টেকনাফের পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস

0
31

টেকনাফ উপজেলায় পাহাড় ধসে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পাদদেশে বসবাস করছে অসংখ্য মানুষ। গত কয়েক বছর ধরে উপজেলায় বারবার পাহাড় ধসে প্রাণহানি ও প্রশাসনের সতর্কতা জারি সত্বেও তাদের সরানো যাচ্ছে না।
বর্তমানে টেকনাফের ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় বন বিভাগ, পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাদের নিরাপদ এলাকায় সরে যেতে বলা হলেও কেউই তাতে কান দিচ্ছেন না।
বুধবার (১৪ জুন) হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাংখালী পশ্চিম সাতঘরিয়াপাড়া এলাকার পাহাড় ধসে মোহাম্মদ সেলিম (৪০) ও তার মেয়ে তিশা মনি (৩) মারা যান। তাছাড়া পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ধরেছে বলে স’ানীয় মানুষের কাছ থেকে জানা যায়।
মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের পাহাড়ের পাদদেশে আশ্রয় দিয়ে স’ানীয় ভূমিদস্যু দখলদারেরা মাসোহারা নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতি বছর বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা অবৈধ স’াপনা উচ্ছেদ করেন। কিন’ বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে আঁতাত করে আবারো পাহাড়ে বসতি স’াপন করে রোহিঙ্গাদের থাকার সুযোগ করে দেয় স’ানীয় ভূমিদস্যুরা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় পাহাড় ধসের আশঙ্কায় পাহাড়ের ঢালুতে বসবাসরত এসব পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ দিয়েছে স’ানীয় প্রশাসন। বেশি ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে স’ানীয় সাইক্লোন শেল্টার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স’ান করে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ ও সংশোধিত পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের (২০১০) ৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন দখলীয় অথবা ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন, মোচন করা যাবে না।’
এ আইনে পাহাড় কাটার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের জেল ও ৫ লাখ টাকার জরিমানার বিধান থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগ পাহাড় কাটার অপরাধে এ পর্যন্ত কাউকে জরিমানা বা শাস্তির আওতায় আনেনি। যে কারণে টেকনাফ উপজেলায় পাহাড় কাটা, স’াপনা তৈরি ও অবৈধ বসবাস অব্যাহত রয়েছে। বর্ষা এলেই উপজেলার পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষেরা মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ে। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে ৩০ হাজার মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে।
জানা যায়, টেকনাফ বন বিভাগের হোয়াইক্যং, টেকনাফ ও শীলখালী রেঞ্জের আওতায় টেকনাফ পৌরসভা, সদর, হ্নীলা ও বাহারছড়া ইউনিয়নে ১২ হাজার ৬২.১৬ হেক্টর পাহাড় রয়েছে। পাহাড়ে বসবাসকারী বসতির সঠিক হিসাব সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের কাছে নেই।
তবে গত বছর পাহাড়গুলোতে হাজারও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের তালিকা উপজেলা প্রশাসনে পাঠানো হয় এবং চলতি বছরও তালিকা প্রস’ত করা হয়। সমপ্রতি প্রকাশিত দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের কমিপহেনসিভ ডিজ্যাস্টার ম্যানেজমেন্ট পারফরমেন্সের (সিডিএমপি) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ‘শুধু বর্ষণের কারণে নয়, ভূমিকমেপও পাহাড় ধসের ব্যাপক জানমাল ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।’
রিপোর্টে বলা হয়, টেকনাফে পাহাড়গুলোর মধ্যে ১৩টি পাহাড় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। যেসব পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস, সেগুলো হচ্ছে- টেকনাফ পৌরসভার পুরাতন পলানপাড়া, ফকিরামুরা, কাদিরঘোনা, নাইট্যংপাড়া, শিয়াইল্ল্যাঘোনা, চাইলাতলী, বরইতলী উঠনি, সদর ইউনিয়নের বরইতলী, কেরুনতলী, নতুন পলানপাড়া, মাঠপাড়া, জাহালিয়াপাড়া, চন্দরকিলা, রাজারছড়া, হাবিরছড়া, মিঠাপানিরছড়া, হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া, জাদিমুরা, রঙ্গিখালী, মুরাপাড়া, পশ্চিম সিকদারপাড়া, মইন্যার ঝুম, ঘোনাপাড়া, পশ্চিম পানখালী, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের দৈংগাকাটা, লাতুরীখোলা, হরিখোলা, রইক্ষং, নয়াপাড়া, কম্বনিয়াপাড়া, কাঞ্জরপাড়া ও পশ্চিম কুতুবদিয়াপাড়া, আমতলী ইত্যাদি।
এসব পাহাড়ে বালির পরিমাণ বেশি। বৃষ্টির সময় বালিতে পানি ঢুকে নরম হওয়ার পর ধসে পড়ে। বৃষ্টি ছাড়া ভূমিকমেপও যেকোনো মুহূর্তে পাহাড়গুলো ধসে পড়তে পারে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালের ১৫ জুন কক্সবাজারের টেকনাফসহ বিভিন্ন স’ানে পাহাড় ধসে ৫৮ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে টেকনাফেই মারা যায় ৩৪ জন। ২০০৮ সালের ৪ ও ৬ জুলাই টেকনাফের ফকিরা মোরা ও টুইন্যার পাহাড় ধসে একই পরিবারের চারজনসহ ১৩ জন মারা যায়। এসময় ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে অর্ধশতাধিক বসত বাড়িসহ শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু আহত হয়েছিল।
টেকনাফ উপজেলার পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের অধিকাশংই রোহিঙ্গা। এরা বনাঞ্চলের বৃক্ষ নিধন করে এবং পাহাড়-টিলার মাটি কেটে বসতি স’াপন করে চলেছে। এমনিতেই টেকনাফ প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। এ সংকটাপন্ন এলাকাকে বিরানভূমিতে পরিণত করার ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ঘন ঘন দুর্যোগ হচ্ছে। বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকিও।
স’ানীয় জনপ্রতিনিধিরা দাবি করেন, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত বেশিরভাগ লোকজন দরিদ্র শ্রেণির। অভাব-অনটনে জর্জরিত হয়ে, আবার অনেকে শাহ্পরীর দ্বীপ নদী ভাঙনের শিকার হয়ে ভিটেবাড়ি হারানোর পর এক প্রকার বাধ্য হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও এখানে বসবাস করে আসছে।
এসব পরিবারকে উচ্ছেদ না করে পুনর্বাসনের আওতায় এনে বিকল্প ব্যবস’া করতে পারলে ভালো হবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক জানান, বর্ষার শুরু থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ স’ানে বসবাসকারীদের নিরাপদ এলাকায় সরে যেতে বলা এবং সতর্ক করা হয়েছে।