নবধারা জলে স্নান করে শীতল হওয়ার আহ্বান এখন প্রকৃতিতে

0
819

মির্জা ইমতিয়াজ শাওন,নিউজচিটাগাং২৪.কম।। আজ আষাঢ়ের ১ম দিন
নবধারা জলে স্নান করে শীতল হওয়ার আহ্বান এখন প্রকৃতিতে। ঋতু পরিক্রমার দরজায় কড়া নাড়ছে বর্ষা। আজ আষাঢ়ের ১ম দিন।  আজ থেকে শুরু হয়ে গেছে বর্ষাকাল। রিমঝিম বৃষ্টি, কখনওবা মুষলধারে ভারী বর্ষণ। মাঠ, নদী-নালা, পুকুর সব টইটম্বুর হবে বর্ষার বৃষ্টিতে।
জ্যৈষ্ঠের শেষে প্রায় দু’সপ্তাহের তীব্র খরতাপে মানুষ ও প্রাণীকুল হাঁপিয়ে উঠেছে। সে অবস্থাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে মারাত্মক লোডশেডিং। আবহাওয়া অধিদফতর বলছে বৃষ্টি হবে। কমবে তাপমাত্রা।
বাংলা বর্ষপরিক্রমায় বর্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঋতু। আষাঢ়ের প্রথম দিন শুরু হয়ে এই ঋতু চলবে শ্রাবণের শেষ দিন পর্যন্ত। কারণ আষাঢ়-শ্রাবণ দু’মাস বর্ষাকাল। এসময় জলীয় বাষ্পবাহী দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু (বর্ষা) সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে প্রচুর বৃষ্টি হয়। বছরের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয় বর্ষায়। তাই চারপাশের পরিবেশ বদলে যায়।
বর্ষার বদলে যাওয়া রূপ বর্ণনা করে প্রকৃতিবিদ দ্বিজেন শর্মা বলেন, বর্ষার ভারী বর্ষণে শরীর ধুয়ে নেয় প্রকৃতি। পরিচ্ছন্ন হয়। নতুন করে জেগে ওঠে। বেলী, বকুল, জুঁই, দোলনচাঁপা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনার ঘ্রাণে ভরে ওঠে চারপাশ। আর ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’-এর হাসি তো ভুবন ভোলানো! কি গ্রাম, কি নগর, সর্বত্রই বর্ষার আগমনীবার্তা দেয় কদম। যেন একই কথার জানান দিতে পেখম মেলে ময়ূর। বৃষ্টির জল গায়ে নিয়ে নৃত্য করে তারা।
বর্ষায় প্রকৃতির এমন পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন—রিমঝিম রিমঝিম ঘন দেয়া বরষে/কাজরি নাচিয়া চল, পুর-নারী হরষে/কদম তমাল ডালে দোলনা দোলে/কুহু পাপিয়া ময়ূর বোলে/মনের বনের মুকুল খোলে/নট-শ্যাম সুন্দর মেঘ পরশে…। বর্ষায় নিজের চিত্তচাঞ্চল্যের কথা জানিয়ে কবিগুরু লিখেছেন—মন মোর মেঘের সঙ্গী/উড়ে চলে দিগিদগন্তের পানে/নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণ বর্ষণসঙ্গীতে/রিমঝিম রিমঝিম রিমঝিম…। রিমঝিম এ বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দে কাটে বাঙালির শৈশব। স্কুলে যেতে যেতে কিংবা ফেরার পথে দুরন্ত কিশোরী আনন্দে গায়ে মাখে বৃষ্টির ফোঁটা। আর যত্ন করে ব্যাগে পুরে রাখে রঙিন ছাতাটি। তুমুল বৃষ্টিতে গাঁয়ের ছেলেরা নেমে পড়ে ফুটবল নিয়ে। বর্ষার এইতো রূপ!
এছাড়াও জাতীয় কবির সেই বিখ্যাত গান—শাওন আসিল ফিরে সে ফিরে এলো না/বরষা ফুরায়ে গেল আশা তবু গেল না…। কবি অন্যত্র লেখেন—অথৈ জলে মাগো মাঠ-ঘাট থৈ থৈ/আমার হিয়ার আগুন নিভিল কই…। অন্য গানে শাওন রাতে যদি/মনে পড়ে মোরে প্রিয়…। এভাবে অসংখ্য কবিতারও জন্ম হয় বর্ষায়। বলা হয়ে থাকে, বর্ষা ঋতুতেই জীবনের প্রথম কাব্য রচনা করেন বাংলার কবিরা। পরিণত কবিও বর্ষাকে আশ্রয় করেন।

‘বাদল-দিনের প্রথম কদমফুল করেছ দান/আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান’ বর্ষা নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই আবেগময়, প্রেমসিক্ত গান শুধু বাঙালিদের জন্যই প্রযোজ্য। শুধু রবীন্দ্রনাথই নন, বাংলা সাহিত্যের খ্যাত-অখ্যাত বহু কবিই বর্ষার রূপ-ঐশ্বর্যে মোহিত ও মুগ্ধ, বর্ষার আবাহনে উচ্ছ্বসিত ও মুখর। বর্ষাবিহীন বাংলাদেশ ভাবাই যায় না। বর্ষা ঋতু তার বৈশিষ্ট্যের কারণে স্বতন্ত্র। বর্ষা ঋতু কাব্যময়, প্রেমময়। বর্ষার প্রবল বর্ষণে নির্জনে ভালোবাসার সাধ জাগে, চিত্তচাঞ্চল্য বেড়ে যায়। শত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ভিড়েও কোথায় যেন মেলে এক চিলতে বিশুদ্ধ সুখ। কদম ফুলের মতো তুলতুলে নরম, রঙিন স্বপ্ন দুই চোখের কোণে ভেসে ওঠে, ঠিক যেমন করে আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়।
কবির কবিতায়, শিল্পীর সুরে-গানে, চারুশিল্পীর তুলির অাঁচড়ে, চলচ্চিত্রের সেলুলয়েডে, নকশিকাঁথার ফোঁড়ে ফোঁড়ে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ ভা-ারে বর্ষার অপরূপা রূপবর্ণনা, স্থিতি ও ব্যাপ্তি মূর্ত ও চিরকালীন হয়ে আছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গীত ও কবিতার ভাষায় ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।/ওগো আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।/বাদলের ধারা ঝরে ঝরো ঝরো, আউশের ক্ষেত জলে ভরো-ভরো,/কালিমাখা মেঘে ওপারে অাঁধার ঘনিয়েছে দেখ চাহি রে,…।’
বর্ষা ফুল ফোটায়। বর্ষার এই শীতল আবহাওয়ায় গাছে গাছে কদম ফুলের সমারোহ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। বর্ষার প্রথম মাস আষাঢ়ের অগ্রদূত কদমফুল। যেন কদমফুল আষাঢ়কে স্বাগত জানায়। বর্ষার আগেই গাছে গাছে কদমফুল ফুঠেছে।
বর্ষা কবিদের ঋতু। বর্ষা নিয়ে কবিরা লিখেছেন অসংখ্য কবিতা-গল্প-গান। বর্ষা মানেই সময়-অসময়ে ঝমাঝম বৃষ্টি, কর্দমাক্ত পথঘাট, খাল-বিলে থইথই পানি, নদীতে বয়ে চলা ছবির মতো পালতোলা নৌকার সারি। বর্ষার নতুন জলে স্নান সেরে প্রকৃতির মনও যেন নেচে ওঠে। ফুলে ফুলে শোভিত হয় প্রকৃতি। তাল তমাল শাল পিয়াল আর মরাল কপোতের বন বীথিকায় চোখে পড়ে বকুল, কদম, জারুল, পারুল, কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়াসহ অসংখ্য ফুল।
রবীন্দ্রনাথের ‘বর্ষামঙ্গল’ এবং কালীদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্যের কথা উল্লেখ না করলে বর্ষা ঋতুর স্বাদই অপূর্ণ থেকে যাবে। রবীন্দ্রনাথের ‘গীতবিতান’-এর পাতায় পাতায় ভরে আছে বর্ষার ঘনঘটা, গুরুগম্ভীর বৃষ্টির কথা। রোমান্টিক ঋতু বর্ষাকাল; এবং এই ঋতু বাঙালির একান্ত নিজস্ব। ‘বর্ষণমুখর সন্ধ্যা বা বৃষ্টিভেজা রাত বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর কোথাও মিলবে না। শীতপ্রধান দেশে কিংবা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কবিরা বর্ষার সঙ্গে পরিচিতই নন। কবিগুরু বলেছেন, ‘এমন দিন তারে বলা যায়/এমন ঘনঘোর বরিষায়।’
মহাকবি কালীদাস তার ‘মেঘদূত’ কাব্যে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বিরহকাতর ‘যক্ষ মেঘ’কে দূত করে কৈলাসে পাঠিয়েছিলেন তার প্রিয়ার কাছে। যক্ষের সেই বিরহ বারতা মেঘদূত যেন সঞ্চারিত করে চলেছে প্রতিটি বিরহকাতর চিত্তে, যুগ থেকে যুগান্তরে। তাই রবীন্দ্রনাথ কালীদাসের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘কবির কবে কোন আষাঢ়ের পুণ্য দিবসে লিখেছিলে মেঘদূত। বৃষ্টির শব্দে যক্ষের মতোই বাঙালির হৃদয় এক অজানা বিরহে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কেতকীর মন মাতানো সুগন্ধ আর কদম ফুলের চোখ জুড়ানো শোভা অনুষঙ্গ হয়ে আছে আষাঢ়ের। কদম কেতকী ফুটবে, আকাশজুড়ে চলবে মেঘের আনাগোনা, দ্রিমিকি দ্রিমিকি রবে।’ এমন দিনে ‘মুহূর্তে আকাশ ঘিরি রচিল সজল মেঘস্তরদ আর তাতে রিক্ত যত নদীপথ’ ভরে যাবে ‘অমৃতপ্রবাহে’। মরুবক্ষে তৃণরাজি/পেতে দিল আজি/শ্যাম আস্তরণ। গুরুগুরু মেঘ গর্জে ভরিয়া উঠিল বিশ্বময়। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন, ‘ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি’। আষাঢ়ে জলভারানত ঘনকৃষ্ণ মেঘরাশি আকাশ ছেয়ে রাখে। কখনো বা ‘প্রাণনাথ’-এর মতো প্রকৃতিতে নামে বারিধারা।

ভাটি বাংলার লোককবিরা, বাউলরা এ ঋতু দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত। বাউলদের তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিত সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা—এই সাতটি জেলার লোককবিরা বর্ষা নিয়ে বিশেষ প্রভাবিত হয়ে থাকেন। তাদের কালজয়ী সৃষ্টির ভাণ্ডার এর প্রমাণ। হাওর এলাকার চেহারাও একেবারে বদলে যায় বর্ষায়। গ্রীষ্মে হাওরের যে অংশ পায়ে হাঁটার পথ, বর্ষায় তা অথৈ জল-নদী। শুকনো মৌসুমে যে জায়গায় হালচাষ করেন কৃষক, ভরা বর্ষায় সেখানে জাল ফেলে মাছ ধরেন জেলেরা। এ সময় ভাটি অঞ্চলের বাবা-মায়েরা নৌকায় করে তাদের মেয়েকে নাইওর আনেন। বিয়েসাদিও হয় প্রচুর। নৌকো করেই বিয়ে করতে যান বর। ফসল উত্পাদনেও বিশেষ ভূমিকা রাখে বর্ষা। তাইতো ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান সুরে সুরে বলেন—আইলো আষাঢ় লইয়া আশা/চাষীর মনে বান্ধে বাসা…
অবশ্য বর্ষার সবই উপভোগ্য, উপকারের—এমনটি বললে কিছু বেশি বলা হবে বৈ কি! ভারি বর্ষণে, পাহাড়ি ঢলে গ্রামের পর গ্রাম যে ভাসিয়ে নেয়, সেও বর্ষা! বন্যাকবলিত নিচু এলাকার মানুষ তাই আতঙ্কে পার করে বর্ষা। একই কারণে সারা বছরের অর্জন ফসল তলিয়ে যায়। শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট হয়। সে অবস্থা তুলে ধরে ভাটিবাংলার সাধক পুরুষ বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম গান রচনা করেন—আসে যখন বর্ষার পানি, ঢেউ করে হানাহানি/গরিবের যায় দিন রজনী দুর্ভাবনায়/ঘরে বসে ভাবাগুনা নৌকা বিনা চলা যায় না/বর্ষায় মজুরি পায় না গরিব নিরুপায়…।

এ সময় প্রিয় লোকটির কথা বেশি বেশি মনে পড়ে। আর মনে মনে প্রিয় মানুষটিকে কিছু একটা উপহার দিতে। আমার মনের উপহারটা দামি না হলেও অন্য মাসে কিন্তু সেটা দাম দিয়েও কেনা যাবে না। সেই উপহারটা কি জানেন? বড় বড় সবুজ পাতার মধ্যখানে হলুদ শাড়ির ওপর আবার সাদা সাদা রংয়ের কাজ করা….. হ্যাঁ, কদম ফুল! এই সময় কদম ফুলগুলো দেখলে নিজের মনটাই কদমফুলের মতো স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে। আষাঢ়ের এই দিনে আপনি আপনার প্রিয় মানুষটিকে কদমফুল উপহার দিন, দেখবেন তার মনটাও স্নিগ্ধতায় ভরে যাবে। আষাঢ়ের এই শীতল আবহাওয়ায় গাছে গাছে কদম ফুলের সমারোহ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। আষাঢ়ের আগেই গাছে গাছে কদমফুল ফুঠেছে। কদমফুলকেই আষাঢ়ের অগ্রদূত বলা হয়। কদমফুল আষাঢ়কে স্বাগত জানায়। তবে কদমফুল তার কথা রেখেছে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মেঘ-বিজলি তাদের কথা রাখতে পারেনি। আগেকার দিনের আষাঢ়ে আকাশে মেঘে গুড়গুড় শব্দ ছিল। ছিল মেঘের সঙ্গে চমকানো বিজলি। বিজলির চমকানিতে মুহূর্তেই গ্রামকে গ্রাম আলো হয়ে যেত।
আষাঢ় মাসে শুধু কদমই নয়, আরো ফোটে শাপলা, পদ্ম। আষাঢ়ের একটানা বর্ষণে খাল-বিলে পানি থৈ থৈ করত। আর সেই পানিতে সাদা শাপলাগুলো ফুটে থাকত। মনে হয় যেন খাল-বিলগুলো সাদা শাড়ি পরে আছে। অপরূপ মনোরম এই দৃশ্য। আর এই দৃশ্য গ্রামে না গেলে উপভোগ করা যায় না।