একাত্তরের জন্য বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত পাকিস্তানের

0
66

সম্প্রতি ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে যোগাযোগ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করার আশা জাগিয়ে তুলেছে। কিন্তু ড. আলী রীয়াজসহ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এক্ষেত্রে কোনো বাস্তবিক অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে, তার জন্য অবশ্যই ক্ষমা চাইতে হবে পাকিস্তানকে। অনলাইন ডয়েচে ভেলে’তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব দাবি তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকেই পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। ওই যুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীরা। যুদ্ধে বাংলাদেশের প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। কিন্তু এ মাসে দুই দেশের নেতাদের মধ্যে অপ্রত্যাশিত একটি নড়চড় প্রত্যক্ষ করছেন বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিরা। গত শুক্রবার বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।
তিনি এ সময় শেখ হাসিনাকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি একটি চিঠি লিখেছেন। তাতে তিনি লিখেছেন, আমার নিজের পক্ষ থেকে, সরকারের পক্ষ থেকে এবং পাকিস্তানের জনগণের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তীতে অভিনন্দন জানাচ্ছি। ইমরান খানের এই চিঠিকে দেখা হচ্ছে ইসলামাবাদ এবং ঢাকাকে খুব কাছাকাছি নিয়ে আসার একটি উদ্যোগ হিসেবে। তাই এই চিঠির প্রশংসা করা হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। অন্যদিকে গত সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে ইমরান খানকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন শেখ হাসিনা। তাতে লাহোর প্রস্তাবকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই লাহোর প্রস্তাব পরিচিত পাকিস্তান রেজুল্যুশন নামে। এটা ১৯৪০ সালের ২৩ শে মার্চ পাস হয়েছিল। স্বাধীন একটি রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার জন্য এটাকে বড় একটি মাইলফলক হিসেবে সেলিব্রেট করা হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে বছরের পর বছর। ডয়েচে ভেলে লিখেছে, সম্প্রতি পাকিস্তানি এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে পুনর্মিলনের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তার প্রশংসা করেছেন লেখক আনাম জাকারিয়া। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, যদি কোনো দেশ অর্থপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় তাহলে পাকিস্তানকে ১৯৭১ সালের সহিংসতার কথা স্বীকার করতে হবে। একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বৈষম্যের কথা, যে কারণে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। আনাম জাকারিয়ার মতে, অতীতের বিষয়গুলো নিজেদের কাঁধে নিয়ে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ স্বীকার করে নিয়ে যদি ক্ষমা চায় পাকিস্তান, তাহলেই এই দুটি দেশের মধ্যে কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর হবে। তিনি আরো বলেন, ভুল স্বীকার করে ইতিহাসকে সংশোধন করার দায়িত্ব পাকিস্তানের হাতে। ডয়েচে ভেলেকে তিনি বলেছেন, অর্ধ শতাব্দী পরে, এখনও পাকিস্তান তার অতীতের দায় স্বীকার করেনি। এখনও সেখানে পাঠ্যপুস্তকে, জাদুঘরে প্রদর্শনীতে এবং মূলধারার বর্ণনায় অব্যাহতভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে এবং ইতিহাসকে মুছে দেয়া হচ্ছে। নির্বাচিত স্মরণীয় কিছু এবং অতীতকে ভুলে যাওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্র কর্তৃক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যারা বেঁচে আছেন এবং তাদের পরিবারের কাছে ৫০ বছর আগের সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করা এবং সেটাকে সর্বনিম্ন আকারে উপস্থাপন গভীর বেদনার। তাই পাকিস্তানের স্বীকারোক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো জাতি সহজেই তাদের ইতিহাস মুছে দিতে পারে না এবং সামনে এগুতে পারে না। যদি আমরা গভীরভাবে যুক্ত না হই এবং এ থেকে শিক্ষা না নিই তাহলে আমাদের বর্তমানকে অব্যাহতভাবে তাড়া করবে অতীত।
দুই দেশের মধ্যে বর্তমান যে সম্পর্কের উন্নয়ন করার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে তাকে ‘বরফ গলন’ বা আইস ব্রেকিং বলে আখ্যায়িত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ। তিনিও মনে করেন বাস্তবে এই অগ্রগতি অর্জনের বিষয়টি ঝুলে আছে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানের নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে। তিনি বলেন, উন্নত একটি সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন ১৯৭১ সালের বিষয়টিতে পাকিস্তানের উদ্যোগ। বিশেষ করে সেনাবাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল (তা স্বীকার করে নেয়া)। দীর্ঘদিনের চাওয়া পাকিস্তান কোনো শর্ত ছাড়াই প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইবে। কোনো জাতিই তার অন্ধকার অতীতের সঙ্গে লড়াই না করে সামনে এগুতে পারে না।