রেওয়াজে পরিণত খাতুনগঞ্জে ‘হালখাতা’ উৎসব পালন

0
12

ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে ‘হালখাতা’ উৎসব পালন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। হালখাতার মাধ্যমে বাৎসরিক লেনদেনের হিসাব নিকাশের সেই জৌলুস এখন আর নেই। এরপরও অনেক ব্যবসায়ী চিরায়ত ঐতিহ্য হিসেবে সেটি ধরে রেখেছেন। বেশির ভাগ ব্যবসায়ী হালখাতা উৎসবে আধুনিকতা বা ডিজিটালের ছোঁয়া এনেছেন।

নগদ-বাকিতে বাৎসরিক বেচাকেনার হিসাব এখন লেখা হয় কম্পিউটারে, আর লেনদেন হচ্ছে ব্যাংক চেকের মাধ্যমে। লেনদেনে বছর গণনায় এসেছে বড় পরিবর্তন। আগের মতো বাংলাবর্ষের বদলে ইংরেজি সালকে ভিত্তি ধরে হিসাব নিকাশ কষেন সবাই। এসব কারণে মৌখিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সেই ব্যবসার ‘লাল খাতা’য় লেখাটা কেবল রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

এরপরও খাতুনগঞ্জ, আছদগঞ্জ ও চাক্তাই এলাকার অনেক বনেদি ব্যবসায়ী হালখাতা উৎসব বেশ ঘটা করেই পালন করেন। এসব এলাকার সাড়ে তিন হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে হালখাতা উৎসব পালন করেন প্রায় এক হাজার। শতাংশের হিসাবে যা এক দশমাংশ। এ ব্যবসায়ীরা বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য বাংলা নববর্ষের শেষদিন ‘চৈতকাবারি’ ও শুরুর দিন ‘হালখাতা’ ঘটা করে উদযাপন করেন।

ঐতিহ্য ধরে রাখার কারণ হিসেবে মসলা ব্যবসায়ী উৎপল চৌধুরী বলেন, ‘এখনো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি হালখাতার মাধ্যমেই আমাদের ব্যবসার শুরুটা ইতিবাচক হয়। এ উৎসব মানেই মিলনমেলা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য। আমরা সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই এবং এখনকার ব্যবসায়ীদের মধ্যেও সেটি ছড়িয়ে দিতে চাই। আগে কিভাবে পারস্পরিক বিশ্বাস আস্থার মাধ্যমে ব্যবসা হত।’

খাতুনগঞ্জের বনেদি ব্যবসায়ী ছাড়াও নতুন প্রজন্মের কিছু ব্যবসায়ীর মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে হালখাতা উৎসব। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী অসীম কুমার দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান ফোরজির যুগে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যেও আমাদের ব্যবসায়ী অংশীজনদের সাথে একটা দিন কাটাই।

আগামী বছর কেমন যাবে তা নিয়ে আলাপ করি, সুখ-দুঃখ বিনিময় করি। নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ী হলেও আমি এটি পালন করছি, কারণ এটি বড় মিলনমেলা যা আমাদের আত্মার সাথে মিশে আছে।’

‘আগে বিগত বছরের বকেয়া পরিশোধ করে নতুন হালখাতা খোলা হত, এখন বকেয়ার ইজা টেনে নতুন খাতায় যুক্ত করেও আমরা তৃপ্ত হই। এতে দুজনের সম্পর্ক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে। যা পরবর্তী ব্যবসা সম্প্রসারণ লেনদেনে ইতিবাচক ফল দেয়।’-যোগ করেন এই মসলা ব্যবসায়ী।

হালখাতা উৎসব হারিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জ ট্রেড ও ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহমদ বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্যে লেনদেন এখন মোবাইল, ইমেইল, ব্যাংকের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে চলছে। ফলে বাজারে এসে হিসাব-নিকাশ করতে না হওয়ায় হালখাতার

ঐতিহ্য অনেকটা হারিয়ে গেছে। এরপরও বনেদি হিন্দু ব্যবসায়ীরা সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। তাঁরা সবাই ঘটা করেই সেই অনুষ্ঠান পালন করেন। আমরাও সেখানে শরিক হই।’

জানা গেছে, দেশের ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ, আছদগঞ্জ ও চাক্তাই মিলিয়ে মোট সাড়ে তিন হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী যেমন রয়েছে, তেমনি আছেন আমদানিকারক, আড়তদার, পাইকারি এবং ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) ব্যবসায়ী। এদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ হালখাতা উৎসব করেন।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড ও ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক জামাল হোসেন মনে করেন, ‘খাতুনগঞ্জ, আছদগঞ্জ ও চাক্তাই মিলিয়ে প্রায় এক হাজার ব্যবসায়ী হালখাতা অনুষ্ঠান ঘটা করে উদযাপন করেন। পাইকারি ও আড়তদারদের সাথে তৃণমুল ব্যবসায়ীদের সরাসরি লেনদেন আছে তাঁরাই এই অনুষ্ঠান করেন। পুরনো হিসাব গুটিয়ে নতুন বছরে নতুন হিসাব শুরু করেন মিষ্টিমুখ করিয়ে। আমরাও তাদের সাথে যোগ দিই।’

খাতুনগঞ্জে প্রায় সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারাও তাঁদের বড় গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করিয়ে এবং নববর্ষের কার্ড দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। আবার অনেক ব্যবসায়ীর ঘটা করেই পান্তা ভাত খাওয়ার আয়োজনেরও নজির আছে।

শীর্ষ শিল্পগ্রুপ জিপিএইচ গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা ওসমান গণি চৌধুরী বলেন, ‘বাংলা নববর্ষ আমরা শুধু কার্ড বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখিনি। আমাদের গ্রাহকদের বিশেষ প্যাকেটে মিষ্টান্ন পাঠিয়েই নতুন বর্ষ ভালোভাবে শুরুর চেষ্টা করি। বিষয়টি ছোট মনে হলেও পারস্পরিকা আন্তরিকতা বিশাল।’

জানা গেছে, ব্যবসায়ীরা চৈত্রের শেষ দিন ‘চৈতকাবারি’ ও বছরের শুরুর দিন ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠান করেন। সরকারিভাবে নববর্ষ পালিত হয় ১৪ এপ্রিল। কিন্তু সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীরা তা পালন করেন ১৫ এপ্রিল। হিন্দুরা পঞ্জিকা অনুসরণ করে বাংলা নববর্ষের দিন গণনা শুরু করায় উৎসব পালন একদিন পরে হয়। ব্যবসায়ীরা সেদিন নতুন করে সাজান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং নানা রকমের মিষ্টি দিয়ে আগত অতিথি-খরিদদারদের মিষ্টিমুখ করা হয়।