বাঁশখালীতে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে পুলিশের গুলিতে ৫ শ্রমিক নিহত

0
59

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এস আলমের মালিকানাধীন বেসরকারী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের গুলিতে ৫ শ্রমিক নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত আরও ২৪ জন।

আজ শনিবার (১৭ এপ্রিল) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলে ৪জনের মৃত্যু হয়। আহতদের বাঁশখালী স্বাস্থকেন্দ্র ভর্তি করা হয়েছে। ৫ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে আনা হলে বেলা পৌনে ২টার দিকে একজন মারা যান।
.

নিহতরা হলেন-রনি হোসেন (২২), শুভ (২৪), আহমদ রেজা (১৮), মো. রাহাত (২৪) ও মো. রায়হান (২৫)।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। ওই সংঘর্ষে কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
.

বাঁশখালী থানার ওসি (তদন্ত) আজিজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হওয়ার খবর পেয়েছি। এসময় অন্তত ২৫ জন আহত হয়।
.

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই শীলব্রত বড়ুয় জানান, বাঁশখালীর বিদ্যুৎকেন্দ্রে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ ৫জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। এদের মধ্যে মো. রায়হান (২৫) মারা যান। তিনি নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার আদর্শ গ্রামের আব্দুল মতিনের ছেলে।
.

পুলিশ জানায়, শ্রমিকদের দাবি দাওয়া নিয়ে গতকাল শুক্রবার থেকে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এর জেরে সকালে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে বসেন শ্রমিক নেতারা। বৈঠক চলার সময় দাবি-দাওয়া আদায় নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় পুলিশ গুলি ছুঁড়লে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন। আহত হন অন্তত ২৫জন। তাদেরকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী প্রকল্পের এক শ্রমিক বলেন, এই প্রকল্পের শ্রমিকরা সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কাজ করে থাকেন। রোজা শুরু হওয়ার আগ থেকেই শ্রমিকরা ইফতারের জন্য এক ঘণ্টার বিরতি চেয়ে আসছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা মঞ্জুর করেনি।

“এছাড়া প্রতিমাসের ১০ তারিখের মধ্যে শ্রমিকরা আগের মাসের বেতন চেয়ে আসলেও বেতন পরিশোধে ২০ তারিখেরও বেশি সময় পার হয়ে যাচ্ছিল। ”

তিনি বলেন, শনিবার মিছিল নিয়ে চীনা কোম্পানির সাইট অফিসের দিকে রওনা দিলে পুলিশ শ্রমিকদের বাধা দেয়। কিছুক্ষণ বাগবিতণ্ডার পর কিছু শ্রমিক পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ছুড়তে থাকে। পুলিশ কিছুটা পিছু হটে ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যেই গুলি করতে করতে এগুতে থাকে।

শরিফ হোসেন নামের আরেকজন শ্রমিক বলেন, “প্রকল্পের অধিকাংশ শ্রমিকই রোজা রাখছেন। সে কারণে ইফতারের আগে একঘণ্টার ছুটির কথা আমরা বার বার বলে আসছিলাম। সেই ছুটি মূল নয় ঘণ্টা থেকে কেটে রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন শ্রমিকরা। তা সম্ভব না হলে ইফতারের পর কাজ করে পুষিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল।

“কিন্তু চীনা মালিকপক্ষ কোনোটাই মানছিল না। বাংলাদেশি কন্ট্রাকটররাও ঠিক সময়ে বেতন দিচ্ছিল না। তারা এই ক্ষেত্রে চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা সময় মতো না পাওয়ার আজুহাত দিচ্ছিল।”

চীনের ইপিসি কোম্পানিগুলোর বেশ কয়েকটি বাংলাদেশি সাব কন্ট্রাক্টরের মধ্যে একটি হচ্ছে আদিবা এন্টারপ্রাইজ।

এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইট ম্যানেজার উজ্জ্বল মোল্যা বলেন, “ইফতারের সময় নিয়ে শ্রমিকরা যেই দাবি জানিয়েছিল তা একেবারেই যৌক্তিক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইফতারের আগে ছুটি দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন ছিল। আমরাও চীনা লোকজনকে বুঝাচ্ছিলাম। তারা অনুমোদন না দিলে তো আমরা সেটা করতে পারি না।”

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “শ্রমিকদের দাবির বিষয়টি ভেবে দেখা হবে বলে শুক্রবারই চীনা প্রতিষ্ঠানের লোকজন বলেছিল। শনিবার শ্রমিকরা আবার বিক্ষোভ শুরু করলে এস আলম গ্রুপের সাইট অফিসের লোকজন শ্রকিদের পক্ষ থেকে ১৫/১৬ জনকে ডেকে নিয়ে সেপকো থ্রির কার্যালয়ে বৈঠকে বসে। আমিও সেই বৈঠকে ছিলাম।

“এমন সময় শ্রমিকদের হোস্টেল এলাকা থেকে হই চই শুরু হয়। উত্তেজিত শ্রমিকরা পুলিশ পোস্টে, পুলিশে ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়। কয়েকজন পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ছোড়ে। এর পরে পুলিশের দিক থেকে উপুর্যপুরি গুলি আসতে থাকে।”

চীনের কর্মকর্তাদের ওপর শ্রমিকরা বিরক্ত ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, “ওরা (চীনারা) শ্রমিকদের সঙ্গে কথায় কথায় দুর্ব্যবহার করত। কাজে একটু ত্রুটি পেলে দুর্ব্যবহার করতো। এমনকি কোনো শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে আহত হলে তার কোনো ক্ষতিপূরণ তারা দেয় না। এসব কারণে শ্রমিকরা তাদের ওপর খুবই ক্ষিপ্ত।”

ঘটনার দিন শ্রমিকদের সঙ্গে স্থানীয় কিছুলোকজনও যুক্ত হতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করে উজ্জ্বল বলেন, “শান্ত পরিস্থিতি কয়েক মিনিটের মধ্যে অশান্ত হয়ে উঠলে ঘটনা কাছাকাছি থেকেও আমি বুঝতে পারিনি।“

বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারা ইউনিয়নে ১৩২০ মেগাওয়াটের এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টে বাংলাদেশি কোম্পানি এস আলম গ্রুপের ছয়টি প্রতিষ্ঠানের ৭০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। চীনের প্রতিষ্ঠান সেপকোথ্রি ইলেক্ট্রিক পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ও এইচটিজি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপ মিলে একটি জয়েন্ট ভেঞ্চার করে বৃহৎ এই বেসরকারি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বিদ্যুতের একক ক্রেতা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) মাহবুবুর রহমান বলেন, এসআলম গ্রুপের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইপিসি ঠিকাদার একটি চায়নিজ কোম্পানি। তাদের আবার এদেশীয় সাব কন্ট্রাকটর রয়েছেন। লোকাল শ্রমিকও সেখানে কাজ করেন।

“সেখানে বেতন, ওভার টাইম, রমজানের সময় সূচি নিয়ে একটা ইস্যু ও বদানুবাদ থেকে জটিলতাটা উদ্ভব হয়েছে। চায়নিজরা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় শ্রমিক জনতার সংঘর্ষ হয়, পুলিশ এক পর্যায়ে গুলি চালায়,” বলেন মাহবুব।

পিডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, “প্রকল্পের মালিকপক্ষের সঙ্গে সমস্যা না হলেও চীনা ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) ঠিকাদার ও তাদের লোকাল এজেন্টেদের সঙ্গে শ্রমিকদের বিরোধটা বেঁধেছে। শ্রমিকরা যেই ইস্যুগুলো তুলেছে তা লোকাল সাব কন্ট্রাকটরের পক্ষে সমাধান দেওয়া সম্ভব ছিল না। ওটার সমাধান চায়নিজদের হাতেই ছিল। কখন ছুটি দেবে না দেবে চায়নিজরাই ছিল সেটার অথরিটি।”

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “শ্রমিকদের বেশকিছু দাবি-দাওয়া ছিল। এসব তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে চাচ্ছিলেন। শনিবার সকালে অসন্তোষ বাড়তে থাকে এবং পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে স্থানীয় লোকজনও জড়িয়ে পড়ে।”

২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা এলাকায় এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি অধিগ্রহণ নিয়েও স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছিলেন।