প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) যে বাড়িতে জন্ম গ্রহন করেন

0
52

সঠিক পথের দিশা দিয়ে বিপণ্ন মানুষের ত্রাতা, অন্ধকারের আলোর প্রজ্জ্বলিত প্রহর হয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে আগমন করেন। মানুষের জন্য আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠতম উপহার হলেন অতুলনীয় বৈশিষ্ট্যের হয়রত মুহাম্মাদ (সা.)। প্রাচীনতম মসজিদ মসজিদুল হারাম পৃথিবীতে আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্ধারিত প্রথম স্থান, বিশ্ব মুসলমানদের সবচেয়ে প্রিয় ও পবিত্র স্থান মসজিদুল হারাম থেকে সামান্য দূরেই আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) জন্ম যে ঘরে হয় সে ঘর ( পিতা আবদুল্লাহর ঘর) অবস্থিত। সেটি ‘শিআবে আলী’র প্রবেশমুখে অবস্থিত।
বনি হাশেম গোত্র যেখানে বাস করত সেটিই ‘শিআবে আলী’ হিসেবে তখন পরিচিত ছিল। আর বাবা আবদুল্লাহর এ ঘরেই প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে ১২ রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পবিত্র জন্মও হয়েছে অলৌকিক পন্থায়। তাঁর জন্মে গোটা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা। মক্কা নগরীতে এটি রাসুল (সা.)-এর জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত। মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে মহানবী (সা.) এ ঘরেই বসবাস করতেন বলে জানা যায়।
ওসমানি শাসনামলে এ বাড়িটি মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হত।যদিও এ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো ঐতিহাসিক তথ্য বা প্রমাণ নেই।
বর্তমানে রাসুল (সা.)-এর জন্মস্থানে সৌদির বিখ্যাত শায়খ আব্বাস কাত্তান ১৩৭১ হিজরিতে ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যয়ে একটি লাইব্রেরি স্থাপন করেন। এর ভেতরের একটি স্থানকে প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) এর জন্মস্থান হিসেবে সবুজ গালিচা দিয়ে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। তবে এখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না।
সোমবার প্রভাতের সময়। কয়েক মাস হলো, আবরাহার হাতিবাহিনী কাবা শরিফে হামলা করেছে। রাত ৪টা ২০ মিনিট। এ সময় পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। এ সময় জন্মগ্রহণ করেছেন বিশ্বনবী, প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.)-এর মা শিফা বিনতে আসওয়াদ (রা.)। তিনি মহানবী (সা.)-এর মা হজরত আমেনা বিনতে ওহ্হাবের সঙ্গে দায়া বা নার্স হিসেবে ছিলেন। তিনি মহানবী (সা.)-এর জন্মের সময়ের বিস্ময়কর কিছু ঘটনা বর্ণনা করেছেন। মহানবী (সা.) যখন এলেন, গোটা কামরা আলোকময় হয়ে গেল। হজরত শিফা দেখলেন, সদ্য ভূমিষ্ঠ এ সন্তান একেবারে সাফ-সুতরো জন্মগ্রহণ করেছে। কোনো ধরনের ময়লা-আবর্জনা, রক্ত-শ্লেষ্মা তাঁর দেহে নেই। অন্য যেকোনো নবজাতক ভূমিষ্ঠ হলে তার শরীরে মায়ের পেট থেকে বিভিন্ন বস্তু লেগে থাকে। কিন্তু মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেছেন সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে। অন্যান্য শিশুর আঁত ও নাভি একসঙ্গে থাকে। পরে সেটা কেটে ফেলা হয়। মহানবী (সা.) ভূমিষ্ঠ হয়েছেন নাভি কর্তিত অবস্থায়। অন্যদের বেলায় দেখা যায়, মুসলিম ছেলেশিশু বড় হলে তাদের মুসলমানি করাতে হয়। কিন্তু মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেছেন মুসলমানি করা অবস্থায়। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে : রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মহান আল্লাহ আমার প্রতি যে সম্মান দেখিয়েছেন তার অন্যতম হলো, আমি খতনাবিশিষ্ট অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছি, যাতে আমার লজ্জাস্থান কেউ যেন না দেখে। (মুজামে আওসাত, হাদিস : ৬১৪৮)
হজরত শিফা বিষয়টি দেখে অভিভূত হলেন। তিনি বিয়য়টি হজরত আমেনাকে দেখিয়েছেন। তিনিও অভিভূত হলেন। মা আমেনা মহানবী (সা.)-কে কোলে নিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু মহানবী (সা.) পার্শ্ব পরিবর্তন করেন। তিনি সেজদায় অবনত হলেন। এ দৃশ্য দেখে তাঁরা উভয়ে ভীত হয়ে পড়লেন। এরপর মহানবী (সা.) উভয় হাতে ভর করে সেজদা থেকে ওঠেন। উঠেই তিনি ডান হাতের শাহাদাত বা তর্জনী আঙুল দিয়ে আসমানের দিকে ইশারা করেন। হঠাৎ পুরো ঘর আলোতে ভরে গেল। হজরত আমেনা বলেন, ‘আমি ওই আলোতে ইরান, সিরিয়া ও হীরার রাজপ্রাসাদ দেখতে পেলাম।’ কাজি আয়াজ বলেন, আবদুর রহমান ইবনে আউফের মা শিফা থেকে বর্ণিত। তিনি তাঁর ধাত্রী ছিলেন। তিনি বলেন, যখন তিনি তাঁর হাতে এলেন তখন চিৎকার করলেন। তিনি এক ঘোষককে বলতে শুনেছেন : ‘আল্লাহ তোমার ওপর অনুগ্রহ করুন।’ সে জায়গা থেকে একটি নূর বের হলো, যা দ্বারা রোমের প্রাসাদ দেখা গেল। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড-২, পৃ. ৩২৪)
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, একসময় শয়তান আসমানে যেতে পারত। গিয়ে ফেরেশতাদের গায়েবি সংবাদ শ্রবণ করত। এরপর তাদের গণকদের কাছে তা পৌঁছে দিত। যখন হজরত ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন তখন তাদের তিন আসমান থেকে বহিষ্কার করা হয়। আর যখন মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেন তখন তাদের সব আসমান থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর পর থেকে তাদের কেউ যখন কিছু শ্রবণ করার জন্য আসমানে যায় তখন তাদের আগুনের স্ফুলিঙ্গ নিক্ষেপ করে বিতাড়িত করা হয়। (তাফসিরে কবির, খণ্ড-১৯, পৃ. ১৩০)
যে রাতে মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেন, সেই রাতে পারস্য ও ইরানের রাজপ্রাসাদে কম্পন ধরে। সেখান থেকে ১৪টি গম্বুজ ভেঙে পড়ে। এর মাধ্যমে তাদের ১৪ জন বংশধর ক্ষমতাবান হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। তাদের ১০ জন পরবর্তী চার বছরে ক্ষমতায় আসে। আর বাকিরা উসমান (রা.) শহীদ হওয়া পর্যন্ত ছিল। মহানবী (সা.)-এর জন্মের দিন পারস্যের আগুন নিভে যায়, যা হাজার বছর ধরে প্রজ্বলিত ছিল। সে দেশের ছোট ছোট নদীর পানি শুকিয়ে যায়। (বায়হাকি, দালাইলুন নবুয়্যাহ, খণ্ড-১, পৃ. ১২৬)
মহানবী (সা.)-এর পবিত্র জন্মে গোটা বিশ্বে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। তাঁর জন্মের পর তিন দিন পর্যন্ত কাবা শরিফ দুলতে থাকে। এটা দেখে গোটা আরবের লোকেরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম সম্পর্কে জানতে পারে। সিরাতে হালবিয়া নামক গ্রন্থে এসেছে : ‘যে রাতে মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেছেন, সেই রাতে কাবা শরিফে কম্পন শুরু হয়। সেটি তিন দিন তিন রাত চলতে থাকে। সেটি ছিল প্রথম নিদর্শন, যা মহানবী (সা.)-এর জন্মের পর গোটা কোরাইশ গোত্র দেখতে পেয়েছিল।’ [সিরাতে হালবিয়া, মহানবী (সা.)-এর জন্ম অধ্যায়]
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইসলামের অনন্য এ নিদর্শনটি দেখার সৌভাগ্য দিন, আমিন।
ছবি- বা বুল কাবা হজ কাফেলা টিম Babul Kaba Hajj Kafela