্যভূমি, হাইওয়ে প্লাজা ভবন বধ্যভূমি, প্রবর্তক সংঘের পাহাড় বধ্যভূমি, চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামের পাশের সেনাক্যামপ বধ্যভূমি, সার্কিট হাউজ বধ্যভূমি, বন্দর আর্মি ক্যামপ বধ্যভূমি, রেলওয়ে ওয়ার্কশপ বধ্যভূমি, সদরঘাট রাজাকার ক্যামপ বধ্যভূমি, ঝাউতলা বিহারী কলোনী বধ্যভূমি ও সিভিল গোডাউন বধ্যভূমি উল্লেখযোগ্য। যেখানে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরারা মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ বাঙালিদের হত্যা করেছে। অথচ দীর্ঘ এই সময়ে চট্টগ্রামে একটি বধ্যভূমিও সংরক্ষণ করা হয়নি। বরং বধ্যভূমি দখল করে শতাধিক নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে একটি বিশেষ মহল।

তিনি জানান, পাহাড়তলী বধ্যভূমিটি ১৯৯৮ সালে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। প্রাথমিকভাবে ৯৪ লাখ টাকা বরাদ্দও দেওয়া হয়। তবে ২০০৫ সালে চার দলীয় জোট সরকার ওই প্রকল্প বাতিল করে টাকা ফেরতের সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন জাফর ইকবাল, মুনতাসির মামুন, মিলি রহমানসহ আট বিশিষ্ট নাগরিক।
২০১১ সালের ১৬ই জানুয়ারি হাইকোর্ট রিট নিষপত্তি করে দিলে আবেদনকারীরা এর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আসেন। ২০১৪ সালের ১৭ই মার্চ রিট আবেদনের চূড়ান্ত নিষপত্তি করে বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের আদেশ দেন। এরপর প্রায় পাঁচ বছর পার হতে চললেও ভূমি অধিগ্রহণ করে এখনও বধ্যভূমিটি সংরক্ষণ করা হয়নি।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম মহানগর ইউনিট কমান্ডার মোজাফফর আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার এত বছর পরও চট্টগ্রামে কোনও বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা হয়নি। আমরা অসংখ্য চিঠি চালাচালি করেছি। বার বার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনও পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।
তিনি আরও বলেন, সরকার পাহাড়তলী বধ্যভূমি সংরক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বধ্যভূমি সংরক্ষণে সরকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছে। আমরা চাই এই সরকার ক্ষমতায় থাকতে থাকতে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হোক। কারণ এর আগে ২০০০ সালে জোট সরকার এ প্রকল্পটি একবার বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু পাহাড়তলী নয়, তিনি চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান বধ্যভূমির সবগুলোই সংরক্ষণের দাবি জানান।